লিবিয়ায় পাচারের শিকার হয়ে সাত মাস ধরে অমানবিক নির্যাতনের মধ্যে দিন পার করছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগরের তিন যুবক। অবৈধভাবে সমুদ্রপথে ইতালি পৌঁছানোর চেষ্টায় লিবিয়ায় গিয়ে স্থানীয় মানব পাচারকারী ও দালাল চক্রের হাতে জিম্মি হয়েছেন তারা। পাচারকারীরা তাদের নির্যাতন করে সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে মুক্তিপণ দাবি করেছেন। দরিদ্র পরিবারগুলো চাহিদামতো মুক্তিপণ না দেওয়ায় প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তারা।
জিম্মি তিন যুবক হলেন- সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নের রেজোয়ান ও আবু শহিদ গাজী এবং বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের রমজান। উন্নত জীবনের আশায় ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর তাদের একই ফ্লাইটে পাঁচটি দেশ ঘুরিয়ে লিবিয়ায় পাঠায় দালাল চক্র।
পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, ছেলেরা ফোন করে জানান, তারা অমানবিক নির্যাতনের মধ্যে আছেন। ঠিকভাবে খাবার দেওয়া হচ্ছে না। প্রতিদিন শরীরে আঘাত করা হচ্ছে। টাকার জন্য চাপ দেওয়া হচ্ছে।
পরিবারের অভিযোগ, মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়ে প্রতিটি পরিবার দালালদের হাতে ১৮ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের সবাই জমি বিক্রি, জমানো ও ঋণ করে টাকা সংগ্রহ করেন। এখন তারা নিঃস্ব। এখন তারা সন্তানদের জীবন বাঁচাতে চাইছেন।
লিবিয়া থেকে পাচারকারীরা তিন যুবকের হাত-পা বেঁধে নির্যাতন করে সেই ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠাচ্ছে। শারীরিক নির্যাতনের সেই দৃশ্য দেখে ভেঙে পড়ছে পরিবারগুলো। নির্যাতনের কয়েকটি ভিডিও এসেছে খবরের কাগজের কাছে। সেখানে দেখা গেছে, তিন যুবকের একজন আবু শহিদ গাজীর হাত-পা বেঁধে মারা হচ্ছে। তিনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন।
ওই ভুক্তভোগীর ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘টাকা নেওয়ার সময় সরাসরি ইতালি নিয়ে যাওয়ার কথা দিয়েছিল মুকুল ও তার বোন হালিমাহ ভগ্নিপতি সিরাজুল। তবে লিবিয়া নিয়ে আরও দুজনের সঙ্গে রমজানকে মাফিয়াদের কাছে রেখে নির্যাতন চালিয়ে কয়েক দফায় অতিরিক্ত দুই লাখ টাকা আদায় করেছে তারা।’
তিনি বলেন, ‘ছেলের ওপর চালানো বর্বরতা সহ্য করতে না পেরে গত ৬ জুন তার বাবা খলিলুর রহমান চক্রের হোতা মুকুল, তার বাবা আব্দুল হাকিম সানা, ভগ্নিপতি সিরাজুল ও তাদের স্ত্রী হালিমা এবং মোমেনাসহ ১৫ জনের নামে মামলা করেন। দালালদের মধ্যে মাত্র দুজনকে ধরেছে পুলিশ। এখনো অনেক দালাল বাইরে। ওই ঘটনায় ক্ষিপ্ত হয়ে আসামি আজিজুল ইসলামের স্ত্রীসহ বিভিন্ন জনকে বাদী করে তার বাবাসহ পরিবারের সদস্যদের নামে তিনটি মামলা দিয়েছে চক্রটি। আমরা কিছু চাই না, শুধু ভাইকে ফেরত চাই।’
