Image description

মালয়েশিয়ায় খুলছে বাংলাদেশিদের শ্রমবাজার। এ প্রক্রিয়ার মধ্যেই নতুন করে আলোচনায় এসেছে আগের সিন্ডিকেট বিতর্ক। দুই হাজার প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ২৫টির নাম প্রকাশ করায় সংক্ষুব্ধ হয়েছে অন্য এজেন্সিগুলো। এর তালিকায় আগের সিন্ডিকেট চক্রের সদস্য, আওয়ামী লীগ এবং বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রতিষ্ঠান স্থান পেলেও বাদ পড়েছে অনেক অভিজ্ঞ ও বড় রিক্রুটিং এজেন্সি। এখানেই দানা বেঁধেছে বিতর্ক, গুঞ্জন চলছে নতুন সিন্ডিকেটের।

সরকারের ভাষ্য, বর্তমান শাসকদের সফল প্রচেষ্টায় শিগগিরই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশিদের কর্মসংস্থানের দুয়ার খুলছে। সরকারের বিশেষ অনুরোধে ১০ হাজার কর্মীকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে (জিরো কস্ট) নেওয়ার বিষয়ে নীতিগতভাবে একমত পোষণ করেছে মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষ। বিমান ভাড়াসহ সব ধরনের অভিবাসন ব্যয়মুক্ত এই কর্মীদের প্রথম বহর সরকারি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) মাধ্যমে বিশেষ চার্টার্ড ফ্লাইটে মালয়েশিয়ায় পাঠানোর মাধ্যমেই আবার শুরু হবে এই শ্রমবাজার।

তবে বাদ পড়া এজেন্সি ও অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা প্রশ্ন তুলেছেন, আগের ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পর আবারও কেন একই ধরনের সীমিত তালিকা। একই সঙ্গে তালিকাটি কোন মানদণ্ডে তৈরি করা হয়েছে এবং অন্য বৈধ এজেন্সিগুলোকে কেন সুযোগ দেওয়া হয়নি— এমন প্রশ্নও করছেন অনেকে। এটি সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যবস্থা নয়; পুরনো ব্যবস্থাকে নতুন কাঠামোয় উপস্থাপনের কৌশল মাত্র।

গত ২১ আগস্ট মালয়েশিয়ার অনলাইন নিয়োগব্যবস্থা ফরেন ওয়ার্কার সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমে (এফডব্লিউসিএমএস) বাংলাদেশের ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম প্রকাশ করেছে। কিন্তু এসব এজেন্সির নাম প্রকাশের পর জনশক্তি রফতানি সংশ্লিষ্ট এজেন্সিগুলোর মধ্যে দেখা দিয়েছে তীব্র প্রতিক্রিয়া। পাশাপাশি এটিকে ‘সিন্ডিকেট’ উল্লেখ করে প্রতিক্রিয়া দিয়েছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।

 

 

আলোচনা-সমালোচনার পর গতকাল শুক্রবার এক বিজ্ঞপ্তিতে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, দেশের আরও ৩১২টি রিক্রুটিং এজেন্সিকে অ্যাসোসিয়েট রিক্রুটমেন্ট এজেন্সি হিসেবে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দিচ্ছে মালয়েশিয়া। এর পাশাপাশি বোয়েসেলও পাচ্ছে এই প্রক্রিয়ায় কাজ করার সুযোগ। প্রথম ধাপে বিনা খরচে মালয়েশিয়া যাবেন ১০ হাজার কর্মী।

তবে এটিকে ‘আইওয়াশ’ বলছে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্টারন্যাশনাল রিক্রুটিং এজেন্সিসের (বায়রা) একাংশ। তারা বলছে, সব প্রশ্নের পরিষ্কার উত্তর না করে শুধু ৩১২টি নাম প্রকাশ করে বাজার সিন্ডিকেটমুক্ত হয়েছে বলার সুযোগ নেই । বরং ২৫টি এজেন্সিই মূল নিয়ন্ত্রণে থাকবে, বাকিরা তাদের অধীনস্থ হয়ে সাব-এজেন্ট হিসেবে কাজ করবে।

বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘সরকারি বিবৃতি অনুযায়ী, এজেন্সি যাচাই-বাছাইয়ের কাজটি সম্পন্ন করেছে মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বয়ে গঠিত উচ্চপর্যায়ের যৌথ কমিটি। এতগুলো মন্ত্রণালয় কখন কীভাবে এই ২৫টি এজেন্সিকে তালিকাভুক্ত করল, সেটি খুব অবাক হওয়ার বিষয়। যেখানে এমন এজেন্সিও রয়েছে, যারা একজন কর্মীও পাঠায়নি।

আলোচনায় যেসব এজেন্সি: সংক্ষুব্ধ এজেন্সিগুলোর প্রতিনিধিদের অভিযোগ, এই ২৫ এজেন্সির সিন্ডিকেটের নেপথ্যে আগের মতোই সক্রিয় রয়েছে একটি প্রভাবশালী চক্র। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর অনলাইন পদ্ধতি এফডব্লিউসিএমএসকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন বাংলাদেশি ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম বিন আবদুল নূর এবং বাংলাদেশে তার সহযোগী রুহুল আমিন স্বপন।

 

 

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকায় আছে ম্যানগ্রুপ কেয়ার লিংক। এটির ম্যানেজিং পার্টনার যুবদলের সহসভাপতি আতিকুর রহমান বিশ্বাসের স্ত্রী সাবিহা সুলতানা। এআই সুপ্ত ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী হজ এজেন্সিজ অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (হাব) মহাসচিব ফরিদ আহমেদ মজুমদার।
এ বিষয়ে কথা বলতে সাবিহা সুলতানাকে ফোন করলে তিনি প্রতিবেদকের পরিচয় জানার পর সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন। ফরিদ আহমেদের দুটি মোবাইল ফোন নম্বরে কল দিলে বন্ধ পাওয়া গেছে।

শ্রম অভিবাসনের সঙ্গে যুক্ত সূত্রগুলো বলছে, আগের সিন্ডিকেটে ছিলেন গ্রিনল্যান্ড ওভারসিজের স্বত্বাধিকারী আবদুল হাই। তবে এবার তার স্ত্রীর নামে ‘ইউনাইটেড গালফ’ এজেন্সি তালিকাভুক্ত। এ রকম আরও অন্তত ১১টি রিক্রুটিং এজেন্সির নাম পাওয়া গেছে, সেগুলো আগের সিন্ডিকেটে অন্য নামে ছিল।

কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির মালিক অভিযোগ করেছেন, ছোট ও নামসর্বস্ব কিছু ‘ডামি’ এজেন্সি রাখা হয়েছে, যেগুলো প্রভাবশালী ব্যক্তিরা নিয়ন্ত্রণ করছেন।

সরকারের বক্তব্য কী

প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়া সরকারের মন্ত্রিসভা কর্তৃক গৃহীত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কর্মী সরবরাহকারী প্রধান পাঁচটি দেশের মধ্যে নেপাল ও বাংলাদেশের জন্য ২৫টি করে এবং ভারত, পাকিস্তান ও মিয়ানমারের জন্য ১০টি করে রিক্রুটিং এজেন্সির অনুমোদন দেওয়া হয়, যা মালয়েশিয়া সরকারের সিদ্ধান্ত। বাংলাদেশের জন্য অনুমোদিত ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার অন্তর্ভুক্ত।

এ পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক দৃঢ়ভাবে অনুরোধ জানানো হয়, যেন বিগত অন্তর্বর্তী সরকার প্রণীত ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির মধ্যে যারা ফ্যাসিবাদী সরকারের সময় বিভিন্নভাবে সুবিধাভোগী এবং সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত ছিল, তাদের বাদ দিয়ে অবশিষ্টদের মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক আগামীর সময়কে বললেন, ‘বিগত সরকারের করা দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মেয়াদ এই বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকায় এবং চুক্তির শর্ত অনুযায়ী মালয়েশিয়া কর্তৃপক্ষেরই লাইসেন্স নির্বাচনের একচেটিয়া ক্ষমতা থাকায় বাংলাদেশের সরাসরি হস্তক্ষেপের সুযোগ সীমিত। তবে সরকার যাতে সিন্ডিকেটের কাছে মাথা নত না করে এবং কম খরচে কর্মী পাঠানো নিশ্চিত করতে পারে, সে লক্ষ্যে মালয়েশিয়া সরকারের সঙ্গে এরই মধ্যে তিনবার যৌথ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।’

তবে অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ও নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক সেলিম রেজা এটিকে ‘মাফিয়া গ্রুপ’ তৈরির প্রক্রিয়া হিসেবে দেখছেন। তার ভাষ্য, ‘কীসের ভিত্তিতে এবং কোন যোগ্যতায় এই ২৫টি এজেন্সিকে বেছে নেওয়া হলো, তা জনসমক্ষে খোলাসা করা হয়নি।’

পুরো প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে একটি অনলাইন ট্র্যাকিং সিস্টেম চালু করার জোর সুপারিশ করেন এই অভিবাসন বিশেষজ্ঞ। আর বায়রার নেতাদের দাবি, প্রয়োজনে সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলের মাধ্যমে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু করে সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিকে সমান সুযোগ দেওয়া হোক। যাতে কোনো একক গোষ্ঠী বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।