Image description

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় ঘনিয়ে আসছে। সময় যত ঘনিয়ে আসছে, সাইবার মাধ্যমে প্রতিদিনই ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও। দেশের মূলধারার গণমাধ্যমের লোগো, ফন্ট ও গ্রাফিক্স ডিজাইন হুবহু নকল করে ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বানোয়াট সব সংবাদ।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এসব ফেক সংবাদে বিভ্রান্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এসব ভিডিও হাজার হাজার মানুষ দেখে থাকেন। কেউ কেউ শেয়ার করেন। না বুঝে বিভিন্ন ধরনের মন্তব্যও করেন। অভিজ্ঞমহল বলছে, এসব অপতথ্য চেক না করার কারণে নির্বাচনে বড় ধরনের বিশৃঙ্খলা, দাঙ্গা বা জনমত বিভ্রান্তির প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। নির্বাচন ঘিরে এই ডিজিটাল ঝুঁঁকি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ভয়াবহ। এই ডিজিটাল অপপ্রচার কেবল জনমনে বিভ্রান্তিই ছড়ায় না; বরং এটি সাম্প্রদায়িক উসকানি বা রাজনৈতিক সঙ্ঘাতের বীজ বপন করে, যা রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই এখানে প্রয়োজন প্রযুক্তিগত প্রতিরোধ। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধে প্রযুক্তির ব্যবহারই হতে পারে সবচেয়ে বড় রক্ষাকবচ।

বাংলাদেশের ফ্যাক্ট চেকিং প্রতিষ্ঠান রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষন বলছে, শুধু গেলো জানুয়ারি মাসেই ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া ৫৭৭টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে তারা। এর মধ্যে ৮১ শতাংশই ছিল রাজনৈতিক ঘটনার। এসব ভিডিও এবং কনটেন্টের মাধ্যমে একদিকে যেমন ছড়াচ্ছে অপতথ্য, অন্যদিকে নির্বাচনে অংশ নেয়া দল বা প্রার্থীদের সম্পর্কেও ছড়িয়ে পড়ছে নানা গুজব। গুজবের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না সরকার পক্ষের ঊর্ধ্বতন ব্যক্তি থেকে সাধারণ মানুষ সবাই। বিশ্লেষকরা বলেছেন, এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন ঘিরে অপতথ্য ও সাইবার মাধ্যমে ডিপফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়া ঠেকানোই এখন সরকারের অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গেলো অক্টোবর থেকে ডিসেম্বরÑ এ তিন মাসে এক হাজার ৪৪১টি ভুল তথ্য শনাক্ত করেছে ফ্যাক্টচেক প্রতিষ্ঠান রিউমার স্ক্যানার। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, প্রায় দেড় হাজার ভুল তথ্যের মধ্যে ৯৫৬টিই ছিল রাজনৈতিক। এর মধ্যে কেবল ডিসেম্বরেই রাজনীতি ও নির্বাচন নিয়ে ভুল তথ্য ছিল ৪৪৬টি।

২০২৫ সালে রেকর্ড পরিমাণÑ চার হাজার ১৯৫টি ভুল তথ্য শনাক্ত শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে গত বছর ৩০৯টি ভুল তথ্য শনাক্ত হয়েছে। দেশে রাজনীতিতে সক্রিয় থাকা দলগুলোর মধ্যে ২০২৫ সালে সবচেয়ে বেশি অপতথ্য ছিল বিএনপিকে জড়িয়ে। বিএনপি ও তার অঙ্গ-সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে প্রচার হওয়া ৭০২টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়।

ডিসমিসল্যাবের প্রতিবেদনে বলা হয়Ñ ভুয়া ফটোকার্ডের ৭৪ শতাংশই ছড়িয়েছে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড নকল করে।
রিউমার স্ক্যানার গত জানুয়ারি মাসের ফ্যাক্ট চেকগুলো বিশ্লেষণে দেখেছে, জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি, তার অঙ্গ-সংগঠন এবং নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ২৩৮টি অপতথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে দল হিসেবে বিএনপিকে জড়িয়ে ৮৬টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার প্রায় ৬২ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। এছাড়া, দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে জড়িয়ে এই সময়ে ৬০টি অপতথ্য (৭২ শতাংশ ক্ষেত্রেই নেতিবাচক উপস্থাপন) প্রচার করা হয়েছে। এছাড়া, ছাত্রদলকে জড়িয়ে এই সময়ে ৯টি ও যুবদলকে জড়িয়ে একটি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে।

জানুয়ারিতে জামায়াতকে জড়িয়ে ১৫৩টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। এসবের প্রায় ৮৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি ও দলটির নেতাকর্মীদের জড়িয়ে ৫৩টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার। এর মধ্যে দল হিসেবে এনসিপিকে জড়িয়ে ৯টি অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে, যার সবগুলোতেই দলটিকে নিয়ে নেতিবাচক মনোভাব সৃষ্টির সুযোগ রেখেছে। দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে জড়িয়েও ৯টি অপতথ্য (সবগুলোই নেতিবাচক) শনাক্ত হয়েছে।

