ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে বিএনপি। জাতীয় সংসদ ভবনে নির্বাচিত এমপি ও মন্ত্রীদের শপথ পাঠের মাধ্যমে নতুন সরকারের যাত্রা শুরু হবে।
এদিকে প্রস্তুতি চলছে ‘ছায়া মন্ত্রিসভা’ গঠনের। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষ নেতারা এ প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে। আর এ বিষয়টি নিয়ে চলছে নানা আলোচনা।
এরমধ্যেই সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছায়া মন্ত্রিসভা কী, সেটি নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন ঢাকা-৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করা ডা. তাসনিম জারা।
তাসনিম জারার ফেসবুক পোস্টটি হুবহু তুলে ধরা হলো -
‘ছায়া মন্ত্রিসভা (shadow cabinet) আসলে কী? ছায়া মন্ত্রীরা কি সরকারি বেতন পান? তাদের কাজ কী?
আমাদের দেশে রাজনীতি মানেই মিছিল-মিটিং, অবরোধ আর আর নির্বাচন। নির্বাচনের পর বিজয়ী দল ক্ষমতায় যায়, আর পরাজিত দল চলে যায় রাজপথে। কিন্তু ছায়া মন্ত্রিসভা যদি সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়, তবে এই 'রাস্তা অচল করার' রাজনীতি বদলে দেওয়া সম্ভব।
ছায়া মন্ত্রিসভা আসলে কী?
সরকারে যেমন প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের জন্য একজন করে মন্ত্রী থাকবেন (যেমন : স্বাস্থ্যমন্ত্রী, শিক্ষামন্ত্রী), বিরোধী দলও ঠিক তেমনি প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের বিপরীতে একজন করে ছায়া মন্ত্রী নিয়োগ দিবেন। সরকার যদি কোনো ভুল করে বা ব্যর্থ হয়, ছায়া মন্ত্রী তার প্রতিবাদ করবেন এবং বিকল্প সমাধান পেশ করবেন।
ছায়া মন্ত্রীরা কি সরকারি বেতন বা সুবিধা পান?
না। ছায়া মন্ত্রিসভার সদস্যরা সরকার থেকে কোনো বেতন, গাড়ি বা সরকারি সুবিধা পান না। এটি সম্পূর্ণ একটি স্বেচ্ছাসেবী রোল। তবে এটি জনগণকে দেখানোর একটা বিশাল সুযোগ যে, তারা দেশ চালানোর জন্য কতটা যোগ্য।
ছায়া মন্ত্রিসভা কেন প্রয়োজন?
যখন কোনো মন্ত্রী জানেন যে তার প্রতিটি সিদ্ধান্তের চুলচেরা বিশ্লেষণ করার জন্য ওপাশে একজন দক্ষ ছায়া মন্ত্রী এবং একঝাঁক গবেষক বসে আছেন, তখন তিনি চাইলেই খেয়ালখুশি মতো কাজ করতে পারেন না। এটি রাজপথের পেশিশক্তির রাজনীতি কমিয়ে পলিসির রাজনীতি চালু করতে সাহায্য করে। কারণ ভালো একজন ছায়া মন্ত্রি হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর জ্ঞান ও গবেষণা থাকা প্রয়োজন।
এভাবে রাজনীতিতে মারামারির বদলে শুরু হতে পারে মেধা ও আইডিয়ার লড়াই। কে কত ভালোভাবে জনগণের টাকার সদব্যবহার করতে পারে, সেই প্রতিযোগিতা।
এটি কীভাবে পেশিশক্তির বদলে পলিসির রাজনীতি আনতে পারে?
বর্তমানে আমাদের রাজনীতিতে একজন নেতা কত বড়, তা মাপা হয় তার কত বড় মিছিল আছে বা তিনি কত জোরে স্লোগান দিতে পারেন তার ওপর। কিন্তু ছায়া মন্ত্রিসভা এলে মাপকাঠি হবে যোগ্যতা। উদাহরণস্বরূপ : একজন ছায়া স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে অবশ্যই চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান রাখতে হবে। একজন ছায়া অর্থমন্ত্রীকে বাজেটের চুলচেরা বিশ্লেষণ জানতে হবে। এসব করলে জনগণ দেখবে প্রকৃতপক্ষে কার কাছে উন্নততর সমাধান আছে।
ছায়া মন্ত্রিসভা কার্যকর করার শর্ত কী কী?
এটি তখনই কার্যকর হবে যখন তারা কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা না করে গঠনমূলক সমাধান দিতে পারবে। যদি ছায়া মন্ত্রিসভা কেবল নামেই থাকে কিন্তু কোনো গবেষণা বা তথ্যনির্ভর কাজ না করে, তবে এটি কোনো কাজে আসবে না। ছায়া মন্ত্রীরা যদি কেবল টিভিতে টকশো করার জন্য পদটি ব্যবহার করেন কিন্তু মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহ না করেন, তবে এই মডেলটি ব্যর্থ হবে।
এটা আমাদের বাস্তবতায় সফলভাবে কাজ করবে?
বাস্তবে এটা কেবল পদবী সর্বস্ব হওয়ার সম্ভাবনা খুব বেশি। অনেকেই হয়তো ছায়া মন্ত্রীর মর্যাদা নিতে চাইবেন, কিন্তু কাজের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকবে না ও গবেষণায় শ্রম দিতে চাইবেন না। তবে আমরা যদি দু-একটি মন্ত্রণালয়েও এটি সফলভাবে করতে পারি এবং যারা ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করছেন না তাদের চাপের মুখে রাখতে পারি, তবে রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হতে পারে।’
প্রসঙ্গত, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফুটবল প্রতীকে অংশ নিয়ে তাসনিম জারা বিএনপি প্রার্থীর কাছে হেরে যান। একা লড়াই করে তিনি পেয়েছেন ৪৪ হাজার ৬৮৪ ভোট। যত ভোট পড়েছে, তার প্রায় ২১ শতাংশ ভোট পেয়েছেন তিনি। ঢাকা–৯ আসনে প্রাপ্ত ভোটের দিক দিয়ে তার অবস্থান তৃতীয়।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে জাতীয় নাগরিক পার্টি গঠন হলে দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তাসনিম জারা। বিভিন্ন সময় দলের নানা কর্মসূচিতেও অংশ নেন। কিন্তু জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনী জোটে এনসিপি যুক্ত হওয়ায় তিনি দল থেকে পদত্যাগ করেন এবং ঢাকা–৯ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।