ঢাকার মতিঝিলে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন তানভীর হোসেন। গত এক বছরে তার বেতন-ভাতা এক টাকাও বাড়েনি। কিন্তু তাকে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, মুরগি ও সবজির মতো পণ্য কিনতে হয়েছে বেশি দাম দিয়ে। এক মাস আগেও খুচরা বাজারে সোনালি মুরগি বিক্রি হয়েছে ৩২০-৩৩০ টাকায়। সেই মুরগি জাত ও মানভেদে কিনতে তানভীরকে এখন গুনতে হচ্ছে ৪৫০-৪৯০ টাকা। এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট তীব্র জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। শুধু তানভীর একা নয়, দেশের সব নাগরিক মূল্যস্ফীতির শিকার। নিত্যপণ্যের বাজারে অস্থিরতা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ মানুষের ওপর চাপ আরও বেড়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সরকারের লক্ষ্য অর্জিত না হওয়ায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রণয়নে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে সরকার। এমন বাস্তবতায় বাজেটে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও তা অর্জনে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ার শঙ্কা রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, চলতি বছরের মার্চে সার্বিক মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৪ শতাংশ এবং খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রবণতা আগামী বাজেট বাস্তবায়নের জন্য একটি বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে। মূল্যস্ফীতির প্রধান চাপ আসছে খাদ্য খাত থেকে। বিশেষ করে চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, শাকসবজি, মাছ-মাংস ও ওষুধের দাম বৃদ্ধিতে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছেন। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত খাতেও মূল্যস্ফীতি কম নয়। বাসা ভাড়া, পরিবহণ, চিকিৎসা, শিক্ষা ও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে এই খাতের মূল্যস্ফীতি উচ্চ অবস্থানে রয়েছে।
ফলে সামগ্রিকভাবে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান ড. এম মাসরুর রিয়াজ যুগান্তরকে বলেন, জ্বালানি খরচ বাড়লে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। এতে উৎপাদকরা বাধ্য হয়ে পণ্যের দাম বাড়ান। একই সঙ্গে পরিবহণ খরচ বাড়ার কারণে সরবরাহ চেইনেও চাপ পড়ে। আসন্ন বাজেটে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে মূল্যস্ফীতি কমানোর উদ্যোগ থাকা প্রয়োজন। বাজারে স্বস্তি ফেরানোর সবচেয়ে উদ্যোগ হবে মূল্যস্ফীতি কমিয়ে পণ্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে নিয়ে আসা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বহুমুখী কৌশল নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বাড়াতে আমদানি শুল্ক হ্রাস, সরকারি মজুত বৃদ্ধি, ওএমএস কার্যক্রম জোরদার, বাজার তদারকি বাড়ানো এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা। এছাড়া মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় হাতিয়ার হলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সুদের হার বৃদ্ধি করে বাজারে অর্থের জোগান কমানো।
জানা যায়, মূল্যস্ফীতির বর্তমান চাপ মূলত তিনটি কারণে বেড়েছে। এগুলো হলো-সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, টাকার অবমূল্যায়ন এবং বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি ও পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি। এর সঙ্গে সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। ইরান-ইসরাইল উত্তেজনা এবং সম্ভাব্য সংঘাত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় ও পরিবহণ খরচে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আগামী বাজেটে একাধিক কৌশল নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে-খাদ্যপণ্যের সরবরাহ বৃদ্ধি, আমদানি সহজীকরণ, টিসিবির কার্যক্রম বৃদ্ধির পাশাপাশি নতুন উদ্যোগ ফ্যামিলি কার্ডের আওতা বাড়ানো এবং মনিটরিং জোরদার। একই সঙ্গে মুদ্রানীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব নীতিও কঠোর করার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে ব্যবসায়ীরা বলছেন, জ্বালানি ও ডলার সংকট উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। শিল্প খাতে গ্যাস ও বিদ্যুতের ঘাটতি উৎপাদন কমিয়ে দিচ্ছে, যা সরবরাহ সংকট তৈরি করে মূল্যস্ফীতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে। তারা মনে করেন, উৎপাদন ব্যয় কমাতে না পারলে বাজারে দামের চাপ কমানো যাবে না। তাই বাজেটে কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
কারণ, খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমাতে হলে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোই সবচেয়ে কার্যকর উপায়। পাশাপাশি সরবরাহ চেইনে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমাতে বাজার তদারকি জোরদার করা দরকার। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে জ্বালানি খাত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়লে সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়বে। এতে বাজেট ঘাটতি বাড়তে পারে, যা আবার মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করবে। ফলে জ্বালানি খাতে দক্ষতা বৃদ্ধি ও বিকল্প উৎসের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। এছাড়া সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে নিম্ন আয়ের জনগোষ্ঠীর ওপর মূল্যস্ফীতির প্রভাব কমানোর পরিকল্পনাও রয়েছে। খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ভর্তুকি মূল্যে চাল বিতরণ এবং নগদ সহায়তা বাড়ানোর চিন্তা করছে সরকার। সব মিলে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট হবে এক ধরনের ভারসাম্য রক্ষার প্রয়াস। একদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। অন্যদিকে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে হবে। তবে বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা, বিশেষ করে জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বিবেচনায় এই লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার বাজেট মনিটরিং ও কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিলের সভায় প্রস্তাবিত বাজেট কাঠামোর রূপরেখা উপস্থাপন করে অর্থ বিভাগ। এতে বিএনপি সরকার তাদের প্রথম বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৬ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীতকরণ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে এনে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখাই মূল লক্ষ্য। এছাড়া প্রস্তাবিত বাজেটের সম্ভাব্য আকার নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ লাখ ২০ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে ৬ লাখ ৫০ হাজার কোটি টাকা করা হতে পারে। যদিও সংশোধিত বাজেটে ঘাটতির লক্ষ্যমাত্রা জিডিপির ৩ দশমিক ৩ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছিল, দুর্বল রাজস্ব আদায় এবং ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের কারণে। আগামী অর্থবছরের ঘাটতি জিডিপির প্রায় ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হবে।