Image description

অপরিশোধিত তেলের সংকটে পড়েছে দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল)। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর হরমুজ প্রণালিতে অচল অবস্থা বিরাজ করায় দেশে আসছে না অপরিশোধিত তেলের চালান। এতদিন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে অপরিশোধিত তেল এনে পরিশোধন করা হলেও গত এক মাসেও আসেনি কোনও তেল। যে কারণে অপরিশোধিত তেলের সংকটে পরিশোধনাগারটির কার্যক্রম বন্ধের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এটি সচল রাখতে বিকল্প দেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আনার চেষ্টা চলছে বলে জানালেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

ইআরএল সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটির হাতে ৩১ মার্চ পর্যন্ত অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেলের মজুত মজুত ছিল ২৩ হাজার মেট্রিক টন। দৈনিক সাড়ে চার হাজার পরিশোধনের সক্ষমতাসম্পন্ন এই কারখানায় বর্তমানে দিনে ৩ হাজার ৮০০ টন পরিশোধন করা হচ্ছে। যা দিয়ে সাত দিন কার্যক্রম পরিচালনা সম্ভব। এরই মধ্যে আরও দুদিন অতিবাহিত হয়ে গেছে। এখনও তেল আসার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই ইআরএলের কাছে। ফলে হিসাবে আর মাত্র পাঁচ দিন চলবে। এই কয়দিনের মধ্যে তেলের জোগান হলে পরিশোধনাগারটির কার্যক্রম সচল থাকবে। না হয় কার্যক্রম বন্ধ রাখা ছাড়া কোনও উপায় নেই বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।  

দেশের একমাত্র সরকারি জ্বালানি তেল পরিশোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) ১৯৬৮ সালে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠানটিতে অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেল পরিশোধন করা হয়। পরিশোধনের মাধ্যমে উৎপাদন করা হয় ডিজেল, পেট্রোল, ফার্নেস অয়েল, এলপিজি, জেট ফুয়েল ও বিটুমিন। তবে অকটেন এই প্রতিষ্ঠানে উৎপাদন করা হয় না। এই কারখানায় পরিশোধিত তেল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে যাচ্ছে ভোক্তার হাতে।

বিপিসি সূত্র জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ইআরএল পরিশোধন করে ৭ লাখ ৩২ হাজার ২৩০ টন ডিজেল, ৩ লাখ ৮৬ হাজার ২২৯ টন ফার্নেস অয়েল, ৫৯ হাজার ১৫০ টন পেট্রোল, ৫৬ হাজার ৯৩৪ টন কেরোসিন, ৫৭ হাজার ৪১৪ টন বিটুমিন, ১৬ হাজার ১৮৭ টন এলপিজি, ৮ হাজার ৭১ টন জেবিও (জুট ব্যাচিং অয়েল) এবং ১ লাখ ৫৩ হাজার ৫২৯ টন ন্যাপথা বিপিসিকে সরবরাহ করেছে। বাংলাদেশে বর্তমানে বছরে ৭২ হাজার লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৯২ শতাংশ আমদানি করতে হয় বিপিসিকে। অবশিষ্ট ৮ শতাংশ স্থানীয় উৎস থেকে পাওয়া যায়। সরবরাহ করা জ্বালানির মধ্যে ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করে ইআরএল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির দুজন কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার বিকালে বাংলা ট্রিবিউনকে জানিয়েছেন, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে গত মার্চ মাসে দুই জাহাজে মোট দুই লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আসার কথা ছিল। কিন্তু সেই চালান দুটি পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় বর্তমানে এই সংকট দেখা দিয়েছে। মজুত অনুযায়ী আর পাঁচ দিন অর্থাৎ ৭ এপ্রিল পর্যন্ত চলবে পরিশোধনাগারের কার্যক্রম। 

ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের যৌথ হামলা ও তাদের মধ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছে ইরান। এর ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। কারণ বিশ্বের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অপরিশোধিত জ্বালানি তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবহন করা হয়। যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে কৌশলগত এই নৌপথ অচল হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে আমদানিনির্ভর বাংলাদেশেও। যদিও চলমান যুদ্ধের মধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাংলাদেশসহ পাঁচটি দেশের জাহাজ চলাচলে অভয় দিয়েছে ইরান। তেহরান জানিয়েছে, নির্দিষ্ট কিছু বন্ধুরাষ্ট্র এবং বিশেষ অনুমোদিত দেশের জন্য এই জলপথ খোলা থাকবে। ইরানের এই বন্ধুতালিকায় বাংলাদেশের পাশাপাশি ভারত, চীন, রাশিয়া, ইরাক ও পাকিস্তানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।

পরিশোধনাগারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগামী ১ অথবা ২ মে প্রায় ১ লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত (ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল) তেল বহন করা একটি জাহাজ দেশে আসতে পারে। জাহাজটিতে আগামী ২১ এপ্রিল সৌদি আরবের একটি বন্দর থেকে তেল লোড করার শিডিউল রয়েছে। সেটি হরমুজ প্রণালি বাদ দিয়ে বিকল্প পথে দেশে আসার কথা রয়েছে। তার আগে দেশে তেল আসার সুনির্দিষ্ট কোনও তথ্য নেই।

প্রতিষ্ঠানটির আরেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে ইস্টার্ন রিফাইনারির জন্য নির্ধারিত একটি মাদার ভেসেল সৌদি আরবের রাস তানুয়া বন্দরে আটকা পড়েছে। এমটি নর্ডিক পলাঙ নামের জাহাজটি গত ২ মার্চ সকালে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হওয়ার কথা ছিল। নির্ধারিত সময়ের আগেই জাহাজটিতে ক্রুড অয়েল লোড করা হলেও যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটি এখনও বন্দরে নোঙর করে আছে। আগামী ২১ মার্চ সংযুক্ত আরব আমিরাত জেবেল আলী ধান্না বন্দর থেকে আরেকটি জাহাজে ক্রুড অয়েল নিয়ে বাংলাদেশের উদ্দেশে রওনা হওয়ার শিডিউল ছিল। ওই জাহাজটিতেও এক লাখ মেট্রিক টন তেল আনার কথা ছিল। তবে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে সেটিরও শিডিউল বাতিল করা হয়। নতুন করে আরও একটি জাহাজে আগামী ২১ এপ্রিল তেল লোড করার শিডিউল আছে। সেটি নির্দিষ্ট সময়ে লোড করলে আগামী ১ অথবা ২ মে দেশে পৌঁছাবে। সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে জাহাজ পৌঁছাতে ১৩-১৪ দিন লাগে।

সর্বশেষ মজুতের বিষয়ে জানতে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শরীফ হাসনাতকে একাধিকবার কল দিলেও রিসিভ করেননি।

ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের উপ-মহাব্যবস্থাপক (অপারেশনস) মুহাম্মদ মামুনুর রশীদ খান বলেন, ‘সংযুক্ত আরব আমিরাত, ইরান, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল আমদানি করে পরিশোধনের বিষয়টি মাথায় রেখে ইস্টার্ন রিফাইনারি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলবাহী জাহাজ আসতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে এই সমস্যা বেশি দিন থাকবে না। আশা করছি, শিগগিরই সমস্যা কেটে আসবে। আপাতত মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়াসহ বিকল্প দেশ থেকে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েল কেনার চেষ্টা চলছে। সরকার বিষয়টিকে গুরুত্ব সহকারে দেখছে। ইতিমধ্যে কয়েকটি দেশ ক্রুড অয়েলের নমুনা পাঠিয়েছে। আমরা সেগুলো পরীক্ষা করে কয়েকটি থেকে কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তবে সেগুলো কিনলে আসতে একটু সময় লাগবে।’

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব সৈয়দ রেফায়েত হামিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‌‘সর্বশেষ গত ২৮ ফেব্রুয়ারি এক লাখ মেট্রিক টন অপরিশোধিত তেল আমদানি করা হয়েছিল। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় এরপর অপরিশোধিত তেলের কোনও জাহাজ দেশে আসেনি।’