Image description

অর্থনীতি পুনরুদ্ধার অগ্রাধিকার দিয়ে বেসরকারি খাতকে ঘুরে দাঁড় করাতে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘোষণা করেছে ৬০ হাজার কোটি টাকার ‘বিশেষ পুনরুদ্ধার প্যাকেজ’। এ ছাড়া নতুন সরকার বন্ধ ও সংকটাপন্ন শিল্পকারখানা চালু, উৎপাদন বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে নিয়েছে নানা উদ্যোগ। তবে এসব পদক্ষেপের পরও বেসরকারি খাতে কাক্সিক্ষত গতি ফেরেনি। বরং ঋণপ্রবাহের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বলছে, সংকট এখনো গভীর।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জুনে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে, যা ১৯৯৩ সালের পর সর্বনিম্ন। মে মাসে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে ঋণপ্রবৃদ্ধি আবারও কমেছে। এর আগে ২০২৫ সালের নভেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। ডিসেম্বরে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ, জানুয়ারিতে ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ এবং ফেব্রুয়ারিতেও ৬ দশমিক ০৩ শতাংশ ছিল। মার্চে তা নেমে আসে ৪ দশমিক ৭২ শতাংশে। এপ্রিলে সামান্য বেড়ে ৪ দশমিক ৭৫ এবং মেতে ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ হয়। কিন্তু জুনে আবারও বড় পতন হয়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ পরিস্থিতি শুধু ব্যাংক ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার চিত্র নয়; এটি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও আস্থার সংকটের প্রতিফলন। উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, খেলাপি ঋণের চাপ, ব্যাংক খাতের দুর্বলতা এবং ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তায় নতুন বিনিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছেন না অনেক উদ্যোক্তা।

বেসরকারি ঋণের পাশাপাশি বিনিয়োগের চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। সরকারের সংশোধিত হিসাবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বেসরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ২১ দশমিক ২২ শতাংশে সীমাবদ্ধ থাকার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে। নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এ হার মাত্র ২১ দশমিক ৩৩ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ এক বছরে বেসরকারি বিনিয়োগে বড় ধরনের উল্লম্ফনের প্রত্যাশা করছে না সরকার।

অন্যদিকে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ১০ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ১৩ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীতের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, সরকারি বিনিয়োগ বাড়িয়ে সাময়িকভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বাড়ানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও উৎপাদন বাড়াতে বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই।

এদিকে বেসরকারি খাতে ঋণের খরচ কমাতে বাংলাদেশ ব্যাংক গত জুলাইয়ে নীতি সুদহার ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯ দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। প্রায় দুই বছর পর নীতি সুদহারে এই প্রথম বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। তবে এর সুফল এখনো ঋণবাজারে পুরোপুরি প্রতিফলিত হয়নি। এছাড়া বেসরকারি খাতের সংকট কাটাতে গত ২৩ মে বাংলাদেশ ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ পুনরুদ্ধার প্যাকেজ ঘোষণা করে। এর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকা ব্যাংকগুলোর অতিরিক্ত তারল্য থেকে পুনঃঅর্থায়ন তহবিল এবং ১৯ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজস্ব অর্থ ও সরকারি গ্যারান্টির আওতায় দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এই প্যাকেজের আওতায় বন্ধ ও সংকটাপন্ন শিল্পকারখানা পুনরায় চালু, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে অর্থায়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। পুরো কর্মসূচির মাধ্যমে বিপুলসংখ্যক নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা দেখছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, পুনরুদ্ধার প্যাকেজের ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। তবে সেটার জন্য যথেষ্ট সময় দিতে হবে। এ ছাড়া বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবৃদ্ধি বাড়াতে হলে মূল্যস্ফীতি কমে এলে নীতি সুদহার আরও কিছুটা নমনীয় করা লাগবে। একই সঙ্গে বিনিয়োগ বৃদ্ধির জন্য ব্যবসায়ীদের মাঝে আস্থার সংকট কাটাতে হবে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘সামষ্টিক অর্থনীতি ও শিল্প খাতের পুনরুদ্ধারে অন্তত দুই বছর সময়ের প্রয়োজন। আমরা যেসব উদ্যোগ নিয়েছি সেগুলো বাস্তবায়নেও তো সময় দিতে হবে।’