Image description
 

“জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে”—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। সোমবার রাতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া বিদায়ী ভাষণে তিনি বলেন, গণভোটে বিপুল সমর্থনের মাধ্যমে দেশের মানুষ জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে রায় দিয়েছে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এ সনদ কার্যকর হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

 

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের নানা সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা হলেও জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না। এ সনদ প্রণয়ন ও গণভোটে পাস করাতে রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন ও অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন তিনি।

 

তিনি জানান, প্রায় দেড় যুগ পর দেশে উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাপক সাংবিধানিক পরিবর্তনের লক্ষ্যে সর্বসম্মত জুলাই সনদের ওপর গণভোট সম্পন্ন হয়েছে। এ নির্বাচন ভবিষ্যতের জন্য একটি দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

 

বিদায়ী ভাষণে ড. ইউনূস বলেন, “আমরা শূন্য থেকে নয়, মাইনাস থেকে শুরু করেছি। ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে প্রতিষ্ঠান দাঁড় করিয়ে সংস্কারের পথে হাঁটতে হয়েছে।” ১৮ মাসের দায়িত্বপালন শেষে নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রাক্কালে তিনি বলেন, গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, বাকস্বাধীনতা ও অধিকার চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে তা যেন অব্যাহত থাকে।

 

তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর দেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংকট মোকাবিলায় অন্তর্বর্তী সরকার তিনটি লক্ষ্য সামনে রেখে কাজ করেছে—সংস্কার, বিচার ও নির্বাচন। গত ১৮ মাসে প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করা হয়েছে, যার বড় অংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।

 

বিচার বিভাগের স্বাধীনতা জোরদার, গুমকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে সংশোধন, পুলিশ সংস্কার, নারী ও শিশুর সুরক্ষায় নতুন অধ্যাদেশ—এসব উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন তিনি। তার দাবি, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতি বন্ধের ভিত্তি তৈরি হয়েছে।

 

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, “হার-জিতই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।” নির্বাচনে বিজয়ী ও পরাজিত উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানিয়ে তিনি বলেন, প্রায় অর্ধেক ভোটার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ওপর আস্থা রেখেছেন—এটি গণতন্ত্রের শক্তিরই প্রমাণ।

 

পররাষ্ট্রনীতির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সার্বভৌমত্ব, জাতীয় স্বার্থ ও মর্যাদাকে ভিত্তি করে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থান পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য ও শুল্ক চুক্তির ফলে রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে বলে জানান তিনি। জাপান ও চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির কথাও উল্লেখ করেন।

 

রোহিঙ্গা সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে আন্তর্জাতিক মহলে বিষয়টি পুনরায় গুরুত্বের সঙ্গে উপস্থাপনের দাবি করেন ড. ইউনূস।

 

ভাষণের শেষে তিনি বলেন, “আমরা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব ছেড়ে গেলেও নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব আমাদের সবার।” দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি বিদায় নেন।