Image description

রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলেই ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের একটি অংশের ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ হয়ে ওঠার প্রবণতা নতুন নয়। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে দখলবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ কিংবা প্রতিপক্ষের ওপর চড়াও হওয়ার মতো ঘটনা প্রত্যেক সরকারের আমলেই কমবেশি দেখা যায়। সাড়ে ১৫ বছরে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের এমন প্রবণতায় অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল দেশের জনগণ। অন্যদিকে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসেছে মাত্র ছয় মাস পার হলো। এ দলটির নেতাকর্মীদের কর্মকাণ্ডে জনগণ অতিষ্ঠ হয়নি। তবে কিছু নেতাকর্মীর নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠার প্রবণতা মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। ফলে ক্ষমতায় গেলেই নেতাকর্মীরা কেন বেপরোয়া হয়ে ওঠেন-এমন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে জনমনে।

তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সমাজবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক দলের সিনিয়র নেতারা বলছেন, এটি কেবল কোনো ব্যক্তির অপরাধ নয় বরং এটি আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি কাঠামোগত সংকট। এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কিছু মনস্তাত্ত্বিক ও কাঠামোগত কারণ রয়েছে।

তারা বলছেন, বাংলাদেশে তৃণমূলের রাজনীতি অনেকের কাছে ‘বিনিয়োগহীন ব্যবসায়’ পরিণত হয়েছে। দল ক্ষমতায় থাকলে টেন্ডারবাজি, তদবির ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে দ্রুত বিপুল অর্থ উপার্জনের সুযোগ তৈরি হয়। এই আর্থিক লোভই নেতাকর্মীদের ‘নিয়ন্ত্রণহীন’ করে তোলে। এছাড়া দলীয় পরিচয় থাকলে ‘সাত খুন মাফ’-এমন একটি প্রচ্ছন্ন ধারণা সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা যখন দলীয় প্রভাবে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না, তখন অপরাধ করেও পার পেয়ে যাওয়ার নিশ্চয়তা নেতাকর্মীদের বেপরোয়া আচরণকে কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। তাদের মতে, শীর্ষ বা মধ্যমসারির নেতাদের চারপাশে একদল সুবিধাবাদী ও চাটুকার কর্মীর বলয় তৈরি হয়। নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে এবং নেতার গুডবুকে থাকতে এ কর্মীরা বেপরোয়া আচরণ, দখল বা বলপ্রয়োগের পথ বেছে নেয়। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকা বা নিপীড়নের শিকার হওয়ার পর কোনো দল ক্ষমতায় এলে কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের ‘ক্ষোভ ও প্রতিশোধের’ মানসিকতাও কাজ করে। বিগত সরকারের অন্যায়ের জবাব দিতে গিয়ে তারা নিজেরাও একই অন্যায়ের বৃত্তে জড়িয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ে নেতাকর্মীর অনেকেই বলছেন, ক্ষমতার পরিবর্তন মানে কেবল ব্যক্তির পরিবর্তন নয় বরং রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন হওয়া উচিত। অনেক সময় দলের নাম ভাঙিয়ে কিছু ‘নব্য’, সুবিধাবাদী অনুপ্রবেশকারী বিশৃঙ্খলা তৈরি করে; যা মূল দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করে। দলের শীর্ষ নেতৃত্ব প্রায়শই অপকর্মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা কঠোর ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিলেও তৃণমূল পর্যন্ত তার বাস্তবায়ন পুরোপুরি নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাদের মতে, দলীয় কর্মীদের রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত ও আদর্শিক না করে কেবল স্লোগান সর্বস্ব করে তোলার কারণেই এ বিচ্যুতির সৃষ্টি হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার যুগান্তরকে বলেন, দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শের চর্চা অনেকাংশেই হারিয়ে গেছে। অবশ্য ডানপন্থি, বামপন্থি কিংবা ইসলামিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। তবে মূলধারার অধিকাংশ মানুষই এখন রাজনীতিতে যুক্ত হচ্ছেন মূলত কোনো বিশেষ সুবিধা বা পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার আশায়। তার মতে, যখনই কোনো দল ক্ষমতায় আসে, তখন তাদের অনুসারীদের মধ্যে ‘আমাদের সরকার, এখন আমাদেরই সময়’ এমন একটি মানসিকতা তৈরি হয়। এই মানসিকতা থেকে তারা অন্যায় করেও পার পেয়ে যাওয়ার এবং নানা অবৈধ সুযোগ-সুবিধা ভোগ করার প্রত্যাশা করে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স যুগান্তরকে বলেন, একটি রাজনৈতিক দল দেশের জন্য কী করবে, তা মূলত নির্ভর করে তিনটি বিষয়ের ওপর। দলটির রাজনৈতিক আদর্শ কী, তাদের লক্ষ্য কী এবং তারা আসলে কার স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, সেটিই মূল বিষয়। দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের দেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আমরা বারবার দেখেছি, বিভিন্ন সময়ে যারা ক্ষমতায় এসেছে, তারা জনস্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তারা এমন এক অর্থনৈতিক নীতিমালা দিয়ে দেশ শাসন করতে চায়, যা মূলত দেশে লুটপাটের সংস্কৃতি ছড়িয়ে দেয়। যখন একটি রাজনৈতিক দল লুটপাটের মানসিকতা নিয়ে জনমত গঠন করে, তখন সেই লুটপাটের অর্থনীতি অনিবার্য হয়ে ওঠে। আর এই রাজনীতির সঙ্গে যারা জড়িত, তারা ক্ষমতায় যাওয়া মাত্রই নিজেদের আখের গোছাতে সেই লুটপাট অব্যাহত রাখে।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক যুগান্তরকে বলেন, সমাজে চাঁদাবাজি, দুর্নীতি বা নানা অপরাধের মূল কারণ হলো-অপরাধীদের ওপর রাষ্ট্রীয়, দলীয় ও প্রশাসনিক ছত্রছায়া। আমাদের দেশে আজ অর্থনীতির দুর্বৃত্তায়ন যেমন হয়েছে, তেমনি রাজনীতিরও চরম দুর্বৃত্তায়ন ঘটেছে। একই সঙ্গে দুর্বৃত্তদের একটি বড় অংশের রাজনৈতিকায়ন সম্পন্ন হয়েছে। রাজনীতি আর দুর্বৃত্তদের এই যে অশুভ আঁতাত, এটাই বর্তমান সংকটের প্রধান কারণ। তিনি বলেন, এই অশুভ আঁতাতের ফলেই যখনই দেশে সরকার পরিবর্তন হয়, তখনই দেখা যায় আগের আমলের দুর্বৃত্ত, চাঁদাবাজ ও সামাজিক অপরাধীরা রাতারাতি দল বদলে নতুন সরকারি দলে যোগ দেয়। কারণ, সরকারি দলের পরিচয় দেওয়াটা তাদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ। এই রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরোক্ষ আশ্রয়ে থেকে তারা খুব সহজেই যে কোনো সামাজিক ও অর্থনৈতিক অপকর্ম, অপতৎপরতা ও অপরাধ চালিয়ে যেতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক যুগান্তরকে বলেন, অতীতে যে রাজনৈতিক দলগুলো বারবার ক্ষমতায় এসেছে, তাদের নীতি-নির্ধারণী পর্যায় থেকে শুরু করে তৃণমূল পর্যন্ত নেতাকর্মীদের একটি বড় অংশের মধ্যে এই বিশ্বাস কাজ করে যে, দল যখন বিরোধী অবস্থানে ছিল, তখন তাদের যে কষ্ট বা মামলা-হামলার শিকার হতে হয়েছে, দল ক্ষমতায় এলে তা সুদে-আসলে আদায় করে নিতে হবে। আবার দলের শক্তি বা ক্ষমতা নিজেদের পরিচয় হিসাবে ব্যবহার করেও তারা নানা ধরনের চাঁদাবাজি ও জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ে।

