ড. এম. এল. রায়হান
সহকারী অধ্যাপক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়
পোস্টডক্টরাল গবেষক, সোকা বিশ্ববিদ্যালয়, জাপান
গতকালকে আমি একটা ফেসবুক পোস্টে বলেছিলাম এমনটা, “ এই নির্বাচনে একটা কল্পনাতীত ইলেক্টোরাল শক দিবে আন্ডাররেটেড এনসিপি। ৩০ টার মধ্যে ২০ টার বেশি আসনে তারা জিতে আসতে পারে। তাদের রাজনীতি দাঁড়িয়ে গেছে এবং সামনে আরো শক্তিশালী হবে। মার্ক মাই ওয়ার্ডস।” আজকে এটার একটু ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন বোধ করছি।
আপনারা জানেন যে গণঅভ্যুথানের মধ্যে দিয়ে গড়ে ওঠা এবং গণঅভ্যুথানের নেতৃত্ব দেয়া তরুণদের দল এনসিপি রাজনীতিতে এখন বেশ সক্রিয় এবং মারাত্মক প্রাসঙ্গিক। গণতন্ত্রকামী প্রতিটি মানুষের আশা ছিল যে তারা সত্যিকারের একটা ভালো বিকল্প হিসেবে দাঁড়াবে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগের রেখে যাওয়া যে রাজনৈতিক ভ্যাকুয়াম তা পূরণ করবে, আওয়ামী লীগকে অপ্রাসঙ্গিক করতে একটা ভালো প্রচেষ্টা নিবে এবং ভবিষ্যতে কেউ ফ্যাসিস্ট হয়ে উঠতে যেন না পারে তার ভ্যানগার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে। গণমানুষের আকাঙ্খাকে তারা পুরোপুরি ধারণ করতে পারেনি যদিও নানান কারণে যেটা আমাদেরকে হতাশ করেছে তথাপিও এতো অল্প সময়ে তাদের সফলতা এবং রাজনৈতিক অবস্থান ঈর্ষণীয়। তাদের অনেক ঘাটতি আছে যেমন সত্যি তেমনি সম্ভাবনাও আছে প্রবল।
দল নিবন্ধনের কয়েকদিনের মাথায় তারা তাদের মার্কাকে গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে দিয়েছে, দলকে পৌঁছে দিচ্ছে তৃণমূল পর্যন্ত যা রীতিমতো বিস্ময়কর! দল গঠনের কিছুদিনের মধ্যে বিভিন্ন জরিপে তাদের ভোট দিতে চাওয়া মানুষের হার দেখা যাচ্ছে ৭% (ন্যারেটিভ জরিপ), ৬% (আই.আর.আই জরিপ), ৪% (ইনোভিশন কনসাল্টিং জরিপ), ২.৬% (ই.এ.এস.ডি জরিপ)। মানে গড়ে তাদের ভোটের হার কোনোভাবেই ৫-৭% এর নিচে না এটা ধারণা করা যায়। এতো অল্প সময়ে বাংলাদেশের মতো বাইনারি বুর্জোয়া রাজনৈতিক দল ভিত্তিক দেশে এমন ইলেক্টরাল গ্রহণযোগ্যতা রীতিমত বিস্ময়কর বটে! এর আগে এমনটা কেউ পেরেছে? দশকের পর দশক লাগে এই দেশে রাজনীতি করে ৫% এর উপরে ভোটারদের আস্থা অর্জন করতে। তবে মিরাকেলাস লিডার শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং তাঁর হাতে গড়া বিএনপির উত্থানের ব্যাপারটা ভিন্ন যা মানুষ জানে এবং সেটা আলাদা আলোচনা।
আমরা জানি যে, এনসিপি ইতিমধ্যে জামায়াত তথা ইসলামপন্থীদের সাথে সমঝোতায় নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং অন্তত ৩০ টি আসনে শাপলা কলি প্রতীকে নির্বাচন করবার জন্য কাজে লেগে গেছে। এনসিপির যারা প্রার্থী হয়েছে একটু খোঁজ নিয়ে দেখেন তাদের অলমোস্ট কাউকে আর ফেসবুকে পাবেন না, ন্যারেটিভে নাই, টকশোতে নাই। গ্রামে চলে গেছে, দিন রাত পাগলের মতো কাজ করছে, ভোটারদের ঘরে ঘরে যাচ্ছে, গণভোটের জন্য ‘হ্যাঁ’ ভোট চাচ্ছে, ভিডিও বানাচ্ছে, লিস্ট ধরে প্রবাসীদের কাছে ভোট চাচ্ছে, নির্বাচনী ফান্ড ম্যানেজ করছে। সাবেক ছাত্র উপদেষ্টা এবং বর্তমান দলীয় মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতা আসিফ মাহমুদের নেতৃত্বে তারা গণভোটের ক্যাম্পেইনের জন্য ২৭০ জন প্রতিনিধি ঠিক করেছে। এর পিছনের রাজনীতি চিন্তা করলে বোঝা যায় যে তারা কেমন স্মার্ট এবং ম্যাচিউর রাজনীতি করছে।
