নতুন করে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিয়েছে বাংলাদেশ। তবে এই প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রিক্রুটিং ব্যবসায়ী ও অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা। তার বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে কোনকিছুই স্পষ্ট করা হয়নি। বিশেষ করে আনুষ্ঠানিক নির্দেশনার পরিবর্তে কেবল প্রেস রিলিজের মাধ্যমে প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণায় অস্বচ্ছতা রয়ে গেছে। ফলে আগের বিতর্কিত ঘটনাগুলোর পুনরাবৃত্তি ও বাজার হারানোর শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রেস রিলিজে মালয়েশিয়া কর্মী পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণাটি দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে রিক্রুটিং এজেন্সিদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিজের (বায়রা) সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘একটা প্রেস রিলিজ দিয়ে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করে ফেলছে। এটা কীভাবে স্বচ্ছতা হলো। সংবাদ সম্মেলন করেও তো বলতে পারত—আমরা এভাবে কাজ করছি। কত টাকা কর্মীরা দেবে, তার কোনো মেকানিজম নাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আগে যেখানে ১০০টি প্রসেসিং এজেন্সি ছিল, এখন সেখানে ২৫টি এজেন্সি করা হয়েছে। আগে রিক্রুটিং এজেন্ট ছিল আট শতাধিক। এখন মাত্র ৩১২টি। আবার এক এজেন্সিকে (রিক্রুটিং) আরেক এজেন্সি (প্রসেসিং) থেকে এনওসি নিতে হবে। তার মানে এক এজেন্সি আরেক এজেন্সির বস হয়ে গেল। সবকিছু মিলিয়ে একটা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার দিকেই আবার এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে।’
আগের ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এবারও পুরো শ্রমবাজার কুক্ষিগত হচ্ছে মালয়েশিয়ায় অভিবাসী কর্মী নিয়োগ ও ব্যবস্থাপনার অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) মাধ্যমে। আর এগুলো অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চলছে। অন্তবর্তীকালীন সরকারের অধীনে যে তালিকা তৈরি করা হয়েছিল, সেটি ছিলো বিতর্কিত ও অস্বচ্ছ। বর্তমান সরকার তা আর পরিবর্তন করেনি।’
ব্যবসায়ীদের মতো অভিবাসন বিশেষজ্ঞদেরও একই কথা। তাদের মতে, শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার আগেই যে স্বচ্ছতা প্রয়োজন ছিল, বর্তমান সরকার তা করতে পারল না। পুরো প্রক্রিয়া এখনো অস্বচ্ছই রয়ে গেছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর স্ট্রিমকে বলেন, ‘যে জটিলতা ও প্রশ্ন ছিল, সেগুলো রয়েই গেছে। এই যে ২৫টি এজেন্সি ও ৩১২টি সাব-এজেন্সির কথা বলা হচ্ছে, সেটি কীভাবে নির্ধারণ হলো, তা জানানো হয়নি। আগেও আমরা এই ধরনের প্রক্রিয়া দেখেছি। এবারও তাই হলো।’
প্রেস রিলিজের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘এর অন্তত দুটি জায়গায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, আমরা মালয়েশিয়ার সিদ্ধান্তকে সম্মান করি। এখন মালয়েশিয়াও আমাদের সিদ্ধান্তগুলোকে সম্মান করছে কিনা, তা দেখতে হবে। এটা একতরফাভাবে ঠিক করা হয়েছে। আমরা শুধু বিষয়টা মেনে নিচ্ছি। আমরা মনে করছি, এতেই দেশের বা কর্মীদের স্বার্থ রক্ষা হবে। কিন্তু সেই বিষয়টাও স্পষ্ট না।’
আসিফ মুনীর আরও বলেন, ‘যে অংশীদাররা আগে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল, তারা কিন্তু এখনো আছে। এদিকে যে ১০ হাজার জন বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে ফ্রি যাবেন বলা হচ্ছে, তারা কারা। তারা কি আগে যেতে পারেননি? এটা কিন্তু কোথাও স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে না। সব মিলিয়ে স্বচ্ছতা তো হলোই না, বরং আরও বিভ্রান্তি তৈরি হলো।’
একই কথা জানিয়ে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির (এনএসইউ) অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ জালাল উদ্দিন শিকদার স্ট্রিমকে বলেন, ‘প্রথমে আমার ভাবছিলাম বোয়েসেলের মাধ্যমে কর্মী পাঠাবে জিরো মাইগ্রেশন কস্টে। মাঝখানে মন্ত্রী বললেন যে, আমি কোনো এজেন্সির মাধ্যমে পাঠাবো না, এজন্য দেরি হচ্ছে। তারপর দেখলাম শুধু বোয়েসেলের মাধ্যমে না, এটা রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেও কর্মী পাঠাবে। এখন দেখা যাচ্ছে ৩১২ এজেন্সি কর্মী প্রসেস করবে, ভিসা প্রসেসিং করবে ২৫টি এজেন্সি, মনিটরিং করবে বোয়েসেল আর ক্লিয়ারেন্স দেবে জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)। সরকারের উদ্দেশ্য সৎ হতে পারে। কিন্তু এই যে চারটা স্টেপ—সেখানে যারা যুক্ত আছে, তারা যে অসৎ হবে না তার কোনো নিশ্চয়তা আছে?’
