বিদ্যুৎ খাতের চুক্তি পর্যালোচনায় গঠিত জাতীয় পর্যালোচনা কমিটি (এনআরসি) আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির প্রমাণ পেয়েছে বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান। তবে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট ধরন প্রকাশ করতে তিনি অস্বীকৃতি জানান।
আজ রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর বিদ্যুৎ ভবনে খসড়া বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনা ২০২৬ (ইপিএসএমপি ২০২৬) নিয়ে আয়োজিত এক অংশীজন সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপদেষ্টা বলেন, এনআরসির অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আদানি পাওয়ার লিমিটেডের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন আইনি পরামর্শকরা।
ফাওজুল কবির বলেন, "এনআরসি যে প্রমাণগুলো উন্মোচন করেছে, তার ভিত্তিতে লিগ্যাল কাউন্সেল সরকারকে আদানির বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তবে এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার ভার পরবর্তী সরকারের জন্য রেখে দেওয়া হয়েছে।"
তিনি বলেন, আদানি চুক্তির সঙ্গে একটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা থাকায় তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হয়ে উঠতে পারে। "এখন সরকার যদি কোনো ব্যবস্থা নেয়, তাহলে কেউ কেউ এটিকে 'উইচ হান্ট' বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযান বলে দাবি করতে পারে," বলেন তিনি।
উপদেষ্টা আরও বলেন, "এখন যেহেতু এনআরসি দুর্নীতির প্রমাণ হাজির করেছে, পরবর্তী নির্বাচিত সরকার এসব অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।"
ইপিএসএমপি ২০২৬ নিয়ে আয়োজিত ওই সভায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। মাস্টার প্ল্যানটি দেশের ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকল্পনার দিকনির্দেশনামূলক নথি হিসেবে প্রণয়ন করা হচ্ছে।
খসড়া ইপিএসএমপি ২০২৬ সম্পর্কে ফাওজুল কবির বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য হলো ভবিষ্যৎ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য করণীয় বিষয়ে পরবর্তী সরকারের জন্য একটি রোডম্যাপ তৈরি করে দেওয়া। তিনি বলেন, "মাস্টার প্ল্যানে কিছু ঘাটতি রয়েছে। সেগুলো সমাধানে পরবর্তী সরকার অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রাখবে।"
উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর অর্জন সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে ফাওজুল কবির বলেন, সময়ের সীমাবদ্ধতার কারণে সংস্কারের পরিসর সীমিত ছিল। "আমরা অতীতে একটি দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থার উত্তরাধিকার পেয়েছি। যে সময় আমাদের হাতে ছিল, তা দিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাত আমূল পরিবর্তন করা সম্ভব ছিল না," বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, খাতটির গভীরে প্রোথিত কাঠামোগত সমস্যাগুলো সমাধান করতে পাঁচ থেকে সাত বছর সময় প্রয়োজন। "আমার সময়ে আমি উল্লেখযোগ্য কোনো উন্নয়ন করতে পারিনি, তবে নিশ্চিত করেছি যেন খাতে নতুন কোনো সমস্যা তৈরি না হয় এবং ধারাবাহিকতা বজায় থাকে। আরও সময় পেলে কিছু উন্নয়ন সম্ভব হতো, কিন্তু এসব বিষয় সময়সাপেক্ষ।"
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের মহাপরিকল্পনা বা এনার্জি অ্যান্ড পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (ইপিএসএমপি) বাংলাদেশে দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি পরিকল্পনার প্রধান নীতিনির্ধারণী নথি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন, জ্বালানি মিশ্রণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিনিয়োগ অগ্রাধিকারের রূপরেখা তুলে ধরা হয়েছে। তবে খসড়া নথিটি গণমাধ্যমে ফাঁস হওয়ার পর থেকেই অনেক অংশীজন আপত্তি জানিয়েছেন।
খসড়া ইপিএসএমপি ২০২৬ নিয়ে প্রধান সমালোচনাগুলোর মধ্যে রয়েছে—বিদ্যুতের চাহিদা অতিরঞ্জিতভাবে নিরূপণ, ব্যয়বহুল সক্ষমতা সম্প্রসারণে উৎসাহ দেওয়া এবং আগের পরিকল্পনার মতোই আমদানি করা জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বাড়ানো।
আদানি বিদ্যুৎ চুক্তি বলতে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও ভারতের আদানি পাওয়ার লিমিটেডের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি বিতর্কিত চুক্তির কথাই বোঝানো হয়, যার আওতায় ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে।
এই চুক্তিটি বিদ্যুতের চড়া দাম, জ্বালানি মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি, প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের অভাব এবং শাসনসংক্রান্ত অনিয়মের অভিযোগে দীর্ঘদিন ধরে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের তীব্র সমালোচনার মুখে রয়েছে।