Image description

সমুদ্রসৈকত থেকে পাহাড়, বন থেকে নদী বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় পর্যটনকেন্দ্রগুলো শুধু ভ্রমণপিপাসু মানুষের আকর্ষণের জায়গা নয়, স্থানীয় মানুষের জীবিকারও বড় উৎস। হোটেল-রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, ট্যুর অপারেটর, গাইড, হস্তশিল্প, ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ পর্যটকদের ঘিরে গড়ে উঠেছে নানা ধরনের কর্মসংস্থান।

বিশ্ব পর্যটন ও ভ্রমণ খাতের অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে গবেষণা করা ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিলের (ডব্লিউটিটিসি) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম খাত মোট প্রায় ২১ লাখ ৮০ হাজার কর্মসংস্থানকে সমর্থন করেছে, যা দেশের মোট কর্মসংস্থানের প্রায় ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে এ সংখ্যা ছিল প্রায় ১৭ লাখ ৪০ হাজার। অর্থাৎ পাঁচ বছরের ব্যবধানে পর্যটন-সংশ্লিষ্ট কর্মসংস্থান বেড়েছে প্রায় ৪ লাখ ৪০ হাজার।

 

তবে এই সংখ্যা শুধু হোটেল বা ট্যুর কোম্পানির চাকরি নয়। পর্যটন খাতের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মী যেমন রয়েছেন, তেমনি পর্যটকদের ব্যয়ের মাধ্যমে পরোক্ষ ও প্ররোচিত কর্মসংস্থানও এই হিসাবের অন্তর্ভুক্ত।

কারা কাজ করছেন পর্যটনকে ঘিরে?

একজন পর্যটক কোনও জায়গায় ঘুরতে গেলে তার ব্যয়ের একটি অংশ যায় হোটেল বা রিসোর্টে, একটি অংশ পরিবহনে, আবার খাবার, কেনাকাটা, বিনোদন ও স্থানীয় সেবাতেও অর্থ খরচ হয়। ফলে পর্যটন বাড়লে একসঙ্গে অনেক ধরনের পেশার মানুষের আয় বাড়ার সুযোগ তৈরি হয়।

পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে সরাসরি কাজ করছেন- হোটেল ও রিসোর্টের কর্মী, রেস্টুরেন্টের কর্মী ও রাঁধুনি, ট্যুর গাইড, ট্যুর অপারেটর ও ট্রাভেল এজেন্ট, গাড়ি ও নৌযান চালক, পর্যটনকেন্দ্রের নিরাপত্তাকর্মী, লাইফগার্ড, ফটোগ্রাফার, স্থানীয় দোকানদার ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা এবং হস্তশিল্প ও স্থানীয় পণ্যের বিক্রেতা।

এর বাইরেও পর্যটন খাতের সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত কৃষক, খাদ্য সরবরাহকারী, নির্মাণশ্রমিক, পরিবহনসংশ্লিষ্ট কর্মীসহ আরও অনেক মানুষের আয়-রোজগার পর্যটনের ওপর নির্ভরশীল।

পর্যটনকেন্দ্রে বদলে যাচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতি

কক্সবাজার, কুয়াকাটা, সিলেট, শ্রীমঙ্গল, বান্দরবান, রাঙামাটি কিংবা সাজেকের মতো গন্তব্যে পর্যটকের উপস্থিতি স্থানীয় অর্থনীতিতে সরাসরি প্রভাব ফেলে। পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে থাকার জায়গা, খাবার, পরিবহন ও বিভিন্ন সেবার চাহিদাও বাড়ে।

বিশেষ করে পর্যটননির্ভর এলাকায় ছোট ব্যবসা ও স্ব-কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডও পর্যটন শিল্পকে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির সম্ভাবনাময় খাত হিসাবে উল্লেখ করেছে।

দেশের পর্যটনে দেশীয় পর্যটকরাই বড় বাজার

বাংলাদেশের পর্যটন অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো দেশীয় পর্যটকদের বড় ভূমিকা। ডব্লিউটিটিসি-এর ২০২৪ সালের হিসাবে বাংলাদেশে দেশীয় পর্যটন ব্যয় ছিল প্রায় ৯১০ দশমিক ৭ বিলিয়ন টাকা, যেখানে আন্তর্জাতিক পর্যটকদের ব্যয় ছিল প্রায় ৪৪ বিলিয়ন টাকা। অর্থাৎ দেশের পর্যটন ব্যবসার বড় অংশই স্থানীয় পর্যটকদের ওপর নির্ভরশীল।

এ কারণে দেশের ভেতরে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন হলে শুধু বিদেশি পর্যটক নয়, দেশীয় পর্যটকদের বাড়তি ভ্রমণও স্থানীয় কর্মসংস্থান বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

সামনে আরও কর্মসংস্থানের সুযোগ

ডব্লিউটিটিসি-এর ২০২৪ সালের গবেষণা অনুযায়ী, ২০৩৪ সালে বাংলাদেশে ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম খাতের মোট কর্মসংস্থান প্রায় ২৫ লাখে পৌঁছাতে পারে। অর্থাৎ ২০২৪ সালের তুলনায় আরও প্রায় ৩ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান যুক্ত হওয়ার পূর্বাভাস রয়েছে।

তবে কর্মসংস্থানের এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পর্যটন অবকাঠামো, যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপত্তা, দক্ষ জনবল এবং পর্যটনকেন্দ্রের পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। ডাব্লিউটিটিসি-ও পর্যটন খাতের ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষতা ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে কর্মীদের সক্ষমতা মেলানোর বিষয়টিকে গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছে।

শুধু পর্যটক নয়, জীবিকারও গল্প

একটি পর্যটনকেন্দ্রে পর্যটকের পদচারণা মানে শুধু ছবি তোলা বা ঘোরাঘুরি নয়। একজন পর্যটকের ব্যয়ের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বহু মানুষের আয়।

কক্সবাজারের সৈকতে একজন পর্যটক যে খাবার খান, যে হোটেলে থাকেন, যে গাড়িতে চলেন কিংবা স্থানীয় দোকান থেকে যে পণ্য কেনেন প্রতিটি খরচের সঙ্গে কোনও না কোনও মানুষের কর্মসংস্থান ও জীবিকা যুক্ত থাকে।

তাই পর্যটন দিবসে পর্যটনকে শুধু বিনোদনের খাত হিসাবে না দেখে কর্মসংস্থান, স্থানীয় অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবেও দেখার সুযোগ রয়েছে।

তথ্যসূত্র: ওয়ার্ল্ড ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম কাউন্সিল (ডব্লিউটিটিসি), বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড।