Image description

দেশের বিভিন্ন জেলায় রাসায়নিক সারের পর্যাপ্ত মজুতের দাবি করছে কৃষি বিভাগ। সরকারি হিসাবে কোথাও বরাদ্দ গত বছরের তুলনায় বেড়েছে, কোথাও চাহিদার তুলনায় মজুতও বেশি। কিন্তু মাঠের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। প্রয়োজনের সময় ডিলারের কাছে চাহিদামতো সার না পাওয়া, বেশি দামে কেনা, প্রয়োজনের সঙ্গে বাড়তি সার নিতে বাধ্য করা এবং সংকটের আশঙ্কায় কৃষকের আগাম সার মজুতের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও আবার কৃত্রিম সংকট তৈরি করে কালোবাজারে সার বিক্রির ঘটনাও ধরা পড়েছে। ফলে কাগজে পর্যাপ্ত সার থাকলেও কৃষকের হাতে তা কতটা সহজে ও ন্যায্যমূল্যে পৌঁছাচ্ছে, সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে। সব মিলিয়ে সরকারি হিসাব ও মাঠের বাস্তবতার মধ্যে স্পষ্ট ফারাক দেখা যাচ্ছে। সামনে রবি মৌসুমে সারের চাহিদা বাড়বে। তাই এখনই সরবরাহ ব্যবস্থায় নজরদারি, ডিলারদের জবাবদিহি এবং কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নিলে কৃষকের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

রাজশাহী : রাজশাহীতে সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া ৫ হাজার ১৮৬, টিএসপি ১ হাজার ৪৫, এমওপি ১ হাজার ৬২৯ এবং ডিএপি ৩ হাজার ১৫ টন বরাদ্দ রয়েছে। কৃষি বিভাগের দাবি, বরাদ্দ স্বাভাবিক থাকলেও আলু চাষ সামনে রেখে কৃষকরা আগাম সার কিনছেন। সার সংকটের গুজবেও অনেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত সার সংগ্রহ করছেন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে পুকুরে সার ব্যবহার। জেলার প্রায় ৫০ হাজার পুকুরে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরিতে ইউরিয়া ও টিএসপি ব্যবহারের কারণে ফসলের জন্য বরাদ্দ সারেও চাপ পড়ছে। কৃষি বিভাগের হিসাবে, শুধু পুকুরে মাসে ১ হাজার ৩৩৪ দশমিক ৩৭ টন করে ইউরিয়া ও টিএসপি প্রয়োজন।

কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে গোদাগাড়ীর এক সার ডিলারকে এক মাসের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার কাছ থেকে ৫০০ বস্তা সার জব্দ করা হয়। মঙ্গলবার বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী জানান, বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ দশমিক ৫ টন ডিএপি এবং বিএডিসির গুদামে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি ও ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি মজুদ রয়েছে।

বগুড়া : সার বাজার নিয়ন্ত্রণে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার মো. ইউসুফ আলী ডিলারদের প্রতিটি ইউনিয়ন ও দোকানে সার আসা এবং বিক্রির রেকর্ড রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ক্যাশমেমো ও ক্রেতার ফোন নম্বর সংরক্ষণ এবং কোনো কৃষক যেন সার নিতে এসে ফিরে না যান, তা নিশ্চিত করতে বলেছেন। তার মতে, পর্যাপ্ত মজুত থাকা সত্ত্বেও গুজবের কারণে কৃষকের অতিরিক্ত সার কেনার প্রবণতা অনেক জায়গায় চাপ তৈরি করছে। তিনি বুধবার বগুড়া জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তাদের অংশগ্রহণে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন।

