Image description

দুর্গাপূজা সামনে রেখে এবারও বাংলাদেশের পদ্মা-মেঘনার ইলিশ চেয়েছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা। ইলিশ আমদানির অনুমতি চেয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, পররাষ্ট্র ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে পৃথক চিঠি দিয়েছে ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটির পক্ষ থেকে রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পাশাপাশি অন্তত উৎসবের সময় পর্যাপ্ত সময় ধরে ইলিশ পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।

তবে এবার ঠিক কত টন ইলিশ ভারতে পাঠানো হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতের আবেদন ইতিবাচকভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ইলিশ উৎপাদন, দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করেই রপ্তানির পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। ইতোমধ্যে বাংলাদেশের ১৮টি প্রতিষ্ঠান ভারতে ইলিশ রপ্তানির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেছে।

এ প্রসঙ্গে বাণিজ্য সচিব আতাউর রহমান খান বলেন, ভারতীয় ব্যবসায়ীদের চিঠি পেয়েছি। তবে কী পরিমাণ ইলিশ রপ্তানি করা যায়, তা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করা হবে। অর্থাৎ এখনই নির্দিষ্ট কোনো কোটা ঘোষণা করা হয়নি।

ভারতের ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের ১২ আগস্ট ২০২৬ তারিখের চিঠিতে বলা হয়েছে, ১৯৯৬ সালের পর দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ থেকে প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ হাজার টন ইলিশ ভারতে যেত। ২০১২ সালে নিয়মিত রপ্তানি বন্ধ হয়ে যায়। পরে ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে সীমিত সময়ের জন্য বিশেষ অনুমতিতে আবার ইলিশ পাঠানো শুরু হয়। ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী-২০১৯ সালে ৫০০ টন, ২০২০ সালে ১ হাজার ৮৫০ টন এবং ২০২১ সালে ৪ হাজার ৬০০ টন ইলিশ রপ্তানির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু অনুমোদিত পরিমাণের পুরোটা কখনোই ভারতে যায়নি। ২০২১ সালে অনুমোদনের বিপরীতে যায় প্রায় ১ হাজার ২০০ টন। ২০২২ সালে ২ হাজার ৯০০ টনের বিপরীতে ১ হাজার ৩০০ টন এবং ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৯৫০ টনের বিপরীতে ১ হাজার ৩০০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়। সবচেয়ে বড় পতন দেখা যায় সাম্প্রতিক দুই বছরে। ২০২৪ সালে ২ হাজার ৪২০ টন রপ্তানির অনুমোদন থাকলেও ভারতে যায় প্রায় ৫৭৭ টন। আর ২০২৫ সালে ১ হাজার ২০০ টন অনুমোদনের বিপরীতে বাস্তবে গেছে প্রায় ১৫০ টন।

অর্থাৎ গত বছর অনুমোদিত কোটার মাত্র সাড়ে ১২ শতাংশের মতো ইলিশ ভারতে পৌঁছেছিল। ফলে এবার ভারতীয় ব্যবসায়ীরা শুধু বেশি পরিমাণ নয়, আরও দীর্ঘ রপ্তানি সময়সীমা চেয়েছেন। তবে এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কোনো পরিমাণ ঘোষণা না হওয়ায় ২০২৬ সালে ঠিক কত টন ইলিশ ভারতে যাবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। মৎস্য মন্ত্রণালয়ের মতামত, দেশের উৎপাদন ও অভ্যন্তরীণ বাজারের সরবরাহের ওপরই বিষয়টি নির্ভর করবে। বিশেষ করে গত দুই বছরে অনুমোদিত ইলিশের বড় অংশ রপ্তানি না হওয়ার বিষয়টি সরকার বিবেচনায় নিতে পারে। গত বছর ১ হাজার ২০০ টন অনুমোদন দেওয়া হলেও বাস্তবে মাত্র ১৫০ টন। ফলে এবার শুধু কাগজে বড় কোটা না দিয়ে বাস্তবে কতটা মাছ পাঠানো সম্ভব, সেটিও বিবেচনায় নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

জানা গেছে, ইলিশ নিয়ে সরকারের সতর্ক থাকার অন্যতম কারণ দেশের উৎপাদন পরিস্থিতি। মৎস্য খাতের সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ৫ লাখ ৭১ হাজার টনের বেশি হলেও পরবর্তী দুই বছরে তা কমেছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে উৎপাদন নেমে আসে ৫ লাখ ১২ হাজার ৮৫৮ টনে। এদিকে চলতি মৌসুমেও নদী ও সাগরে ইলিশের প্রাপ্যতা নিয়ে নানা ধরনের তথ্য রয়েছে। ফলে মৎস্য মন্ত্রণালয় রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে দেশের ভোক্তার চাহিদা ও জেলেদের স্বার্থকে গুরুত্ব দিতে পারে।

ভারতীয় ব্যবসায়ীদের দাবি : ফিশ ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের চিঠিতে শুধু ইলিশ পাঠানোর অনুমতিই নয়, বর্তমান সীমিত সময়ের রপ্তানি ব্যবস্থা পরিবর্তনের দাবিও জানানো হয়েছে। তাদের বক্তব্য, এক মাসের মতো স্বল্প সময়ের মধ্যে অনুমোদিত পুরো ইলিশ ভারতে নেওয়া সম্ভব হয় না। গত বছরের ১৫০ টন রপ্তানির বিষয়টি তার বড় উদাহরণ। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আনোয়ার মকসুদ জানিয়েছেন, তারা এবার বেশি পরিমাণ ইলিশ পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদী। ইতোমধ্যে চিঠি দেওয়ার পাশাপাশি বাণিজ্য সচিবের সঙ্গে বৈঠকও করেছেন। তার দাবি, রপ্তানির সময়সীমা তুলে দেওয়া হলে অনুমোদিত মাছের বড় অংশ ভারতীয় বাজারে নেওয়া সম্ভব হবে।