Image description

ইসলামে পোশাক কেবল সৌন্দর্যবর্ধনের মাধ্যম নয়, বরং এটি মানবসভ্যতার সংরক্ষণ, নৈতিক পবিত্রতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার অন্যতম হাতিয়ার। নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শালীন পোশাক পরিধান করা ইসলামের অপরিহার্য বিধান। তবে প্রাকৃতিকভাবে নারী ও পুরুষের দৈহিক গঠন এবং মনস্তাত্ত্বিক পার্থক্যের কারণে ইসলাম নারীর পোশাকের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করেছে, যা মূলত নারীর সম্মান ও সুরক্ষার রক্ষাকবচ।

শালীনতা ও তাকওয়ার পোশাক

পোশাক আল্লাহর এক বিশেষ অনুগ্রহ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে মানব সন্তান, আমি তোমাদের পোশাক দান করেছি, যেন তোমরা তোমাদের আব্রু ঢাকতে পারো এবং তা (তোমাদের জন্য) সৌন্দর্য। আর তাকওয়ার (খোদাভীতির) পোশাকই উত্তম।’ (সুরা আরাফ: ২৬)
তাফসিরবিদদের মতে, ‘তাকওয়ার পোশাক’ বলতে এমন পোশাককে বোঝানো হয়েছে, যাতে শালীনতা, বিনয় ও সংযম প্রকাশ পায় এবং যা অপচয়, অহংকার বা অশ্লীলতা থেকে মুক্ত।

নবীজি (স.) বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ নতুন পোশাক পরিধান করে, তখন সে বলবে- الْحَمْدُ لِلَّهِ الَّذِي كَسَانِي مَا أُوَارِي بِهِ عَوْرَتِي وَأَتَجَمَّلُ بِهِ فِي حَيَاتِي ‘সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি আমাকে এমন পোশাক দান করেছেন, যার মাধ্যমে আমি লজ্জাস্থান আবৃত করতে পারি এবং জীবনে সৌন্দর্য গ্রহণ করতে পারি।’ (সুনানে তিরমিজি: ৩৫৬০)

শালীন পোশাকের আবশ্যকতা ও নারীর নিরাপত্তা

ইসলাম নারীকে যে পর্দার বিধান দিয়েছে, তা তাকে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নয়, বরং পাশবিকতা ও নিগ্রহ থেকে রক্ষা করার জন্য। পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত আধুনিক সমাজেও যেখানে নারীরা প্রতিনিয়ত যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, সেখানে শালীন পোশাক নারীকে এক বিশেষ নিরাপত্তা দেয়।

পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের জিলবাবের (চাদরের) কিয়দংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়। এতে তাদের চেনা সহজ হবে, ফলে তাদের উত্ত্যক্ত করা হবে না।’ (সুরা আহজাব: ৫৯)
বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সামাজিক প্রেক্ষাপটও প্রমাণ করে যে, শালীন পোশাকে আবৃত নারীরা সাধারণত বখাটেদের উৎপাত, ইভটিজিংয়ের মতো অপরাধ থেকে তুলনামূলক বেশি নিরাপদ থাকেন। এমনকি পাষাণ হৃদয়ের অপরাধীও পর্দানশিন নারীর প্রতি এক ধরনের সম্ভ্রমবোধ পোষণ করে।

শালীন পোশাকের ৫টি অপরিহার্য শর্ত

কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মুমিন নারী-পুরুষের পোশাকের কিছু সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যেমন-
১. শরীর ও সৌন্দর্য আড়াল করা: পোশাক এমন হতে হবে যা শরীরের গঠন ও সৌন্দর্য ঢেকে রাখে। আল্লাহ বলেন, ‘তারা তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ করবে না, তবে যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায়।’ (সুরা নূর: ৩১)
২. পাতলা ও আঁটসাঁট না হওয়া: পোশাক অতিরিক্ত পাতলা হওয়া যাবে না যাতে শরীরের চামড়া বা ভেতরের অংশ দেখা যায়। আবার এমন আঁটসাঁটও হবে না যাতে দেহের ভাঁজ ফুটে ওঠে। নবীজি (স.) সতর্ক করে বলেছেন, ‘দুই শ্রেণির মানুষ জাহান্নামী... (তাদের এক শ্রেণি হলো) ওই সব নারী, যারা পোশাক পরেও উলঙ্গ থাকে (অর্থাৎ অত্যন্ত পাতলা বা আঁটসাঁট পোশাক পরে)... তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে না, এমনকি জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না।’ (সহিহ মুসলিম: ২১২৮)
৩. পুরো শরীর আবৃত রাখা: মুমিন নারীর পোশাক পুরো শরীর ঢেকে রাখবে। বর্বর বা জাহেলি যুগের মতো সৌন্দর্য প্রদর্শন করে বেড়ানো নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা স্বগৃহে অবস্থান করবে, প্রাচীন জাহেলি যুগের মতো নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না।’ (সুরা আহজাব: ৩৩)

৪. ঢিলেঢালা ও আরামদায়ক হওয়া: পোশাক ঢিলেঢালা হওয়া উচিত যাতে আব্রু রক্ষা পায় এবং চলাফেরা করা সহজ হয়।
৫. বিপরীত লিঙ্গের সাদৃশ্য পরিহার: পুরুষ নারীর মতো এবং নারী পুরুষের মতো পোশাক পরবে না। নবীজি (স.) বলেছেন, ‘আল্লাহ ওই সব পুরুষের ওপর লানত বর্ষণ করেন যারা নারীর বেশ ধারণ করে এবং ওই সব নারীর ওপর লানত বর্ষণ করেন যারা পুরুষের বেশ ধারণ করে।’ (সহিহ বুখারি: ৫৮৮৫)

শালীন পোশাক পারিবারিক সম্প্রীতি, দাম্পত্য সুখ এবং সামাজিক পবিত্রতা রক্ষার চাবিকাঠি। যারা লজ্জা ও শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে, আল্লাহ তাদের শয়তানের প্ররোচনার শিকার বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাই আধুনিকতার নামে অশ্লীলতা নয়, বরং কোরআনের নির্দেশ ও নবীজির (স.) সুন্নাহ অনুযায়ী শালীন পোশাক পরিধানই মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।