Image description

গত জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ইস্তেহারের চারটি বহুল আলোচিত প্রতিশ্রুতি ছিল। সেগুলি হল ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড বিতরণ, খাল খনন কর্মসূচি এবং বৃক্ষরোপণ। নতুন সরকার গঠনের পর স্বল্প সময়ের মধ্যেই এসব প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বাংলা নববর্ষকে সামনে রেখে কৃষি কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। অতীতে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও গড়িমসি থাকলেও, এই সরকারের তুলনামূলক দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়াটা ইতিবাচক হিসেবেই দেখা যায়।

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রাথমিকভাবে টাঙ্গাইল সদরসহ দেশের ১১টি উপজেলায় একযোগে এই কার্যক্রম শুরু হবে। প্রথম ধাপে প্রায় ২১ হাজার ৫০০ কৃষকের কাছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পর্যায়ক্রমে আগামী পাঁচ বছরে প্রায় দুই কোটি কৃষককে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হবে। 

কিন্তু এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে। কৃষি কার্ড কি সত্যিই নতুন কোনো ধারণা? বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশে কৃষক আইডি কার্ডের ধারণা নতুন নয়। এর সূচনা হয় ২০০৯ সালে। সরকার কৃষকদের একটি জাতীয় তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার মাধ্যমে কৃষি ভর্তুকি ও প্রণোদনা সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। একই সঙ্গে কৃষকদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার জন্য ১০ টাকায় হিসাব খোলার সুযোগও দেওয়া হয়। এটি নিঃসন্দেহে আর্থিক ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ ছিল। 

২০২০ সালের ইস্তাম্বুল কর্মপরিকল্পনা (আইপিওএ) ২০১১–২০২০ অনুযায়ী, বাংদেশে নিবন্ধিত কৃষকের সংখ্যা ২ কোটি ৮ লাখ ১৩ হাজার ৪৭৭ জন। অর্থাৎ কৃষক সনাক্তকরণ ও ডাটাবেস তৈরির একটি বড় কাঠামো ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছিল। বর্তমান উদ্যোগে প্রায় একই সংখ্যক কৃষককে অন্তর্ভুক্ত করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

কিন্তু অতীতের অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের খুব বেশি আশাবাদী হওয়ার সুযোগ দেয় না। কৃষি কার্ড বিতরণ ও ডাটাবেস তৈরির দায়িত্ব ছিল মূলত কৃষি বিভাগের ওপর। মাঠপর্যায়ে এই প্রক্রিয়ায় নানা ধরনের ত্রুটি, অনিয়ম এবং তথ্যের অসঙ্গতি পরিলক্ষিত হয়। বহু ক্ষেত্রে প্রকৃত কৃষক তালিকাভুক্ত হননি, আবার অপ্রাসঙ্গিক বা ভুয়া তথ্য দিয়ে কার্ড তৈরি হয়েছে। ফলে যে ডাটাবেসের ওপর ভিত্তি করে কৃষকদের সহায়তা দেওয়ার কথা, সেটিই হয়ে ওঠে প্রশ্নবিদ্ধ।

সমস্যার প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখা যায়, সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে। আমন ও বোরো মৌসুমে সরকার যে কৃষকদের কাছ থেকে ধান সংগ্রহ করে, সেই তালিকাও এই কৃষক ডাটাবেসের ওপর নির্ভরশীল। নিয়ম অনুযায়ী, কার্ডধারী কৃষকদের আবেদন করতে হয়, তারপর লটারির মাধ্যমে নির্বাচন করা হয় কারা সরকারি গুদামে ধান বিক্রি করতে পারবেন। তবে বাস্তবে অধিকাংশ কৃষকই জানেন না কখন আবেদন শুরু হয়, কীভাবে আবেদন করতে হয়, বা লটারির দিন ঠিক কখন।

বিগত দিনে অভিযোগ উঠেছিল, কৃষি কার্ডের নিবন্ধনে অনিয়মের বহু অভিযোগ উঠেছ। মাঠপর্যায়ের উপসহকারি কৃষি কর্মকর্তারা এনআইডি কার্ড সংগ্রহ করে নিবন্ধন করিয়েছেন। তাদের অনেকের আবার জমিই ছিল না। তাদের ডেটাবেসের তথ্য  সংশ্লিষ্ট দপ্তরের নিয়ন্ত্রণে থাকত। তারাই কৃষকদের পক্ষে আবেদন করতেন। ফলে অনেক কৃষক জানতই না তাদের কৃষি কার্ড আছে বা তারা সরকারি খাদ্যগুদামে ধান দেওয়ার জন্য লটারিতে নির্বাচিত হয়েছেন। এই জটিলতার কারনে বছরের পর বছর ধরে সরকারি ধান সংগ্রহ অভিযান ব্যর্থ হয়েছে। এই ধরনের বহু সংবাদ গণমাধ্যমে প্রকাশিত ও প্রচারিত হয়েছে।

এই অভিজ্ঞতা স্পষ্টতই বলা যায়, কেবল কার্ড বা ডাটাবেস তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান করা যাবে না। বরং সঠিক তথ্য, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে এই ধরনের উদ্যোগ উল্টো অনিয়ম ও দুর্নীতির নতুন ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।

কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, অতীতের পুনরাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসার কোন তৎপরতা দৃশ্যমান নয়। অথচ বর্তমান বাস্তবতায় এটিই হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে জরুরি কাজ। প্রশ্ন উঠছে, সরকার কি সত্যিই পূর্ববর্তী কার্যক্রমের একটি যথাযথ ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করেছে? কোথায় ব্যর্থতা ছিল, কারা বঞ্চিত হয়েছে, কোন পর্যায়ে অনিয়ম ঘটেছে- এসব বিষয়ে কি কোনো স্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য বিশ্লেষণ রয়েছে? নাকি জনতুষ্টির উদ্দেশ্যে পুরনো উদ্যোগকেই নতুন নামে বা নতুন মোড়কে আবার সামনে আনা হচ্ছে? এই প্রশ্নগুলো এখন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তাই এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

কৃষি কার্ড বিতরণের ক্ষেত্রে আরেকটি জটিলতা হলো জমির মালিকানা। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৪৫ শতাংশ কৃষক বর্গাচাষী। তবে এদের সনাক্তকরণ সহজ নয়। কৃষি কার্ডকে কার্যকর করতে হলে প্রথমেই একটি নির্ভুল, হালনাগাদ এবং যাচাইযোগ্য ডাটাবেস তৈরি করা অপরিহার্য। এই ডাটাবেস এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যাতে সেখানে কেবল প্রকৃত কৃষকরাই অন্তর্ভুক্ত হতে পারেন। শুধুমাত্র জমির মালিকানার উপর ভিত্তি করে তালিকা প্রস্তুত করলে প্রকৃত চাষিরা বাদ পড়ে যাবে, আবার অ-কৃষকরাও তালিকায় ঢুকে পড়ার সুযোগ পাবে। তাই চাষাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সঠিকভাবে শনাক্ত করা জরুরি।এই জটিল বাস্তবতা সমাধান না করে শুধু জনতুষ্টির জন্য তড়িঘরি করে কার্ড বিতরণ করলে, অতীতের ভুলের পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

দ্বিতীয়ত, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে সরাসরি কৃষকের কাছে তথ্য ও আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে। মোবাইল ব্যাংকিং, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং আধুনিক আইডি কার্ড সিস্টেমের মাধ্যমে সরকারের সহায়তা নির্ভুলভাবে কৃষকের হাতে পৌঁছাতে পারে। এটি শুধু আর্থিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করবে না, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার মানও বাড়াবে।

সরকারি অর্থ ব্যয় আগেও হয়েছে, ভবিষ্যতেও হবে। এটাই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু সেই ব্যয়ের সঙ্গে জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে কোনো উদ্যোগই টেকসই বা বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারে না। তাই নতুন কর্মসূচি গ্রহণের আগে প্রয়োজন অতীতকে স্বীকার করা, তার সীমাবদ্ধতা বিশ্লেষণ করা এবং সেই আলোকে একটি স্বচ্ছ ও দায়িত্বশীল কাঠামো গড়ে তোলা।

রঞ্জন কুমার দে: সাংবাদিক ও অ্যাকটিভিস্ট