তিনি আরও বলেন, ‘মালয়েশিয়া যে ১০ হাজার কর্মী নেবে—কোন কোম্পানিতে নেবে, কোন ফ্যাক্টরিতে নেবে, কোন সেক্টরে নেবে, ফ্যাক্টরিতে জব আইডি কী হবে, সেই বিষয়গুলো কি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রকাশ করা হয়েছে? তাহলে স্বচ্ছতা কোথা থেকে হলো? এখানে কোনোভাবেই স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়নি।’
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের এই স্বচ্ছতার প্রশ্ন নিয়ে জানতে চাইলে এখনই এ বিষয়ে কথা বলতে চান না বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী। বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ে এক অনুষ্ঠান শেষে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমাদের যা জানানোর ছিল, তা আমরা প্রেস রিলিজের মাধ্যমে জানিয়েছি। পরবর্তীতে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করলে আপনাদের জানানো হবে।’
কী রয়েছে প্রেস রিলিজে
বৃহস্পতিবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলাম স্বাক্ষরিত প্রেস রিলিজে বলা হয়, মালয়েশিয়া বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার। দীর্ঘদিন ধরে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী দেশটিতে কাজ করছেন। বর্তমান সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বন্ধ ও সীমিত হয়ে যাওয়া বৈদেশিক শ্রমবাজার পুনরায় চালু ও সম্প্রসারণের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রেস রিলিজে আরও বলা হয়, তালিকাভুক্ত রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো নিজেদের উদ্যোগে মালয়েশিয়ায় নিয়োগদাতা খুঁজে বের করতে, চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ করতে এবং বাংলাদেশ থেকে কর্মী নির্বাচন করে নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে। এছাড়া বাংলাদেশ সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মী সম্পূর্ণ বিনা খরচে নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত হয়েছে মালয়েশিয়া। এ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশটির শ্রমবাজারে আরও উন্মুক্ত ও অংশগ্রহণমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
প্রেস রিলিজ অনুযায়ী, মালয়েশিয়ার অনুমোদিত এজেন্সিগুলো চাকরির চাহিদাপত্র সংগ্রহ ও কর্মী নির্বাচন করবে। এরপর কলিং ভিসা, ই-ভিসাসহ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় বোয়েসেল ও তালিকাভুক্ত ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি সহায়তা করবে। মালয়েশিয়ায় নিয়োগের প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট রিক্রুটিং এজেন্সি বাংলাদেশের নিয়ম অনুযায়ী পরবর্তী কার্যক্রম সম্পন্ন করবে। প্রতিটি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি নিজস্ব লাইসেন্সের অধীনে কর্মীদের জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও বিএমইটির ছাড়পত্র নিতে পারবে। এ ক্ষেত্রে বোয়েসেল ও ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে অনাপত্তিপত্র (এনওসি) দিতে পারবে।
প্রেস রিলিজের পরও অস্পষ্টতায় তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীরা
মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরুর ঘোষণা দিলেও অস্পষ্টতায় রয়েছেন ২৫টি প্রসেসিং এজেন্সি ও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির ব্যবসায়ীরা। তাদের ভাষ্য, সরকার প্রেস রিলিজ দিলেও তালিকাভুক্ত এই ব্যবসায়ীদের এখনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা দেয়নি যে তারা কীভাবে কাজটি করবে। ফলে তারা কাজ শুরু করতে পারছে না।
এ বিষয়ে ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সির একটি সাইফুল এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সাইদুল ইসলাম স্ট্রিমকে বলেন, ‘আমাদের কাজ কী হবে, সেটা আমরা জানি না। সরকার আমাদের কোনো দিকনির্দেশনা দেয়নি।’
একই কথা জানিয়েছেন একটি প্রসেসিং এজেন্সির মালিক। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তিনি বলেন, ‘সরকার প্রেস রিলিজ দিলেও আমাদের কিছু জানায়নি। আমাদের না জানালে কীভাবে কাজ করব? কর্মীদের প্রসেসিং করব কীভাবে। বিষয়গুলো তো আমাদের স্পষ্ট করতে হবে।’
আগে কী ঘটেছিল
২০০৯ সাল থেকে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার ২০১৬ সালের শেষের দিকে জি-টু-জি প্লাস প্রক্রিয়ায় চালু হয়। সে সময় মাত্র ১০টি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর সুযোগ পায়। তবে কর্মী পাঠানোর মধ্যেই তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে যে, তারা সরকার ঘোষিত ৩৩ হাজার ৩৭৫ টাকার বদলে সাড়ে ৩ লাখ থেকে ৪ লাখ টাকা পর্যন্ত কর্মীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে। এই অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশি কর্মী নেওয়া বন্ধ করে মালয়েশিয়া।
তিনবছর পর ২০২১ সালের ১৮ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে নতুন একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর মেয়াদ রয়েছে। সেই এমওইউতে ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি কর্মী পাঠানোর অনুমতি পায়। তাদের বিরুদ্ধে সিন্ডিকেটের অভিযোগ ওঠায় পরবর্তীতে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের অনুরোধে সরকারি রিক্রুটিং এজেন্সি বোয়েসেলসহ আরও ৭৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেয় মালয়েশিয়া। তবে তাদের বিরুদ্ধেও দূর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। সরকার ঘোষিত ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকার বদলে সাড়ে ৫ লাখ থেকে ৬ লাখ টাকা পর্যন্ত কর্মীদের কাছ থেকে নেওয়ার অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ৩১ মে আবারও বন্ধ হয়ে যায় মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও ব্যবসায়ীদের মতে, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের মতো যদি এবারও একই ঘটনা ঘটে, তাহলে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার বাংলাদেশের জন্য কঠিন হয়ে যাবে। এ কারণে সরকারকে এখনই এ বিষয়ে নজর দিতে হবে। পুরোপুরি স্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বাজারটি চালু করতে হবে।