সংকট উত্তরণে করণীয়

তবে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক উভয় ক্ষেত্রেই সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, অপরাধে জড়ানো নেতাকর্মীদের কেবল মৌখিক সতর্কবার্তা নয়, সরাসরি দল থেকে বহিষ্কার এবং আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি করতে হবে। পাশাপাশি অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে দলীয় পদ থেকে দূরে রাখা জরুরি। এছাড়া আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। অপরাধীর রাজনৈতিক পরিচয় যাই হোক না কেন, আইন যেন নিজস্ব গতিতে চলে, এই সংস্কৃতি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রপ্রধানদের মূল দায়িত্ব। তাদের মতে, রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনসহ জবাবদিহিতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করাও প্রয়োজন।

বদিউল আলম মজুমদার বলেন, দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের সমাজে এমন একটি নেতিবাচক সংস্কৃতি বা ঐতিহ্য তৈরি হয়ে গেছে, যেখানে ক্ষমতার জোরে অপরাধ করেও পার পাওয়া যায়। মূলত জবাবদিহিতা ও সঠিক ন্যায়বিচারের অভাবেই সমাজ আজ এ পরিণতির দিকে যাচ্ছে। তবে জবাবদিহিতা ও সঠিক ন্যায়বিচার এবং মানসিকতা পরিবর্তন হলে এখান থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব। রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, একটি বৈষম্যহীন ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে এ ব্যবস্থা হয়তো রাতারাতি সম্পূর্ণ উচ্ছেদ করা সম্ভব হবে না। তবে একে ন্যূনতম নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সাধারণ জনগণের জোরালো প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। এ

কই সঙ্গে দেশে ন্যূনতম আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে অন্যায়কারীরা আইনের ঊর্ধ্বে যাওয়ার সাহস না পায় এবং তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায়। ড. তৌহিদুল হকের মতে, মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের জন্য প্রথমত, রাজনীতিকে অর্থ উপার্জনের বা আয়ের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করার পথ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে হবে। এর পরেও যারা এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত হবে, তাদের বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দল থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।