তাদের নিয়ে সমালোচনাও দেখবেন খুব একটা নাই। অনেকটা নীরবেই কাজ করে যাচ্ছে। একদম তরুণদের দল কাজেই ওদের ভুল থাকবেই এটাই বাস্তবতা কিন্তু তাদেরকে তো সামনে যেতে দিতে হবে দেশের স্বার্থেই, গণতন্ত্রের স্বার্থেই, আগামীর প্রজন্মের ভালোর জন্যই। যে যাই বলুক মনে হচ্ছে যে দেশের তরুণ সমাজ, নারীরা এবং পরিবর্তনে বিশ্বাসী নাগরিকগণ তাদেরকে ধীরে ধীরে আস্থায় নিচ্ছে এবং এটাই বাস্তবতা। নাহিদ, আসিফ, হাসানাত, সারজিস, আকতারদের গণঅভ্যুথানের নায়ক হিসেবে জনগণ মনে করে এবং দিন শেষে এটা একটা ম্যাজিক হিসেবেই কাজ করে বা করবে অটোমেটিকালি।
এনসিপির কয়েকজন এমপি প্রার্থীকে জিজ্ঞেস করলাম জরিপ নিয়ে মতামত কি। উত্তরে বলে জরিপের ফলাফল ঠিকভাবে জানেই না কারণ ফেসবুক দেখেইনি। এসব নিয়ে তারা বোদার করছে না বরং কাজ করে যাচ্ছে। তারা এতটাই ডেস্পারেটলি কাজ করছে। ওদের ফেসবুক প্রোফাইল, পেজ আপনারা পাবেন যেগুলো নিয়ন্ত্রণ করে ওদের অ্যাডমিন প্যানেল। ওদের সাথে আছে ডেডিকেটেড জামায়াত-শিবিরের লোকজন যাদেরকে নিয়ে ওরা ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে পৌঁছে যাচ্ছে আর ভোটারদের মন জয় করে নেয়ার প্রাণান্তকর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। গ্রামে-গঞ্জে, পাড়ায়-মহল্লায়, যুব সমাজ, জেন-জি প্রজন্ম ওদেরকে দারুণভাবে গ্রহণ করছে, উষ্ণভাবে গ্রহণ করছে মা বোনেরা, সন্তানদের সুযোগ দিয়ে দেখতে চায় কেমন করে এমন একটা অনুভূতি নারীদের মধ্যে যেভাবেই হোক ছড়িয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সংস্কার, বিচার, রিকন্সিলিয়েশন, জনগণের অন্তরের ভাষা পাঠ ইত্যাদি প্রশ্নে তারা ভীষণ স্মার্টনেসের পরিচয় দিচ্ছে। মানে তারা পুরো ইলেক্টরাল প্রসেসের মধ্যে ঢুকে পড়েছে ভালোভাবেই।
জামায়াতের সাথে জোট বা সমঝোতা যেটাই বলিনা কেন সেটা তাদের জন্য শাপেবর হয়েছে। তারা এই সুযোগে নিজেদের রাজনীতি গুছিয়ে নিচ্ছে এবং দুর্দান্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। কেবল মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণরাই নয় বরং এনসিপিতে যুক্ত হয়েছে এক ঝাঁক মেধাবী মধ্য বয়সী রাজনৈতিক নেতা যাদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা আছে বলেই মনে হয়। বয়ান উৎপাদন, সফ্ট পাওয়ার তৈরী, নেতৃত্ব তৈরী, মিডিয়ায় যৌক্তিক স্মার্ট কথা বলে সরব এবং যোগ্য উপস্থিতি, গণমানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছানো ইত্যাদি এনসিপির রাজনীতিকে আরো প্রাসঙ্গিক করবে। তারা হয়তো আশানুরূপ ভালো করেনি কিন্তু হারিয়েও যায়নি বরং পায়ের নিচের মাটি শক্ত করছে ক্রমাগত। এনিসিপির জন্য একটা বড় ধাক্কা হচ্ছে জামায়াতের সাথে নির্বাচনী সমঝোতা প্রশ্নে তাসনিম জারা, তাসনুভা, সামান্থার মতো যোগ্য নারী নেতৃত্ব এবং আরো বেশ কিছু প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ নেতার দল ত্যাগ। যেকোনো মূল্যে তারা যদি অভিমানী তাদের এই নেতৃবৃন্দকে তাদের ঘরে ফেরাতে পারে তাহলে তারা আরো শক্তিশালী হবে এবং ধারণা করছি সেটার প্রচেষ্টা তাদের চলমান আছে।
এনসিপি শুধু একটি দল না — এটি নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার একটি উপস্থাপনা। এনসিপির জন্য সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে সরকার সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা বা শুভকামনা, বড় দুটি দল তথা বিএনপি এবং জামায়াতের ক্রমাগত সহযোগিতা এবং উৎসাহ। এনসিপির এই উত্থান— এটা এতো সহজ কথা নয় বরং সামনের দিনের বাইনারি রাজনীতিতে একটা বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিতই দিচ্ছে এটি এমনটা মনে করা অযৌক্তিক নয়।