লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন
২২ জুলাই ২০২৪। দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তখন অত্যন্ত উত্তপ্ত। প্রতিদিনই আহত ও নিহতের সংবাদ সবাইকে গভীরভাবে ব্যথিত করছিল। সেদিন আমি জানতাম না পরবর্তী দুই সপ্তাহে কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি জানতাম না রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিণতি কী হবে। আমি জানতাম না কে বিজয়ী হবে কিংবা কে পরাজিত হবে। আমি শুধু জানতাম, বাংলাদেশের সন্তানরা মারা যাচ্ছে।
সন্তানের মৃত্যু সহ্য করা যায় না। তাই ২২ জুলাই আমি আমার ফেসবুকে দীর্ঘ পোস্ট লিখেছিলাম। তার মূল বক্তব্য ছিল অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত—‘নিজ দেশের জনগণের ওপর গুলি চালাবেন না, তাদের হত্যা করবেন না।’
অনেকেই আমাকে প্রশ্ন করেছেন—কেন পোস্টটি লিখেছিলাম? এটি কি কোনো রাজনৈতিক অবস্থান ছিল? আমার উত্তর অত্যন্ত স্পষ্ট—‘না’। এটি কোনো ব্যক্তি, সরকার কিংবা রাজনৈতিক দলের পক্ষে বা বিপক্ষে লেখা ছিল না। এটি ছিল বাংলাদেশ রাষ্ট্রের পক্ষে, বাংলাদেশের মানুষের পক্ষে এবং আমাদের গর্বিত সশস্ত্র বাহিনী ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর দীর্ঘমেয়াদি মর্যাদা ও জনগণের আস্থা রক্ষার পক্ষে একজন নাগরিকের বিনীত আবেদন।
আমি লিখেছিলাম একজন মানুষ হিসেবে, একজন নাগরিক হিসেবে, একজন শিক্ষক হিসেবে এবং একজন সাবেক সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে।
দীর্ঘ সামরিক জীবনে বহুবার সরকারি দায়িত্ব পালন করেছি। একজন পদাতিক বাহিনীর কর্মকর্তা ছিলাম। তিনবার গোয়েন্দা বিভাগে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছি। সরকারি দায়িত্ব পালনের সময় বহুবার আমার হাতে কিংবা পাশে অস্ত্র ছিল। কিন্তু কখনো নিজের দেশের নিরস্ত্র নাগরিকদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে অস্ত্র প্রয়োগ করার প্রয়োজন অনুভব করিনি।
আমার সামরিক প্রশিক্ষণ আমাকে শিখিয়েছে—একজন পেশাদার সৈনিকের সবচেয়ে বড় শক্তি কেবল অস্ত্র ব্যবহার করার দক্ষতায় নয়, বরং কখন সেই অস্ত্র ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকতে হবে, সেই প্রজ্ঞায়। আমি বিশ্বাস করি, একটি পেশাদার বাহিনীর সবচেয়ে বড় অর্জন তার অস্ত্রের শক্তি নয়; জনগণের ভালোবাসা, আস্থা ও শ্রদ্ধা অর্জন করা।
সে দিনের ফেসবুক পোস্টের পেছনে কয়েকটি কারণ ছিল। প্রথমত, আমি চাইনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের জীবন অকালেই ঝরে পড়ুক। দ্বিতীয়ত, আমি চাইনি আমাদের গর্বিত নিরাপত্তা বাহিনীগুলোকে এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হোক, যেখানে তাদেরকে নিজেদের দেশের নাগরিকদের বিরুদ্ধে শক্তি প্রয়োগের কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তৃতীয়ত, আমি চাইনি রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যকার পারস্পরিক আস্থার সম্পর্ক কোনো অপূরণীয় ক্ষতির সম্মুখীন হোক।
সেই ফেসবুক পোস্টের একটি বাক্য ছিল—‘একটি মায়ের বুক খালি হলে তাকে কেউ আর কখনো ফিরিয়ে দিতে পারবেন না।’ অর্থাৎ আমি মায়েদের জন্যও লিখেছিলাম। কারণ একজন মায়ের কাছে তার সন্তানের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নেই। তার কাছে তার সন্তানের একটাই পরিচয়—সে তার সন্তান। রাজপথে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটি শুধু একজন ছাত্র নয়; সে কারও আদরের সন্তান, কারও ভাই, কারও স্বপ্ন, কারও সমগ্র পৃথিবী। আজ যারা ছাত্র, আগামীকাল তারাই হবে সৈনিক, শিক্ষক, বিচারক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী কিংবা রাজনৈতিক নেতা। তাদের জীবন রক্ষা করা মানেই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করা।
আমরা আপন পাঁচ ভাই বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং বিমান বাহিনীতে কর্তব্য পালন করে অবসর গ্রহণ করেছি। আমাদের দ্বিতীয় প্রজন্মেও বর্তমানে চারজন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কর্মরত রয়েছেন। আমাদের নয়জনের মধ্যে ছয়জনই ফৌজদারহাট ও মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছি। তাই আমি শুধু অন্যের সন্তানের জন্য লিখিনি, আমি আমার নিজের পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও লিখেছিলাম। আমি চাইনি, বাংলাদেশের কোনো তরুণ অফিসারকে তাঁর কর্মজীবনের শুরুতেই এমন একটি পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হোক, যেখানে তাঁকে নিজের দেশের সন্তানের দিকে অস্ত্র তাক করতে হয়।
কেন অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তারা উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন
দুই বছর আগের সেই ক্রান্তিকালে বহু অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন। তারা চাননি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম আর নিহত হোক। তারা চাননি আমাদের নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানগুলোর মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হোক। তারা চাইছিলেন রাজনৈতিক সংকটের সমাধান রাজনৈতিকভাবেই হোক, অস্ত্রের মাধ্যমে নয়। শেষে আমরা এই সংকট থেকে বের হয়ে পেরেছি আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। ইতিহাস অবশ্যই এই সময়কালকে বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করবে। কিন্তু আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা একটি—কোনো রাজনৈতিক সংকটের মূল্য যেন মানুষের জীবন দিয়ে পরিশোধ করতে না হয়।
রাষ্ট্রের শক্তি তার অস্ত্রে নয়, তার ন্যায়বিচারে। গণতন্ত্রের শক্তি তার স্লোগানে নয়, তার সহনশীলতায়। আর একটি জাতির শক্তি তার অর্থনীতিতে নয়, তার মানুষের পারস্পরিক আস্থা ও মানবিক মূল্যবোধে।
আমাদের প্রত্যাশা ছিল এবং আজও রয়েছে—বাংলাদেশে আইনের শাসন আরও সুসংহত হবে। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ আরও শক্তিশালী হবে। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান আরও অধিকতর পেশাদার, জবাবদিহিমূলক ও মানবিক হবে। ভবিষ্যতে কোনো সরকারই যেন এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি না করে, যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন যেন সর্বদা সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন হয়।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিও আমাদের প্রত্যাশা ছিল একটি অধিকতর ন্যায়ভিত্তিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত্তি রচনা করা। একইভাবে বর্তমান রাজনৈতিক সরকারের প্রতিও প্রত্যাশা অত্যন্ত সাধারণ—বাংলাদেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন, মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকার সর্বোচ্চ গুরুত্ব লাভ করুক।
মানুষের জীবন, মানবিক মর্যাদা এবং সাংবিধানিক অধিকার সর্বাগ্রে মূল্যবান বিবেচিত হোক; রাজনৈতিক মতভেদের কারণে আর কোনো নাগরিককে যেন প্রাণ দিতে না হয়। রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠান জনগণের আস্থা, ভালোবাসা ও ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে উঠুক এবং সাংবিধানিক, পেশাগত ও মানবিক দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ মান বজায় রাখুক।
ক্ষমতার চেয়েও মানুষের জীবন অধিক মূল্যবান বিবেচিত হোক এবং ভবিষ্যতে কোনো সরকারই যেন এমন একটি পরিস্থিতির সৃষ্টি না করে, যেখানে রাষ্ট্র ও জনগণ মুখোমুখি অবস্থানে দাঁড়িয়ে যায়। নিহত, আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি এবং তাঁদের পরিবারের প্রতি রাষ্ট্র তার নৈতিক ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করুক এবং যথাযথ পুনর্বাসন নিশ্চিত করুক।
ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করুক, প্রতিশোধ থেকে নয়; মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং পারস্পরিক সহনশীলতার চর্চা আরও সুদৃঢ় হোক। রাজনৈতিক ক্ষমতার পরিবর্তন সর্বদা জনগণের ভোট, সাংবিধানিক বিধান এবং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংঘটিত হোক।
বাংলাদেশ এমন একটি রাষ্ট্রে পরিণত হোক, যেখানে একজন সৈনিক, একজন ছাত্র, একজন শিক্ষক, একজন কৃষক এবং প্রতিটি নাগরিক সমান মর্যাদা, ন্যায়বিচার ও নিরাপত্তা নিয়ে বেঁচে থাকতে পারেন।
চব্বিশ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাবলি থেকে আমরা সবাই—সরকার, বিরোধী দল, সশস্ত্র বাহিনী, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষক, ছাত্র, রাজনৈতিক কর্মী এবং সাধারণ নাগরিক—একটি জাতীয় অঙ্গীকার গ্রহণ করতে পারি।
আমরা রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু বাংলাদেশের কোনো সন্তান যেন আর কখনো রাজনৈতিক সংঘাতের কারণে প্রাণ হারাতে না হয়। আমরা মতের ভিন্নতা নিয়ে বিতর্ক করব, কিন্তু জীবন রক্ষার প্রশ্নে আমরা সবাই এক ও অভিন্ন থাকব।
আজ আমার বয়স প্রায় পঁয়ষট্টির কাছাকাছি। জীবনের দীর্ঘ পথ পেরিয়ে এসেছি। ছাত্র হিসেবে শিখেছি, সৈনিক হিসেবে কর্তব্য পালন করেছি, শিক্ষক হিসেবে শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। আজ আমার চাওয়া খুব বেশি নয়। শুধু এমন একটি বাংলাদেশ দেখে যেতে চাই, যেখানে আর কোনো মায়ের বুক খালি হবে না, আর কোনো সৈনিককে নিজের দেশের সন্তানের দিকে অস্ত্র তাক করতে হবে না এবং আর কোনো তরুণকে তার স্বপ্ন নিয়ে রক্তাক্ত রাজপথে লুটিয়ে পড়তে হবে না।
- লে. কর্নেল (অব.) মো. শাহাদাত হোসেন: অবসরপ্রাপ্ত সেনাকর্মকর্তা, শিক্ষক, লেখক ও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক বিশ্লেষক