Image description

আন্তর্জাতিক জার্নালে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর শিক্ষকদের গবেষণা এখন প্রায়ই প্রকাশ করা হচ্ছে। আবার জার্নালে গবেষণা প্রকাশের পর স্বল্পসংখ্যক নিবন্ধ প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটছে।

মূলত আটটি প্রধান কারণে গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়। এগুলো হচ্ছে তথ্য জালিয়াতি বা বিকৃতি, চৌর্যবৃত্তি, গুরুতর গবেষণাগত বা পদ্ধতিগত ত্রুটি, একই গবেষণা নিবন্ধ একাধিকবার প্রকাশ, ভুয়া বা ফরমায়েশি বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন, লেখকত্বসংক্রান্ত অনিয়ম, গবেষণা নীতিমালা লঙ্ঘন এবং স্বার্থের সংঘাত গোপন করা।

আবার লেখকরাও তাঁদের নিবন্ধে কোনো ভুল বা ত্রুটি আছে বলে মনে করলে তা প্রত্যাহার করার অনুরোধ করে থাকেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।

শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় র‌্যাংকিংয়ে ভালো অবস্থান অর্জনের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক জার্নালে এই গবেষণা প্রকাশ খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ গবেষণার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় সেটি কোন জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে, কী ধরনের পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে গেছে এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সমাজে সেটা কতটা গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জার্নাল যখন কোনো নিবন্ধ প্রত্যাহার করে, তখন তাদের উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে লেখকদের অবহিত করতে হয় এবং তাঁদের মতামত জানতে চাওয়া হয়। যদি লেখকদের জবাব জার্নালের কাছে গ্রহণযোগ্য না হয়, তবে তারা গবেষণাপত্রটি প্রত্যাহার করে নেয় এবং লেখকদের তা জানিয়ে দেয়।

সূত্র জানায়, বিভিন্ন বিষয়ভিত্তিক গবেষণার জন্য হাজারো আন্তর্জাতিক জার্নাল রয়েছে। তবে গবেষকরা সাধারণত এমন জার্নাল বেছে নেন, যেগুলো স্কোপাস বা ওয়েব অব সায়েন্সের মতো ডেটা বেইসে অন্তর্ভুক্ত। এসব ডেটা বেইসে অন্তর্ভুক্ত জার্নালকে গবেষণা মূল্যায়নে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জার্নালের ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের তথ্য ঘেঁটে দেখা গেছে, বিশ্বের অনেক দেশের গবেষণাপত্র প্রত্যাহার করা হয়েছে। এর মধ্যে চীনের ১৪ হাজার ৩৮১টি, ভারতের দুই হাজার ৩২৫টি, যুক্তরাষ্ট্রের এক হাজার ৪২৪টি, সৌদি আরবের এক হাজার ১৭৪টি, পাকিস্তানের ৬২৬টি, ইরানের ৫৬০টি, মিসরের ৫১৮টি, ইউকের ৩৯৪টি, মালয়েশিয়ার ২৮২টি, কানাডার ২০৭টি এবং বাংলাদেশের ১২৫টি গবেষণা প্রত্যাহারের ঘটনা ঘটেছে।

শিক্ষকরা বলছেন, অন্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের গবেষকদের গবেষণার সংখ্যা অপ্রতুল। এর পেছনে প্রধান কারণ হচ্ছে, গবেষণা বাজেট খুবই সীমিত। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য সরকারি বরাদ্দ থাকলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণার বাজেট নিজেদেরই জোগাড় করতে হয়। এর পরও সীমিত গবেষণা অনুদান, আধুনিক ল্যাবের অভাব, উন্নত যন্ত্রপাতির স্বল্পতা এবং উচ্চমাত্রার শিক্ষাদানের দায়িত্ব পালন করেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষক ও গবেষক নিরলসভাবে গবেষণা করে যাচ্ছেন। 

জানা যায়, একটি মানসম্মত জার্নালে কোনো নিবন্ধ পর্যালোচনার জন্য তিন-চারজন পর্যালোচকের কাছে পাঠানো হয়। তাঁরা সাধারণত অত্যন্ত পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করেন এবং গবেষণাপত্রটিকে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পরিবর্তনের পরামর্শ দেন। লেখক যদি পর্যালোচকদের সন্তুষ্ট করতে না পারেন, তবে নিবন্ধটি প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং জার্নালে প্রকাশের অনুমতি দেওয়া হয় না। বেশির ভাগ জার্নাল গোপন পর্যালোচনা পদ্ধতি অনুসরণ করে। পর্যালোচকরা জানেন না লেখক কে এবং লেখকরাও জানেন না পর্যালোচক কারা। সুতরাং ভুয়া পিয়ার রিভিউয়ের দায়ভার জার্নাল কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়, কারণ তারাই  পর্যালোচক নির্বাচন করে। এ ক্ষেত্রে লেখকদের কোনো ভূমিকা থাকে না। নিবন্ধে অপ্রাসঙ্গিক তথ্যসূত্র থাকার অভিযোগের ক্ষেত্রেও জার্নাল কর্তৃপক্ষই বেশি দায়ী।

ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশল ইউনিভার্সিটির (ইউআইইউ) উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবুল কাশেম মিয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আন্তর্জাতিক জার্নালে গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার যে শুধু চৌর্যবৃত্তির কারণে হয়, এটা ঠিক নয়। কমপক্ষে আট থেকে ১০টি কারণে প্রত্যাহার হয়। তবে চৌর্যবৃত্তির কারণে খুব কমই প্রত্যাহার হয়। টেকনিক্যাল কারণেই বেশি প্রত্যাহার হয়। আবার অনেক গবেষক নিজেই নিজের গবেষণা প্রত্যাহার করে নেন। অনেক সময় সাইটেশন ইনপ্রোপার হয়। আবার ডেটায় ভুল থাকলেও প্রত্যাহার করা হয়। তবে কয়েকটি গবেষণা প্রত্যাহারের কারণে পুরো শিক্ষকসমাজকে দোষী বানানো ঠিক নয়।’

নিবন্ধগুলো প্রত্যাহার করার অন্য কারণগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অনেক জার্নালের অত্যধিক প্রসেসিং চার্জ বা নিবন্ধ প্রক্রিয়াকরণ ফি রয়েছে। সাধারণত প্রতি নিবন্ধের জন্য দেড় লাখ থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। অর্থ উপার্জনের উদ্দেশ্যে নিম্নমানের নিবন্ধ গ্রহণ করার মাধ্যমে তারা এক ধরনের অন্যায্য পর্যালোচনা প্রক্রিয়া অনুসরণ করে আসছে। তাদের এই পর্যালোচনা পদ্ধতি নিয়ে ওয়েব অব সায়েন্স বা স্কোপাস-এর মতো সংস্থাগুলো প্রশ্ন তুলেছে। তাই এই সংস্থাগুলো কালো তালিকাভুক্ত হলে নিজেদের ব্যাবসায়িক ক্ষতি হবে—এমন আশঙ্কায় অনেক জার্নাল তাদের স্বচ্ছতা বা নিরপেক্ষতা প্রমাণের লক্ষ্যে যথেচ্ছভাবে প্রকাশিত নিবন্ধগুলো প্রত্যাহার করে থাকে।

সূত্র জানায়, দেশে এখন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ৫৫ এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা ১১৬। মোট ১৭১টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ১৬৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম চলমান। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, ১৩২টি বিশ্ববিদ্যালয়েরই গবেষণা ব্যয় ছিল দুই কোটি টাকার নিচে। সরকারি ৩৩টি এবং বেসরকারি ৯৯টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় খুবই করুণ। গবেষণায় কম বিনিয়োগের কারণে আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিং, উদ্ভাবন, পেটেন্ট ও জ্ঞান উৎপাদনে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পিছিয়ে পড়ছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা ব্যয় নিয়ে ইউজিসি সর্বশেষ ২০২৩ সালের তথ্য প্রকাশ করেছে। সেখানে দেখা যায়, সরকারি ৫৩টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ছিল ১২০ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ব্যয় করেছে ১৫ কোটি টাকা। যদিও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা বরাদ্দ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ কোটি ৫৭ লাখ টাকা। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গবেষণা ব্যয় করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ১১ কোটি ৬০ লাখ টাকা। এরপর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ১০ কোটি টাকা, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় আট কোটি টাকা, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ছয় কোটি ৮৫ লাখ টাকা, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচ কোটি টাকা, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) চার কোটি ৬৪ লাখ টাকা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় চার কোটি ৪০ লাখ টাকা, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় চার কোটি টাকা এবং গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সাড়ে তিন কোটি টাকা গবেষণায় ব্যয় করেছে।

অন্যদিকে ২০২৩ সালে বেসরকারি ১১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ব্যয় ছিল ১৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় একাই ব্যয় করেছে প্রায় ৬৪ কোটি টাকা। এরপর ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি প্রায় ২৭ কোটি টাকা, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশ সাড়ে ১৪ কোটি টাকা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস পৌনে ১২ কোটি টাকা, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ১০ কোটি টাকা, ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাড়ে ৯ কোটি টাকা, ইনডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ ছয় কোটি টাকা এবং এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ সোয়া তিন কোটি টাকা গবেষণা খাতে ব্যয় করেছে। অর্থাৎ নিজেরা জোগাড় করে হলেও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো দিন দিন গবেষণা ব্যয় বাড়াচ্ছে।

সূত্র জানায়, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধে একটি নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন। এর মাধ্যমে সাইটেশন, তথ্য-উপাত্ত ব্যবহারের নিয়মসহ গবেষণার নৈতিক দিকগুলো সম্পর্কে গবেষকরা পরিষ্কার ধারণা পাবেন। খসড়া নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, প্রশাসক এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। ইউজিসির উদ্যোগে কেন্দ্রীয়ভাবে একটি নীতিমালা তৈরি করা হলে তা সবার জন্য অভিন্ন নির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে।

ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফরিদ আহমদ সোবহানী কালের কণ্ঠকে বলেন, নানা কারণে গবেষণা নিবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়। এর মধ্যে চৌর্যবৃত্তি শুধু একটি কারণ। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আন্তর্জাতিক র‌্যাংকিংয়ের ক্ষেত্রে গবেষণা একটি বড় বিষয়। অনেক জার্নালে গবেষণা প্রকাশের ফি দুই থেকে চার লাখ টাকা। ফলে এটা একটা ব্যবসায়ও পরিণত হয়েছে। ফলে ইদানীং গবেষণা নিবন্ধ প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যাহারের বিষয়টিও সামনে এসেছে।