Image description

‘চাঁদাবাজি, দখল, ভাঙচুর, সহিংসতা ও অন্যান্য অপরাধে দলের নাম ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ জোরদার করেছে বিএনপি। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে দলীয় পদ বা প্রভাব বিবেচনা না করে বহিষ্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে দলটি। গুরুতর ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ারও সিদ্ধান্ত রয়েছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক অভিযোগের পর দলের শীর্ষ নেতৃত্ব বিতর্কিত ব্যক্তিদের তালিকা ও তাদের কর্মকাণ্ডের তথ্য সংগ্রহ করছে। তৃণমূল থেকে পাওয়া অভিযোগ যাচাই-বাছাই করে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে।

বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা বলছেন, ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে দলের পরিচয় ব্যবহার করার সুযোগ কাউকে দেওয়া হবে না। একইসঙ্গে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দলের বিরুদ্ধে আনা মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অভিযোগও যাচাই করে মোকাবিলা করা হবে।

দলের হাইকমান্ড দুই ধরনের পদক্ষেপের পথে এগোতে চায়। প্রমাণিত অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে আনা অভিযোগ রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করা। দলীয় সূত্রের ভাষ্য, বিএনপি এবং এর অঙ্গসংগঠন যুবদল ও ছাত্রদলসহ সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর নেতা-কর্মীদের কর্মকাণ্ড নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

বিশেষ নজর রাখা হচ্ছে, যেসব ব্যক্তি বারবার চাঁদাবাজি, জমি দখল, সহিংসতা, ভাঙচুর কিংবা দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগের মুখোমুখি হয়েছেন, তাদের ওপর। তৃণমূল থেকে এসব অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তথ্য যাচাই-বাছাই শেষে সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।

 

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু বলেন, চাঁদাবাজি, টোল আদায় ও জমি দখলের অভিযোগ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। তবে এসব অভিযোগের অনেকগুলোই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে বিএনপির কোনো নেতা বা কর্মী এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

শামসুজ্জামান দুদু বলেন, দলের হাইকমান্ড সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং অভিযোগগুলো পর্যালোচনা করছে। দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়; এমন কর্মকাণ্ডে যেই জড়িত থাকুক, তার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রয়োগ করা হবে।

বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ ইমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, যথাযথ তদন্তের পর কেউ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে দল।

তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক স্বার্থে কেউ দলের নাম ব্যবহার করতে পারবেন না।’ একই সঙ্গে চাঁদাবাজ ও জমি দখলকারীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও দলের নামে সন্ত্রাস ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা বলেছেন।

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে রিজভী বলেন, দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনৈতিক, বেআইনি, সহিংস বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়ালে তাকে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

তিনি বলেন, বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের কয়েক হাজার নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

তবে বিএনপি নেতারা জোর দিয়ে বলেছেন, কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাকে অপরাধী বলা যাবে না। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রতিটি ঘটনার পরিস্থিতি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত সম্পৃক্ততা যাচাই করতে হবে।

এই পদ্ধতির মাধ্যমে দলের হাইকমান্ড একদিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিএনপির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ মোকাবিলা করতে চায়, অন্যদিকে প্রকৃত অপরাধীরা যাতে দলের পরিচয়ের আড়ালে নিজেদের লুকিয়ে রাখতে না পারে, সেটিও নিশ্চিত করতে চায়।

ঢাকা ও দেশের অন্যান্য স্থানে সাম্প্রতিক সময়ে হামলা, ভাঙচুর ও জমি দখলের অভিযোগ ওঠার পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। মিরপুরের রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার এবং ইসিবি এলাকায় কনটেন্ট নির্মাতা সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় স্থানীয় বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে অভিযোগ ওঠা কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে। এসব ঘটনার তদন্ত চলছে এবং ইতোমধ্যে কয়েকজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলার ঘটনায় কোনো রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা পাওয়া গেলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সচিবালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, চাঁদাবাজ, অপরাধী, অস্ত্র বহনকারী ও মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে পুলিশের অভিযান চলছে এবং তা আরও জোরদার করা হবে।

তিনি বলেন, অপরাধীদের তালিকা তৈরি করা পুলিশের নিয়মিত দায়িত্ব এবং এসব তালিকা নিয়মিত হালনাগাদ করা হয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘অপরাধীকে অপরাধী হিসেবেই দেখা হবে। রাজনৈতিক পরিচয় কোনো বিবেচনায় নেওয়া হবে না।’ রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তা কোনো বাধা হবে না বলেও জানান তিনি।

রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান সালাহউদ্দিন।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচারবিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান বলেন, নাগরিকদের অধিকার লঙ্ঘিত হলে, সরকারি বা বেসরকারি স্থাপনায় ভাঙচুর হলে কিংবা মানুষ হামলার শিকার হলে সরকার উদ্বিগ্ন ও বিব্রত হয়। তিনি বলেন, তদন্তে এসব ঘটনায় যার সম্পৃক্ততা পাওয়া যাবে, তাকে আইনের আওতায় আনা হবে।

এদিকে বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশও দলের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান চালানোর দাবি তুলেছে। তাদের যুক্তি, দীর্ঘদিন ধরে দলের রাজনৈতিক আন্দোলনে যুক্ত থাকা ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্প্রতি ব্যক্তিস্বার্থে বিএনপির নাম ব্যবহার করতে চাওয়া ব্যক্তিদের এক করে দেখা উচিত নয়। তারা দলের নাম ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করার পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছে।

তৃণমূলের বিএনপি নেতারা মনে করেন, ‘হাইব্রিড’ বা ‘নতুন বিএনপি’র সদস্য হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেওয়া ব্যক্তিদের ব্যাপারেও দলকে সতর্ক থাকতে হবে। ক্ষমতায় আসার পর দলের পরিচয় ব্যবহার করে এসব ব্যক্তি যাতে প্রভাব বিস্তার করতে না পারেন, সেটি নিশ্চিত করার প্রয়োজন রয়েছে।

দলের কমিটিতে কোনো ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়ার আগে তার রাজনৈতিক পরিচয়, সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা এবং জনগণের সঙ্গে তার কর্মকাণ্ড বিবেচনায় নেওয়ার ওপরও তারা জোর দিয়েছেন। বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও মনে করে, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা দলের রাজনৈতিক ভিত্তি ধরে রাখতে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা শক্তিশালী করা জরুরি।

দলের পরিচয়ের অপব্যবহার ঠেকাতে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত কার্যকর জবাবদিহির ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে বহিষ্কার, সাংগঠনিক দায়িত্ব প্রত্যাহার এবং কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার মতো পদক্ষেপ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে।

দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গ কিংবা দলের পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে কুড়িগ্রামের চিলমারী, লালমনিরহাটের পাটগ্রাম, কুমিল্লা এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার নজিরও রয়েছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারকেরা বলেছেন, এসব পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে নেওয়া হচ্ছে না। এর উদ্দেশ্য সাংগঠনিক শৃঙ্খলা এবং দলের ভাবমূর্তি রক্ষা করা। তাদের ভাষ্য, কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের মূল বার্তা হলো, দলের নামে অপরাধ করে কেউ রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবিধা নিতে পারবেন না।

বিএনপির নীতিনির্ধারকদের মতে, রাজনৈতিক পরিচয়কে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না; এ বিষয়টি দল স্পষ্ট করতে চায়। একই সময়ে সরকারও যখন বলছে, কোনো অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তার রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনায় নেওয়া হবে না, তখন দলের সাংগঠনিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং রাষ্ট্রীয় আইনের প্রয়োগও একই ধরনের কঠোর অবস্থানের দিকে এগোচ্ছে।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘জাতীয়তাবাদী আদর্শের প্রকৃত কর্মীরা কখনো চাঁদাবাজি বা জমি দখলের সঙ্গে জড়িত হতে পারেন না। দলের নাম ব্যবহার করে যারা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত হবে, বিএনপি তাদের কাউকে ছাড়বে না। তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনি; দুই ধরনের ব্যবস্থাই নেওয়া হবে।’