রোববার দুপুর। রাজধানীর হাজারীবাগের ঝাউচর থেকে মহাখালীর সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগে এসেছেন মা রেহেনা আক্তার। তার কোলে দেড় বছরের শিশু রাইয়ান। ইনজেকশনের যন্ত্রণায় হাসপাতালের বারান্দায় বসেই কান্না করছিল শিশুটি। ২৩ সেপ্টেম্বর বাড়ির পোষা বিড়াল তার ডান হাতে কামড় দেয়। ক্ষত থেকে রক্তপাত হওয়ায় দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শুরু হয়েছে জলাতঙ্কের টিকা। রেহেনা যুগান্তরকে বলেন, ‘আজ দ্বিতীয় ডোজ দিলাম। ইনজেকশনের ব্যথা ও ভয়ে ছেলে অনেক কান্না করছে। তবে জলাতঙ্কের ভয়েই দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে এসেছি।’
একই হাসপাতালে টিকা নিতে এসেছিলেন মোহাম্মদপুরের চাঁদউদ্যানের শারমিনা আক্তার খাদিজা (২৬)। তিনি জানান কয়েক দিন আগে বাসার পাশে একটি বিড়াল বাচ্চা প্রসব করে। বাচ্চাগুলোকে খাওয়ানোর সময় আকস্মিকভাবে বিড়ালটি তার বাম হাতে কামড় দেয়। ইতোমধ্যে কয়েকটি ইনজেকশন নিয়েছেন তিনি।
হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাণীর কামড়ের চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর সংখ্যা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। সরকারি সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ হাজার ২০০ রোগী আসছেন। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. এফএ আসামা খানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এসব রোগীর প্রায় ৬৫ শতাংশই বিড়ালের কামড়ের শিকার। এর মধ্যে বেওয়ারিশ কুকুর, বিড়ালের পাশাপাশি পোষা বিড়ালের কামড়ের ঘটনাও রয়েছে। নারী ও শিশুরা তুলনামূলক বেশি আক্রান্ত হচ্ছেন।
এই পরিস্থিতিতে আজ বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশেও পালিত হতে যাচ্ছে বিশ্ব জলাতঙ্ক দিবস ২০২৬। এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্ট্রংগার টুগেদার’- অর্থাৎ ‘একসঙ্গে থাকলেই আমরা আরও শক্তিশালী’। আক্রান্তদের দ্রুত চিকিৎসা, প্রাণীর টিকাদান, রোগ নজরদারি, সচেতনতা এবং স্বাস্থ্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর এবার বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ২০৩০ সালের মধ্যে কুকুরের মাধ্যমে মানুষের জলাতঙ্কজনিত মৃত্যু শূন্যে নামানোর লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। ডব্লিউএইচও বলছে, জলাতঙ্কের রোগ প্রায় শতভাগ প্রাণঘাতী হলেও প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত ক্ষত পরিষ্কার, প্রয়োজনীয় টিকা ও ইমিউনোগ্লোবিউলিন গ্রহণের মাধ্যমে মৃত্যু প্রতিরোধ করা যায়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের বহির্বিভাগে টিকাদানে নিয়োজিত সিনিয়র স্টাফ নার্স জাকিয়া সুলতানা জানান-কুকুর, বিড়াল, শিয়াল, বেজিসহ বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের পর রোগীকে র্যাবিস ভ্যাকসিন বা জলাতঙ্ক প্রতিরোধের টিকা দেওয়া হয়। র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন (আরআইজি) কিংবা টিটেনাসের টিকাও প্রয়োজন হতে পারে।
হাসপাতালের পরিসংখ্যানেও রোগীর চাপ বৃদ্ধির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২৩ সালে বিভিন্ন প্রাণীর কামড়ের শিকার হয়ে বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৯৩ হাজার ৩৮০ জন। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ২২ হাজার ২৬৩ এবং ২০২৫ সালে ১ লাখ ৪৬ হাজার ২৪৩ জনে। চলতি বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৫৫৮।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কমিউনিকেবল ডিজিজ কন্ট্রোল (সিডিসি) শাখার তথ্য অনুযায়ী, জলাতঙ্কে ২০২৩ সালে ৪২ জন, ২০২৪ সালে ৫৮ জন এবং ২০২৫ সালে ৫৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরের আগস্ট পর্যন্ত মারা গেছেন ৩৫ জন। সিডিসির সহকারী পরিচালক ডা. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান জানান, দেশে প্রতিবছর আনুমানিক ৬০ থেকে ৭০ জন জলাতঙ্কে আক্রান্ত হন। অধিদপ্তর জানিয়েছে মৃত্যুর এই তথ্য সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতাল থেকে নেওয়া হয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের কনসালট্যান্ট ডা. আরিফুল বাসার বলেন, প্রাণীর কামড়ের পর দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান ও পানি দিয়ে ভালোভাবে ধুয়ে হাসপাতালে আসতে হবে। মাথা, মুখ ও ঘাড়ের কাছাকাছি কামড়, গভীর ক্ষত বা রক্তপাতের ক্ষেত্রে চিকিৎসা নিতে মোটেই দেরি করা যাবে না।
সিডিসির সহকারী পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) ডা. মোহাম্মদ নাজমুল হাসান যুগান্তরকে বলেন, চলতি অর্থবছরে প্রায় ৯ লাখ ডোজ র্যাবিস ভ্যাকসিন এবং ৩ লাখ ডোজ র্যাবিস ইমিউনোগ্লোবিউলিন সরবরাহের কার্যক্রম রয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, কুকুর ও বিড়ালের টিকাদান কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর জলাতঙ্কে আনুমানিক ৫৯ হাজার মানুষ মারা যান। মানুষের জলাতঙ্ক সংক্রমণের প্রায় ৯৯ শতাংশই কুকুরের মাধ্যমে হয়ে থাকে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কুকুরের অন্তত ৭০ শতাংশকে নিয়মিত টিকা দেওয়া গেলে সংক্রমণের চক্র ভাঙা সম্ভব।