একটি বিশেষ চক্র জনমনে বিভ্রান্ত ছড়াতেই উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব অপতথ্য প্রচার করছে।
এছাড়া সরকারের উপদেষ্টাদের ও বিভিন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে অপপ্রচার করা হয়েছে। তবে গুজব নিয়ে সবচেয়ে বেশি বিপাকে রয়েছেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। টার্গেট করে এসব প্রার্থী নিয়ে ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন অপতথ্য, গুজব ও ডিপফেক স্ক্যান্ডাল ভিডিও। ছড়িয়ে পড়া এসব ভিডিও ক্লিপস তাদের যেমন অস্বস্তিতে ফেলে দিচ্ছে, তেমনি সাধারণ মানুষদের মধ্যেও এসব নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিচ্ছে।

জানুয়ারিতে শনাক্ত হওয়া ভুল তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে রিউমার স্ক্যানার দেখেছে, এই সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত হয়েছে ১৪১টি। এর মধ্যে ডিপফেক কনটেন্ট শনাক্ত করা হয়েছে ১১টি।

সম্প্রতি বিএনপি বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে প্রবীণ রাজনীতিক ড. কামাল হোসেনের একটি উক্তি ফটোকার্ড ফেসবুকে ছড়ালেও তা ছিল আসলে মিথ্যা। বিষয়টি নিয়ে গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরেই একটি স্বার্থান্বেষী চক্র সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনকে হেয় করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালিয়ে আসছে। এগুলো সেই অপচেষ্টার অংশ। এসব ভুয়া ফটোকার্ড ও অপতথ্যের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার অংশ হিসেবে পল্টন মডেল থানায় ৩ ফেব্রুয়ারি একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন তারা।

‘ভোটের দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকবে! এ কী ঘোষণা দিলো স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা’ শিরোনামে একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে। অথচ এমন কোনো খবর কোনো সংবাদমাধ্যমে আসেনি। অথচ চট্টগ্রামের ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে এক মতবিনিময়সভা শেষে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে বলেছিলেন, আমাদের পরিকল্পনা হলো, এটি খোলা থাকবে। ইন্টারনেট যদি কেউ বন্ধ করে, আমরা তাকে আইনের আওতায় নিয়ে আসব।’

অভিনেত্রী সাবিলা নূরকে নিয়ে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি ও ভিডিও প্রকাশ করা হয়। এ প্রসঙ্গে গতকাল তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, আমাকে জড়িয়ে একটি ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। তিনি দর্শকদের সচেতন থাকার আহ্বান জানান।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, স্মার্টফোনের বিভিন্ন ফটো এডিটিং অ্যাপের মাধ্যমে কয়েক মিনিটেই একটি নিখুঁত ভুয়া সংবাদ তৈরি করা সম্ভব, যা কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে হাজার হাজার মানুষের টাইমলাইনে পৌঁছে যায়। যেহেতু কার্ডগুলোতে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমের নাম ও লোগো থাকে, তাই সাধারণ ব্যবহারকারীরা একে ধ্রুব সত্য বলে ধরে নেন।

গুজবের এই উত্তাল জোয়ার রুখতে কেবল প্রচলিত আইনি ব্যবস্থা বা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন যথেষ্ট নয়। কারণ, আইন প্রয়োগ করার আগেই গুজব তার ধ্বংসাত্মক কাজ শেষ করে ফেলে। সংবাদমাধ্যমগুলোর জন্য এক্ষেত্রে একটি কার্যকর সমাধান হতে পারে তাদের প্রতিটি ফটো কার্ডে ‘কিউআর কোড’ যুক্ত করা। এই ডিজিটাল যুদ্ধের যুগে সত্যকে জয়ী করতে একটি কিউআর কোড যেমন প্রযুক্তির হাতিয়ার হতে পারে, তেমনি আমাদের সচেতন বিবেক হতে পারে গুজবের বিরুদ্ধে শ্রেষ্ঠ প্রতিরোধ।

ঢাকা মহানগর পুলিশ ডিএমপির সিটিটিসির সাইবার ইউনিট সূত্র জানিয়েছে, ঢাকার আসনগুলোতে সাইবার মাধ্যমে গুজবের শিকার হতে পারেন, এমন প্রার্থীদের তালিকা করা হচ্ছে। দেশের বাইরে থেকেও অনেকে সামাজিকমাধ্যমে গুজব ছড়িয়ে দেন। বিভিন্ন নামে-বেনামে খোলা গ্রুপ ও পেজ থেকেও গুজব ছড়ানো হয়। এ ধরনের শতাধিক পেজ ও গ্রুপে সার্বক্ষণিক নজরদারি করা হচ্ছে।