ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকা ইতিহাস, ঐতিহ্য ও জনঘনত্বে সমৃদ্ধ অঞ্চল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই এলাকার কোটি মানুষের দৈনন্দিন নাগরিক সেবায় দেখা দিয়েছে চরম স্থবিরতা। ময়লা অপসারণ থেকে শুরু করে সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ, হোল্ডিং ট্যাক্স আদায়, ট্রেড লাইসেন্স, বাজার-মার্কেট ব্যবস্থাপনাসহ সব সেবায় দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতার বিষয় নয়, রাজনৈতিক অস্থিরতা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, জনবল সঙ্কট এবং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনাহীন নগর ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত ফল।
খিলগাঁও, মালিবাগ, ধানমন্ডি, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ ও যাত্রাবাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকায় রাস্তার পাশে দিনের পর দিন ময়লার স্তূপ পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। এতে একদিকে যেমন পরিবেশ দূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। সেবা প্রদানে চরম স্থবিরতা, প্রশাসনিক অচলাবস্থা ও ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতায় ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার নাগরিকরা নানামুখী সঙ্কটে পড়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিকভাবে রাজস্ব আদায় হলে সিটি করপোরেশনের অনেক সেবা উন্নত করা সম্ভব হতো। ডিএসসিসির সেবা স্থবিরতার পেছনে বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব ও নেতৃত্ব সংকট। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দীর্ঘদিনের। মেয়র না থাকা, আমলাদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া ধীর হয়ে পড়েছে। সিটি করপোরেশন এখন অনেকটাই কাগুজে প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। ক্রমাগত ভোগান্তির ফলে নাগরিকদের মধ্যে সিটি করপোরেশনের প্রতি আস্থা কমে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই ক্ষোভ প্রকাশ করছেন নগরবাসী। অনেকে বলছেন, কর নিয়মিত দেওয়া হলেও তার বিনিময়ে ন্যূনতম সেবা পাচ্ছেন না। ঢাকা দক্ষিণের মতো গুরুত্বপূর্ণ নগর ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন অকার্যকর থাকলে এর প্রভাব পুরো রাজধানীতেই পড়বে।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজে স্থবিরতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতি প্রকট হয়ে উঠেছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অধীনে চলমান ও প্রস্তাবিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর বড় একটি অংশ স্থবির হয়ে পড়েছে। এর ফলে নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় নেমে এসেছে চরম ভোগান্তি, আর নগর পরিকল্পনা নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় সড়ক সংস্কার, ড্রেনেজ ব্যবস্থা উন্নয়ন, খাল খনন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, মার্কেট উন্নয়ন, জন্মনিবন্ধন ও নাগরিক সনদ পেতে দীর্ঘসূত্রতা, মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম, পার্ক ও খেলার মাঠ উন্নয়নসহ অসংখ্য প্রকল্প গত কয়েক বছরে অনুমোদন পেলেও বাস্তবায়নের গতি অত্যন্ত ধীর। অনেক ক্ষেত্রে কাজ শুরু হলেও মাঝপথে তা বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসায় ডিএসসিসির প্রশাসনিক কর্মকা-ে এক ধরনের স্থবিরতা বা ঢিলেঢালা ভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে। নগর ভবন থেকে শুরু করে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোযোগ এখন মূলত নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের দিকে। বর্তমান সরকারের মেয়াদ শেষ পর্যায়ে থাকায় এবং নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার অপেক্ষায় থাকায় রুটিন কাজের বাইরে বড় কোনো সিদ্ধান্ত বা প্রশাসনিক তৎপরতা বর্তমানে অনেকটা সীমিত। তফসিল ঘোষণার পর থেকেই ডিএসসিরি প্রায় সব স্তরে নির্বাচনী প্রস্তুতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে ডিএসসিসির নিয়মিত অন্যান্য কার্যক্রমে এক ধরনের ধীরগতি তৈরি হয়েছে। কর্মচারী-কর্মকর্তারা এখন মূলত নির্বাচন পরবর্তী নতুন সরকার গঠনের অপেক্ষায় দিন গুনছেন।
একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করে বলেন, বর্তমানে নির্বাচনী কার্যক্রমকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। তবে রুটিন কাজও চলছে। সামনে নির্বাচন। এজন্য কাজের গতি কমে গেছে। বড় কোনো সিদ্ধান্ত নেয়া হচ্ছে না। নির্বাচনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয় এমন রুটিন কাজগুলো নিয়মিত চালিয়ে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রশাসনিক কার্যক্রম ঢিলেঢালা হলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। তাই নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে রুটিন কাজগুলো যথাযথভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে।
খিলগাঁও এলাকার বাসিন্দা দুলাল বলেন, নাগরিকদের অভিযোগ, অনেক সেবাই কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে দৃশ্যমান ব্যর্থতা বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। প্রতিদিন বর্জ্য উৎপন্ন হলেও নিয়মিত অপসারণ হচ্ছে না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। আগে নিয়মিত ময়লার গাড়ি আসত। এখন কখন আসে, কখন আসে না কেউ জানে না। দুর্গন্ধে জানালা খুলে রাখা যায় না। বহু ড্রেন বছরের পর বছর পরিষ্কার করা হয়নি। কোথাও কোথাও ড্রেন ভেঙে রাস্তার সঙ্গে মিশে গেছে। আবার কোথাও অবৈধ স্থাপনা ড্রেনের ওপর গড়ে উঠেছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম ইনকিলাবকে বলেন, উন্নয়ন কাজসহ কোনো কাজেই স্থবিরতার সুযোগ নেই। নাগরিক সেবার দিকে লক্ষ্য রেখেই আমাদের কাজ করতে হয়। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ নিয়মিত চলমান রয়েছে। প্রকৌশল বিভাগের জরুরি কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজে এখন আমরা মনোযোগ দিচ্ছি না। নির্বাচনের আগে উন্নয়ন কাজের বিষয়ে সতর্ক থেকেই কাজগুলো করছি যেন এসব কাজের জন্য নির্বাচনের প্রচারণায় কোনো ধরনের ভোগান্তি না হয়। নির্বাচনের প্রচারণার বিষয়টি মাথায় রেখেই কাজ এগিয়ে নেয়া হচ্ছে। এতে করপোরেশনের কাজে কোনো স্থবিরতার বিষয় নেই।