মানব পাচার ও অপহরণের পেছনে শ্যামনগর উপজেলার বুড়িগোয়ালিনী ইউনিয়নের মুকুল সানা নামের একজন রয়েছে জানিয়ে শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘সবকিছুর মূলে রয়েছে মুকুল দালাল। তিনি দুবাই থেকে সব কিছু নিয়ন্ত্রণ করেন। এখানে ছয় থেকে সাতজনের একটা টিম তার জন্য কাজ করে। এই কাজে সহযোগিতা করেন তার দুলাভাই রেজাউল ও তার স্ত্রী মোমেনা বিবি। তারা অনেক টাকা-পয়সা খেয়ে মানুষকে প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় পাঠিয়ে অপহরণ-বাণিজ্য করেন।’
লিবিয়ায় মাফিয়াদের কাছে জিম্মি রমজানের বোন হামিদা বেগম জানান, ভাইকে ইতালি পাঠাতে তার বাবা জমিজমা বিক্রিসহ সমিতি থেকে ঋণ নিয়েছিল। প্রতিবেশী মুকুল, তার বাবা আব্দুল হাকিম, স্ত্রী হালিমা ও তার শ্যালক মাজাট গ্রামের শাহিনুরের হাতে বিভিন্ন ধাপে মোট ১৭ লাখ টাকা তুলে দেন। পরবর্তী সময় জিম্মিদশা থেকে মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আরও তিন লাখ টাকা আদায় করলেও এখন আবার জনপ্রতি মুক্তির বিনিময়ে ২০ লাখ করে টাকা চাইছে মাফিয়ারা। ভাইয়ের জন্য সমিতি থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় স্বামীর বাড়ি থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি হামিদার।
লিবিয়ায় জিম্মি রেজোয়ানের বাবা আশরাফ হোসেন জানান, ছেলের সঙ্গে গত দুই সপ্তাহ আগে সর্বশেষ কথা বলেছেন। এ সময় দুজনে পিছমোড়া করে হাত ধরে রাখার সুযোগে তৃতীয় ব্যক্তি পাইপ দিয়ে রেজাউলকে পিটাচ্ছিল। তিনি সহ্য করতে না পেরে ফোনের সংযোগ কেটে দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ঢাকা থেকে সরাসরি বিমানে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে চুক্তির সম্পূর্ণ টাকা আগে থেকে হাতিয়ে নেয় চক্রটি। একপর্যায়ে গত বছরের ১৮ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে ভারত হয়ে শ্রীলঙ্কা, পরবর্তী সময় দুবাই ও মিসর হয়ে লিবিয়ায় নেওয়া হয় তাকে। ত্রিপোলীতে পৌঁছানোর পর মুকুল ও তার লোকজন রেজওয়ানকে তুলে দেয় সেখানে অবস্থান করা মাফিয়াদের হাতে। আমরা আর টাকা জোগাড় করতে পারছি না। ছেলেকে ফেরতসহ মুকুল দালাল আর তার সহযোগীদের শাস্তির দাবি জানান তিনি।
এ বিষয়ে কথা বলার জন্য দুবাইয়ে অবস্থানরত মুকুল কিংবা কারাগারে থাকায় তার পিতার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে মুকুলের শ্যালক শাহিনুর জানান, তার ভগ্নিপতিসহ অন্যরা এসব বিষয়ে তথ্য দিতে পারবে। তিনি নিজে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত না বলে দাবি করেন।
ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের হুমকির বিষয়ে শ্যামনগর থানার ওসি হুমায়ুন কবির মোল্যা জানান, এরই মধ্যে ঘটনার সঙ্গে জড়িত আব্দুল হাকিমসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তবে জামিন নিয়ে বেরিয়ে এসে আবারও হুমকি দিলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোছা. রনী খাতুন জানান, বিষয়টি ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে। শনিবার সকালে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জিম্মি তিনজনের পাসপোর্টের কপি চেয়েছেন। মন্ত্রণালয় থেকে তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। এ ছাড়াও ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে আইনের আশ্রয় নিতে বলা হয়েছে।