Image description

ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মৃত্যুদণ্ড চেয়ে প্রসিকিউশনের দায়ের করা আপিল আবেদন আট মাসেরও বেশি সময় ধরে ঝুলে আছে। এমনকি শুনানি শুরুর জন্য এখনো প্রস্তুতিও নিতে পারেনি প্রসিকিউশন।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনা ও কামালকে এক অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দেয়। তবে অন্য অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ট্রাইব্যুনালের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল দায়ের করে প্রসিকিউশন।

আপিলটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় কয়েকবার অন্তর্ভুক্ত হলেও শুনানি শুরু হয়নি।

প্রসিকিউশন সূত্রে জানা গেছে, তারা বর্তমানে শাপলা চত্বরের গণহত্যা ও গুমের মামলার মতো অন্যান্য হাই প্রোফাইল মামলার প্রস্তুতিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছেন।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনে আপিল দায়েরের ৬০ দিনের মধ্যে তা নিষ্পত্তির বিধান থাকা সত্ত্বেও এই বিলম্ব নিয়ে প্রশ্ন ওঠেছে। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা জানান, এই সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয় বরং পরামর্শমূলক। যার অর্থ হলো, বিলম্ব হলেও আপিলের বৈধতা বহাল থাকবে।

সব অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড চায় প্রসিকিউশন

নির্দিষ্ট কিছু অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়ার ট্রাইব্যুনালের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে গত বছরের ১৫ ডিসেম্বর এই আপিল দায়ের করে প্রসিকিউশন।

আপিলে প্রসিকিউশন আটটি যুক্তি উপস্থাপন করে দাবি করে, অপরাধের ধরন ও ভয়াবহতার কারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন ১৯৭৩ অনুযায়ী অভিযুক্তকে সর্বোচ্চ শাস্তি প্রদানই যুক্তিসংসদ।

প্রসিকিউশন যুক্তি দেয়, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে চরম মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে এবং নিরস্ত্র সাধারণ মানুষদের যেভাবে হত্যা করা হয়েছে, তার গুরুত্ব বিবেচনায় মৃত্যুদণ্ড ছাড়া অন্য কোনো সাজা উপযুক্ত হতে পারে না। তারা আরও উল্লেখ করে, ন্যায়বিচারের স্বার্থেই আসামির অধিকারের পাশাপাশি ভুক্তভোগীদের অধিকার এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের প্রয়োজনীয়তার মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা দরকার।

প্রসিকিউশনের মতে, আসামিদের নির্দেশনায় পরিচালিত কথিত এসব কর্মকাণ্ডের ফলে ওই সহিংসতায় ১ হাজার ৪০০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ২৫ হাজার এরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।

প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম টাইমস অব বাংলাদেশকে বলেন, ‘অপরাধের মাত্রা বিবেচনায় আমরা বিশ্বাস করি অন্য অভিযোগগুলোতেও আসামিদের মৃত্যুদণ্ড পাওয়া উচিত ছিল। সেই কারণেই সাজা বৃদ্ধির আবেদন জানিয়ে এই আপিল দায়ের করা হয়েছে।’

নিয়মিত বেঞ্চে স্থানান্তরিত আপিল

গত ১ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হকের কাছে আপিলটি প্রথম উপস্থাপন করা হয়। তিনি পূর্ণাঙ্গ শুনানির জন্য এটি নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে দেন।

এর পর থেকে মামলাটি আপিল বিভাগের কার্যতালিকায় রয়ে গেলেও শুনানির জন্য তা গ্রহণ করা হয়নি।

প্রসিকিউশনের একটি সূত্র স্বীকার করে, তাদের টিম বর্তমানে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মামলা নিয়ে ব্যস্ততার কারণে হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের আপিলের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো শেষ করতে পারেনি।

সূত্রটি আরও জানায়, যেহেতু শেখ হাসিনা ও কামাল ইতিমধ্যে অন্য একটি অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন, তাই বাকি অভিযোগগুলোতে সাজা বাড়ানোর বিষয়ে প্রসিকিউশনের তাগিদ কিছুটা কমে গেছে।

বিলম্ব নিয়ে আইনজীবীদের প্রশ্ন

আপিল শুনানি ত্বরান্বিত করতে প্রসিকিউশন কেন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আইন বিশেষজ্ঞরা।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সাইফুর রহমান বলেন, ‘সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে মনে হয় শেখ হাসিনার মামলার ক্ষেত্রে প্রসিকিউশনের অবহেলা ও আগ্রহের অভাব রয়েছে।’

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী শরীফ ভূঁইয়া বলেন, আপিলটি দ্রুত নিষ্পত্তি করা উচিত। তিনি বলেন, ‘বিচারিক আদালতের রায় সঠিক ছিল নাকি তাতে কোনো আইনি ত্রুটি ছিল, তা আপিল বিভাগ নির্ধারণ করবে। মামলাটি অনিশ্চিতকালের জন্য ঝুলিয়ে রাখা উচিত নয়।’

সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সম্পাদক মোহাম্মদ আলীও দ্রুত নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে বলেন, আপিল বিভাগ রায় না দেওয়া পর্যন্ত মামলাটি চূড়ান্ত পরিণতিতে পৌঁছাতে পারবে না। তিনি আরও বলেন, জনগণ ন্যায়বিচারের জন্য অপেক্ষা করছে।

এদিকে, সাজা বাড়ানোর আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করলেও ঠিক কবে নাগাদ শুনানি শুরু হবে তা নির্দিষ্ট করে বলতে রাজি হননি ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম।

তিনি টাইমসকে বলেন, ‘প্রয়োজন অনুসারে শুনানির জন্য পদক্ষেপ নেওয়া হবে। বর্তমানে আমরা অন্যান্য মামলাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছি।’