কখনো স্বর্ণ, কখনো ধার করা টাকা, সবই একে একে তুলে দিয়েছেন অনলাইন জুয়ার আসরে। পরিচিতজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে প্রতিশ্রুতি দিতেন লাখে ২৫ হাজার টাকা লাভ দেবেন।
আবদুল আজিজ একা নন, অনলাইন জুয়ার সিন্ডিকেটে তাঁর আরো তিন-চারজন বন্ধু জুয়ার ফাঁদে পড়ে সর্বস্ব হারিয়ে পাওনাদারের ভয়ে বর্তমানে আত্মগোপনে। আজিজের কাছে টাকা ও স্বর্ণ পাওনা এমন অন্তত ১৭ জন ব্যক্তি তাঁকে খুঁজছেন। এসব পাওনাদারের মধ্যে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন রোহিঙ্গা বলেন, ‘আমাদের আবদুল হাকিমের ছেলে আবদুল আজিজ আমাকে ফতুর বানিয়ে দিয়েছে। আমি তার দেওয়া লোভে পড়ে টাকা দিয়েছিলাম বোনদের কাছ থেকে হাওলাত এনে।
আজিজের এই ঘটনা কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ছড়িয়ে পড়া অনলাইন জুয়ার একটি চিত্র মাত্র। স্থানীয়দের অভিযোগ, ‘ওয়ানএক্স বেট’সহ বিভিন্ন অনলাইন জুয়ার প্ল্যাটফর্ম ঘিরে ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে গড়ে উঠেছে এজেন্ট ও সাব-এজেন্টের নেটওয়ার্ক।
নিবন্ধিত কুতুপালং ক্যাম্পের ই ব্লকের রোহিঙ্গা তাহেরের বিরুদ্ধে ‘ওয়ানএক্স বেট’ জুয়ার এজেন্ট হিসেবে কাজ করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়রা বলছে, ক্যাম্পের বিভিন্ন ব্লকে সাব-এজেন্ট রেখে তাহের এই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
জুয়ায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের টাকা ধার দিয়ে কিংবা নানা প্রলোভন দেখিয়ে অনলাইন জুয়ায় জড়ানো হয়। বিনিময়ে ওই ব্যক্তিদের কাছ থেকে কমিশন পান এজেন্ট ও সাব-এজেন্টরা। অনলাইন জুয়া ‘ওয়ানএক্স বেট’র এজেন্ট তাহের জুয়ায় আসক্তদের টাকা ধার দিয়ে আসরে বসান। পালংখালী মরা গাছতলা এলাকার স্থানীয় এক বাসিন্দা এই অনলাইন জুয়ার মাস্টার এজেন্ট হিসেবে পরিচিত।
ক্যাম্পের বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনলাইন জুয়ার নেশায় পড়ে অনেকে ধার-দেনায় জড়িয়ে পড়েছেন। কেউ স্বর্ণ বন্ধক রাখছেন, কেউ বিক্রি করছেন। আবার কেউ জুয়ার টাকা জোগাড় করতে চুরি, ছিনতাই কিংবা অন্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন।
ক্যাম্প-৬-এ এক রোহিঙ্গা তাঁর স্ত্রীর স্বর্ণ বিক্রি করে অনলাইন জুয়ায় সর্বস্ব হারানোর পর স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তুমুল বিরোধ সৃষ্টি হয়। এক পর্যায়ে ওই ব্যক্তি স্ত্রীকে হত্যা করেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। এ ছাড়া জুয়ার টাকা জোগাড় করতে অপহরণের ঘটনাও ঘটছে।
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার ভয়াবহতার চিত্র উঠে এসেছে এপিবিএন-৮ ব্যাটালিয়নের সাম্প্রতিক এক অভিযানে। এপিবিএন পুলিশের ক্যাম্প-৮ ইস্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক আবদুর রাজ্জাক গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ক্যাম্পের যুবকদের মধ্যে অনলাইন জুয়া মহামারি আকার ধারণ করেছে। এর প্রধান কারণ, তাদের করার মতো কোনো কাজ নেই। ফলে তরুণ ও যুবক শ্রেণি অনলাইন জুয়ায় ডুবে রয়েছে।’
এপিবিএন এই কর্মকর্তা বলেন, ‘তবে আমরা বসে নেই। খবর পেলেই অভিযান চালিয়ে আটকের পর মামলা দায়ের করা হচ্ছে।’
তিনি জানান, বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ৮ ইস্ট ব্লকে সম্প্রতি অভিযানে গিয়ে এপিবিএন দল রীতিমতো বিস্মিত হয়। দেখতে পাওয়া যায় ওখানকার একটি ঘরে অন্তত ২০ জন রোহিঙ্গা যুবক জুয়ায় মত্ত। অভিযান টের পেয়ে পেছনের দরজা দিয়ে বেশির ভাগ পালিয়ে গেলেও ধরা পড়েন চার রোহিঙ্গা। সেই সঙ্গে উদ্ধার করা হয় জুয়া খেলায় ব্যবহৃত ১৮টি মোবাইল।
