আদালতে গত মঙ্গলবার অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার জেরে প্রধান বিচারপতির এজলাস ছেড়ে চলে যাওয়ার ঘটনাটি সংসদের নজরে এনেছেন জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান। ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগে এ ধরনের ঘটনা ফ্যাসিবাদী আমলে প্রধান বিচারপতিকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করার ঘটনার বার্তা দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
বুধবার জাতীয় সংসদে নাজিবুর রহমান পয়েন্ট অব অর্ডারে প্রসঙ্গটি তোলেন। তিনি বলেন, সংসদ সদস্য, সুপ্রিম কোর্ট বারের প্রেসিডেন্ট ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকনের সঙ্গে প্রধান বিচারপতির একটি বাদানুবাদের ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে প্রধান বিচারপতি এবং আপিল বিভাগের সব বিচারপতি তাদের এজলাস ত্যাগ করেন এবং মঙ্গলবার তারা আর কোর্টে ফিরে আসেননি।
ঘটনার সময় নিজে উপস্থিত ছিলেন উল্লেখ করে ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, ঘটনার সময় আমি কোর্টে উপস্থিত ছিলাম। একজন আইনজীবী বারংবার সত্যকে গোপন করে রিট করার কারণে পেনাল্টি হিসেবে জরিমানা করা হয়, যার পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনাটির সূত্রপাত হয়।
তিনি বলেন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন শুধুমাত্র একজন আইনজীবী নন, তিনি সুপ্রিম কোর্ট বারের—বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি। একইসঙ্গে তিনি এই সংসদে সরকার দলের একজন প্রভাবশালী সদস্য। এ ধরনের যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, এটা আমরা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার কথা বলি; জনগণের ন্যায়বিচার পাওয়ার সর্বশেষ আশ্রয়স্থল বিচার বিভাগে এ ধরনের ঘটনা জনগণকে কী বার্তা দিচ্ছে, তা আমাদেরকে চিন্তা করা উচিত।
ঘর পোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পায় প্রবাদ বাক্যের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বলেন, অতীতে এক দুঃখজনক ঘটনা আমরা দেখেছি। ফ্যাসিবাদী আমলে প্রধান বিচারপতিকে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয়েছিল। এ ধরনের ঘটনা সে ধরনের বার্তা দিচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে।
সকলকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করা উচিত মন্তব্য করে নাজিবুর রহমান বলেন, রাষ্ট্রের যে তিনটি প্রধান অঙ্গ রয়েছে, এই তিনটা মিলে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক। একটা অঙ্গ আরেক অঙ্গের ওপরে কোনো প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করবে না, এটাই সবার জন্য প্রযোজ্য হবে। এ বিষয়ে তিনি আইনমন্ত্রীর একটি বক্তব্য প্রত্যাশা করেন।
জবাবে আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেন, সংসদ সদস্য যে প্রশ্নটা উত্থাপন করেছেন, নিশ্চিতভাবে প্রশ্নটা আলোচনার দাবি রাখে। কারণ, তিনি যেটা বললেন— সেপারেশন অব পাওয়ারের যে থিওরি, তা এখানে অ্যাপ্লাই করে না। কারণ ঘটনাটি ঘটেছে একজন আইনজীবীর সঙ্গে, সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির সঙ্গে। সুপ্রিম কোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশন বাংলাদেশের তিনটা অর্গানের পার্ট নয়। এটি একটি ইনফরমাল বডি। তারা জনগণের অংশ। এটি বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ বা শাসন বিভাগকে প্রতিনিধিত্ব করেনি। তবে এর অর্থ এই নয়, আমি ওই ঘটনাটিকে বৈধতা দিচ্ছি।
আদালতে অতীতের একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী আসাদুজ্জামান বলেন, বিচারালয়ে এ ধরনের ঘটনা হয়ে থাকে। এটি বার ও বেঞ্চের সম্পর্কের বিষয়।
প্রধান বিচারপতির এজলাস থেকে উঠে যাওয়ার প্রসঙ্গ টেনে আইনমন্ত্রী বলেন, কাল (মঙ্গলবার) প্রধান বিচারপতি যেভাবে কোর্ট থেকে উঠে গেলেন। আমাদের কাছে মনে হয়েছিল আজ (বুধবার) তিনি কোর্টে উঠে কনটেম্পট রুল ইস্যু করবেন। কিন্তু তিনি যথাসময়ে যথারীতি কাজ শুরু করেছেন এবং ওই আইনজীবী (মাহবুব উদ্দিন খোকন) সেই প্রধান বিচারপতির কোর্টেই গিয়ে স্বাভাবিকভাবে মামলা করেছেন বলে খবর পেয়েছি।
ঘটনাটিকে সংসদের নজরে আনার কারণে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদে ধন্যবাদ জানিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, এরকম একটি ইস্যু সামনে নিয়ে আসার কারণে আমরা আলোচনা করতে পারলাম। তবে এ ধরনের ঘটনা ভবিষ্যতে দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে কেউ ঘটাবেন না বলে আমরা প্রত্যাশা রাখি।
পরে সংসদে এসে বিষয়টি নিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা দিতে ফ্লোর চান ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন। তিনি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে ঘটে যাওয়া ঘটনা বর্ণনা করার চেষ্টা করেন। এ সময় স্পিকার তার উদ্দেশে বলেন, আপনার যদি বিশেষ ব্যাখ্যা থাকে তা দিন। আমার মনে হয়, আইনমন্ত্রী যেভাবে ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সংসদে তা গ্রহণযোগ্য হয়েছে। আর নতুন করে যদি যুক্ত করার না থাকে তাহলে বসুন।
এ পর্যায়ে মাহবুব উদ্দিন খোকন আবার ঘটনার বর্ণনা দিতে গেলে তখন স্পিকার বলেন, জুডিশিয়াল বিষয়ে অভ্যন্তরীণ কথা বলা শোভা পাচ্ছে না। আপনি বসুন। একপর্যায়ে সংসদ কক্ষে হৈ-চৈ হলে স্পিকার তার মাইক বন্ধ করে দেন।