বেকারি পণ্য, স্ন্যাকস ও স্যাভরি পণ্য (মসলাদার খাবার), চকলেট ও কনফেকশনারি (মিষ্টিজাতীয় খাবার), দুগ্ধজাত পণ্য, কোমল পানীয়-এই ৫ ধরনের ৩২টি পণ্য পরীক্ষা করে উদ্বেগজনক মাত্রায় ভারী ধাতুর উপস্থিতি পেয়েছেন গবেষকরা। দেশের বাজারে পাওয়া এসব প্রক্রিয়াজাত খাবারে সিসা ও ক্রোমিয়ামের উপস্থিতি নির্ধারিত সীমার তুলনায় অনেক বেশি পাওয়া গেছে। দেখা গেছে, ৩২টি পণ্যের মধ্যে ৩১টিতেই রয়েছে শিশুদের জন্য সম্ভাব্য অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি।
গবেষণাটি যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগ এবং পরিবেশবিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগের গবেষক এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি ও অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব উলংগংয়ের গবেষকদের অংশগ্রহণে পরিচালিত হয়। গবেষণাটির প্রধান লেখক ও গবেষক যবিপ্রবির পুষ্টি ও খাদ্যপ্রযুক্তি বিভাগের সাবেক শিক্ষার্থী এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রভাষক মো. সাখাওয়াত হোসাইন। গবেষণাটি ‘জার্নাল অব ফুড কম্পোজিশন অ্যান্ড অ্যানলিসিস’-এর ২০২৬ সালের ১৫৮তম খণ্ডে ২২ আগস্ট অনলাইনে প্রকাশিত হয়।
গবেষণায় ছয়টি ভারী ধাতু সিসা, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক, ক্রোমিয়াম, তামা ও নিকেল পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ক্যাডমিয়াম ও আর্সেনিক কোনো নমুনাতেই পাওয়া যায়নি। তবে ক্রোমিয়াম, নিকেল, তামা ও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।
গবেষণায় দেখা যায়, বেকারি ও কনফেকশনারি পণ্যে সিসার নির্ধারিত সীমা ০.১ মিলিগ্রাম/কেজি হলেও ক্রিমরোলের একটি নমুনায় সর্বোচ্চ ৩৫.৭০ মিলিগ্রাম/ কেজি সিসা পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে ৩৫৭ গুণ বেশি। একই শ্রেণির পণ্যে ক্রোমিয়ামের নির্ধারিত সীমা ০.৫ মিলিগ্রাম/কেজি হলেও ক্রিমরোলের নমুনায় সর্বোচ্চ ৩৫.৩৯ মিলিগ্রাম/কেজি ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে, যা নির্ধারিত সীমার চেয়ে প্রায় ৭১ গুণ বেশি। একইভাবে মিল্ক চকলেটে সিসা ও ক্রোমিয়ামের পরিমাণ নির্ধারিত সীমার তুলনায় যথাক্রমে প্রায় ২৯৫ ও ৫৩ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
এছাড়া বিভিন্ন পানীয়ের নমুনায়ও ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। একটি কৃত্রিম আমের পানীয়ের নমুনায় ক্রোমিয়াম ১৩.৯৮, নিকেল ৩.০২, তামা ৮.৬৯ এবং সীসা ১১.৮৮ মিলিগ্রাম/কেজি পাওয়া যায়। সফট ড্রিংকের ক্ষেত্রে সিসার নির্ধারিত সীমা ০.০২ মিলিগ্রাম/কেজি এবং ক্রোমিয়ামের সীমা ০.০৫ মিলিগ্রাম/কেজি। ওই নমুনায় সিসার মাত্রা নির্ধারিত সীমার তুলনায় প্রায় ৫৯৪ গুণ এবং ক্রোমিয়াম প্রায় ২৮০ গুণ বেশি পাওয়া গেছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হওয়ার কারণ হিসাবে গবেষণায় তাদের কম শারীরিক ওজনের বিষয়টি উঠে এসেছে। একই পরিমাণ খাবার গ্রহণ করলেও শরীরের ওজনের তুলনায় তাদের ধাতু গ্রহণের মাত্রা বেশি হতে পারে। গবেষণায় প্রাপ্ত হিসাব অনুযায়ী, ৩২টি পণ্যের মধ্যে ৩১টিতে শিশুদের সম্মিলিত অ-ক্যানসারজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারিত সীমার ওপরে ছিল। প্রাপ্তবয়স্কদের ক্ষেত্রে এমন পণ্যের সংখ্যা ৯টি।
গবেষণায় যশোর জেলার বিভিন্ন খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি পণ্যের ভিন্ন উৎপাদন ব্যাচের তিনটি করে প্যাকেট নিয়ে সেগুলো একত্র করে পরীক্ষার জন্য নমুনা তৈরি করা হয়। গবেষকরা বলেন, পরীক্ষিত পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়মিত বাজারজাত হওয়া পণ্য হওয়ায় যশোরের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য এলাকার ভোক্তাদের ক্ষেত্রেও এসব ফলাফল প্রাসঙ্গিক।
গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভারী ধাতু মাটি, পানি ও বায়ু থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করতে পারে। উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় শিল্প-সরঞ্জাম, খাদ্য উপাদান বা প্যাকেজিং থেকেও দূষণের আশঙ্কা রয়েছে। তবে এই গবেষণায় কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা কারখানাকে দূষণের উৎস হিসাবে চিহ্নিত করা হয়নি।
গবেষণার প্রধান লেখক মো. সাখাওয়াত হোসাইন বলেন, এ বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা প্রয়োজন।