পরিদর্শক রাজ্জাক জানান, এক রোহিঙ্গা তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের ক্যাম্পের বাইরে ভাড়া বাসায় রেখে ক্যাম্পের ঘরটিকে অনলাইন জুয়ার আসর বানিয়েছেন। সেখানে ইন্টারনেট লাইনের সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ওই রোহিঙ্গার জুয়া খেলায় ব্যবহারের জন্য রয়েছে অন্তত ২০টি মোবাইল। ইন্টারনেট লাইনসহ প্রতি মোবাইলে ঘণ্টায় এক থেকে দেড় শ টাকা ভাড়ায় রোহিঙ্গা যুবকরা জুয়ায় অংশ নেন।
তিনি বলেন, ‘ক্যাম্পের ভেতরে বর্তমানে অনলাইন জুয়া ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন দোকানেও এর কার্যক্রম চলছে। চা বা অন্যান্য সামগ্রী বিক্রির আড়ালে অনেক দোকানে ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে অনলাইন জুয়ার আসর বসানো হয়।’
রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনেক অপরাধের পেছনে অনলাইন জুয়ার কথা বলছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনী ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বর্তমানে বেশ কিছু অনলাইন জুয়ার সাইট জনপ্রিয়। অনলাইন জুয়ার অ্যাকাউন্টে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা ঢোকাতে হয় এবং ক্যাশআউটও করতে হয়। রোহিঙ্গা ছাড়াও স্থানীয় অনেক লোকজনও বড় অঙ্কের লেনদেনে জড়িয়ে পড়েছেন।
জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশন (ইএনএইচসিআর) ২০২৪ সালের শুরুর দিকে ‘জয়েন্ট প্রটেকশন মনিটরিং’ প্রতিবেদনে ক্যাম্পে অনলাইন জুয়ার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। তাতে বলা হয়েছিল, অনলাইন জুয়ার কারণে পারিবারিক সহিংসতা যেমন বাড়ছে, তেমনি তরুণ রোহিঙ্গারা জড়িয়ে পড়ছেন মাদক ইয়াবা কারবারে।
সংস্থাটির প্রতিবেদনে গত এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ক্যাম্পে হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজি, শারীরিক নির্যাতন, গোলাগুলি, সশস্ত্র গ্রুপে যোগদানসহ ৪৭০টি ঘটনার কথা তুলে ধরা হয়েছে। এসব ঘটনায় ৫৯২ জন রোহিঙ্গা ভুক্তভোগী হয়েছেন বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। এর আগে চলতি বছরের প্রথম প্রান্তিকের (জানুয়ারি-মার্চ) প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, এমন ৪৫৫টি ঘটনায় ভুক্তভোগী হয়েছেন ৮৩২ রোহিঙ্গা। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আর্থিক কষ্ট ও জীবিকার সীমাবদ্ধতার কারণে উচ্চ আসক্তির অনলাইন জুয়া দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর ফলে ধার-দেনা নিয়ে স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিরোধও বাড়ছে। ঘটছে শারীরিক সহিংসতাও।
কক্সবাজারের উখিয়া, টেকনাফ, ভাসানচরসহ ৩৪টি ক্যাম্পে বর্তমানে রোহিঙ্গার সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। তবে সর্বশেষ ইউএনএইচসিআর ও বাংলাদেশ সরকারের হিসাবে কক্সবাজার ও ভাসানচর মিলিয়ে বাংলাদেশে নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১২ লাখ দুই হাজার ৩৪ জন। যাদের অর্ধেকের বেশি শিশু। গত জুলাই পর্যন্ত হিসাব অনুযায়ী, ১৮ বছরের বেশি বয়সী রোহিঙ্গার সংখ্যা পাঁচ লাখ ৭৫ হাজার ৫৫৭ জন। নবজাতক থেকে ১৭ বছর বয়সী শিশুর সংখ্যা ছয় লাখ ২৬ হাজার ৪৭৭ জন। শিশুদের মধ্যে চার লাখ ৫০ হাজার ৫১৮ জনের বয়সই ১১ বছরের নিচে, যা মোট রোহিঙ্গার ৩৭.৫ শতাংশ।