ময়মনসিংহ, গফরগাঁও ও ফুলপুর : জেলায় সার সংকট নেই বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। তবে চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ প্রায় ৩০ শতাংশ কম বলে দাবি ডিলারদের। আবাদি জমি ও কৃষকের সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি আনারস, লেবু, কলা, সবজি ও মাছ চাষও বাড়ছে। কিন্তু কয়েক বছর আগের হিসাব অনুসারে চাহিদা নির্ধারণ করায় বরাদ্দে তার প্রতিফলন নেই। ফলে ভবিষ্যতে সংকট বাড়ার আশঙ্কা করছেন ডিলার ও কৃষকরা। সংকটের আশঙ্কায় কৃষকের আগাম সার মজুতের প্রবণতাও বেড়েছে। ৩ সেপ্টেম্বর মুক্তাগাছায় উত্তরবঙ্গে পাচারের উদ্দেশ্যে নেওয়া এক ট্রাক টিএসপি ও এমওপি সার জব্দ করে পুলিশ।

গফরগাঁওয়ে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলে কৃষকদের অভিযোগ। সেখানে ইউরিয়া কেজিপ্রতি ৩০-৩২ টাকা এবং টিএসপি ২৮ টাকা পর্যন্ত বিক্রির কথা জানা গেছে। অথচ ৫০ কেজির এক বস্তা ইউরিয়ার সরকারি মূল্য ১ হাজার ৩৫০ টাকা, অর্থাৎ কেজিপ্রতি ২৭ টাকা। খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, ডিলারদের কাছ থেকেই বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে।

ফুলপুরে সার সংকট না থাকলেও কৃষকদের মধ্যে রয়েছে আতঙ্ক। উপজেলা কৃষি অফিসের হিসাবে, ইউরিয়া ৩৪১, টিএসপি ৫৬ দশমিক ৬৫, ডিএপি ৮৬ দশমিক ৩৫ ও এমওপি ২৬০ দশমিক ৭০ টন মজুত রয়েছে। তবে ভবিষ্যতে বোরো মৌসুমে সার পাওয়া যাবে না-এমন আশঙ্কায় কেউ কেউ আগাম সার কিনছেন।

পাবনা : জেলার কৃষকরা ডিলারের কাছে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন। দুই বস্তা টিএসপি চাইলে ৫ থেকে ১০ কেজি দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। ফলে বাধ্য হয়ে খুচরা বাজার থেকে বেশি দামে সার কিনছেন কৃষকরা। কৃষি বিভাগের দাবি, জেলায় পর্যাপ্ত সার মজুত রয়েছে। সেপ্টেম্বরে ইউরিয়া ৩ হাজার ২২, টিএসপি ৪৯৫, ডিএপি ১ হাজার ৬৬১ ও এমওপি ১ হাজার ১৮১ টন বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

মানিকগঞ্জ : জেলায় বরাদ্দ বাড়লেও কৃষকের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। সদর উপজেলার একটি বিক্রয়কেন্দ্রে ডিএপি নিতে গেলে সঙ্গে পটাশ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হচ্ছে বলে কৃষকরা অভিযোগ করেছেন। দুই বস্তা ডিএপির সঙ্গে এক বস্তা পটাশ না নিলে প্রয়োজনীয় সার দেওয়া হচ্ছে না। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। অথচ কৃষি বিভাগ বলছে, জেলায় কোনো সার সংকট নেই।

সিংড়া (নাটোর) : উপজেলায় সার সংকটের আতঙ্ককে কাজে লাগিয়ে কালোবাজারির অভিযোগে প্রশাসন অভিযান চালিয়েছে। মঙ্গলবার রাতে বড়গাঁও বাজারে তিন ব্যবসায়ীর দোকান থেকে ২৫৩ বস্তা অবৈধ সার জব্দ করা হয়। দুই ব্যবসায়ীকে সাত দিনের বিনাশ্রম কারাদণ্ড ও জরিমানা এবং আরেক ব্যবসায়ীকে জরিমানা করা হয়েছে। একই অভিযানে এক কৃষকের কাছ থেকেও আট বস্তা অবৈধ সার জব্দ করা হয়।

ঠাকুরগাঁও : জেলায় সরকারি হিসাবে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। বুধবার পর্যন্ত জেলায় ৮৩৪ টন ইউরিয়া, ৫৮০ টন টিএসপি, ৮৮৩ টন পটাশ ও ১ হাজার ৪০৩ টন ডিএপি মজুত ছিল। বিএডিসির গুদামেও রয়েছে বিপুল পরিমাণ সার। এরপরও খুচরা পর্যায়ে বেশি দামে সার বিক্রি এবং কৃত্রিম সংকটের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েকজন প্রভাবশালী ডিলারের সিন্ডিকেট, অবৈধ মজুত ও অন্য জেলায় সার পাচারের কারণে এ পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে একজন ব্যবসায়ীকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানাও করা হয়েছে।

মুন্সীগঞ্জ : জেলায় বর্তমানে সারের চাহিদা কম। বর্ষায় অধিকাংশ জমি পানিতে থাকায় ডিলাররা দোকানও নিয়মিত খুলছেন না। তবে ভিটি জমির সবজি চাষিরা অল্প পরিমাণ সার কিনতে গিয়ে কেজিতে ৪-৫ টাকা বেশি দেওয়ার অভিযোগ করেছেন। কৃষকদের আশঙ্কা, রবি মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ ও বাজার মনিটরিং জোরদার না করলে সিন্ডিকেট সক্রিয় হয়ে সংকট তৈরি করতে পারে।

জয়পুরহাট : কৃষি বিভাগের হিসাবে, জেলায় ইউরিয়া ২ হাজার ১০৪ দশমিক ৮৫, টিএসপি ৫৭৭ দশমিক ৮৫, ডিএপি ১ হাজার ২৮৯ দশমিক ৮৫ এবং এমওপি ২ হাজার ৩৬৬ দশমিক ৭০ টন মজুত রয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সেখানে সরকার নির্ধারিত দামেই সার বিক্রি হচ্ছে এবং সংকটের অভিযোগ নেই।

সাঘাটা (গাইবান্ধা) : গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ, সাদুল্লাপুর ও ফুলছড়ি উপজেলায় ১৬ দিনে পৃথক ছয়টি অভিযানে ৫৫৭ বস্তা সার জব্দ হয়েছে। এসব ঘটনায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একটি ঘটনায় ২১১ বস্তা এবং আরেকটিতে ২০৯ বস্তা সার একসঙ্গে জব্দ হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, কৃষকের জন্য বরাদ্দ করা এত বিপুল সার কীভাবে ব্যক্তিগত গুদাম ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে গেল।

লালমনিরহাট ও কালীগঞ্জ : লালমনিরহাটে সেপ্টেম্বরে ৩ হাজার ২১০ টন ইউরিয়া বরাদ্দের বিপরীতে ডিলাররা উত্তোলন করেছেন ১৯ টন। টিএসপি ৭৫০ টনের বিপরীতে ৪৯২, ডিএপি ১ হাজার ৬৯৫ টনের বিপরীতে ৯৯৮ দশমিক ৭ এবং এমওপি ১ হাজার ১৯১ টনের বিপরীতে ৭৩৬ দশমিক ৮ টন উত্তোলন হয়েছে। বিশেষ করে ইউরিয়া উত্তোলন তলানিতে থাকায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

কুড়িগ্রাম : কৃষি বিভাগের হিসাবে চলতি মাসে চাহিদার বিপরীতে ইউরিয়া ২ হাজার ৬৩৭, টিএসপি ৩৬১, ডিএপি ৮৬৭ ও এমওপি ৬৯১ টন উত্তোলন হয়েছে। মজুতও রয়েছে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে। এরপরও ডিলার পয়েন্টে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে সার শেষ হয়ে যাচ্ছে, কৃষকদের ভিড় বাড়ছে। সারের দাবিতে অবরোধ, কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ, এমনকি গোডাউন ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। প্রশাসনের সাতটি অভিযানে ৫ লাখ টাকা জরিমানা এবং শতাধিক বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে।

পটিয়া (চট্টগ্রাম) : পটিয়ায় কৃষকদের দাবি, ইউরিয়া ২৭ টাকার পরিবর্তে ৩২ থেকে ৩৫, টিএসপি ৪০ থেকে ৪৮ এবং ডিএপি ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে। এমনকি কেজিপ্রতি ২১ টাকা পর্যন্ত বাড়তি নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। রোববার বেশি দামে সার বিক্রির দায়ে এক ডিলারকে জরিমানাও করা হয়েছে।