ধানমন্ডি, ক্রিসেন্ট, গুলশান ও বনানী লেককে ঢাকার ফুসফুস বলা হয়। রাজধানীবাসীর বিনোদনের অনেকটা প্রাণকেন্দ্র এসব লেক। কিন্তু মাত্রাতিরিক্ত দূষণে এ চার লেকের পানি কুচকুচে কালো রং ধারণ করেছে। লেকের সঙ্গে স্যুয়ারেজের অপরিশোধিত বর্জ্যরে সরাসরি সংযোগ থাকায় পানি হয়ে উঠেছে তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত ও বিষাক্ত।
এসব লেকের পানির সংস্পর্শে এসে পরিচ্ছন্নতা কর্মী ও ব্যবহারকারীরা মারাত্মক চর্মরোগে ভুগছেন। ধানমন্ডি লেকের বিষাক্ত পানিতে মাছ মরে ভেসে উঠছে। জিয়া উদ্যানসংলগ্ন ক্রিসেন্ট লেকে জমছে প্রতিদিন প্রায় ৫০ কেজি ময়লা। বনানী লেকের স্যুয়ারেজের মানববর্জ্যে এর আশপাশে শ্বাস নিতেও কষ্ট হয়। আর গুলশান লেকের তলদেশে জমে থাকা মানুষের বিষ্ঠা রোদ উঠলেই ভাসতে থাকে। শুধু গুলশান-বনানী লেকেই দিনে জমে প্রায় ১৫ টনের মতো ময়লা-আবর্জনা ও মানববর্জ্য। লেকগুলো শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে একসময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও দূষণ এবং অব্যবস্থাপনায় এখন ভারী বৃষ্টি হলে উল্টো তা উপচে আশপাশের সড়ক ও এলাকা ডুবে যাচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দূষিত হলে প্রথমেই লেকের জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হয়। ফলে লেকের মাছ মরে যায়। আবার লেকে যারা ঘুরতে আসেন এবং আশপাশে বসবাস করেন, দূষণের কারণে তারা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন। ঢাকার বায়ুদূষণ কমাতে এ জলাধারগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারার কথা। অথচ এগুলো নিজেই দূষণের উৎস হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি আশপাশের গাছপালা, প্রাণিকুলও সরাসরি দূষণের শিকার হচ্ছে। পানিদূষণে মশার বিস্তারও বাড়ছে।
এ ব্যাপারে নগর পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সভাপতি ড. আদিল মুহাম্মদ খান বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘দূষিত এ চার লেক ঢাকার কেন্দ্রে এবং আবাসিক এলাকায় অবস্থিত। এগুলো আবাসিক এলাকার বাসিন্দাদের বিনোদন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার কথা। মূলত আবাসিকের বর্জ্য এবং সলিড ওয়েস্টের কারণে এসব লেক দূষিত হচ্ছে।’ তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশন ও রাজউকের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, কেউ যেন সরাসরি স্যুয়ারেজের ময়লা লেকে না ফেলে। বিশেষ করে গুলশান-বনানীর বাসিন্দারা এর তোয়াক্কা করছেন না। আবার কোথাও কোথাও কারখানার ময়লা-আবর্জনা লেকে ফেলা হচ্ছে। কারখানা মালিকদের ইটিপি স্থাপনের ব্যাপারে সতর্ক করতে হবে। কারখানা সরিয়ে নিতে বলতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘যারা ময়লা ফেলবেন তাদের জরিমানাসহ সচেতনতামূলক প্রচার চালাতে হবে। প্রয়োজনে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার মতো লেকের দূষণকারীদের শনাক্তের জন্য এআই প্রযুক্তি ও সিসি ক্যামেরা ব্যবহার করতে হবে।’
ক্রিসেন্ট লেকে জমে প্রতিদিন ৫০ কেজি আবর্জনা : ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্ট জাতীয় সংসদ ভবনের ঠিক পেছনে এবং শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মাজারের সামনে জিয়া উদ্যানের ক্রিসেন্ট লেকটি শহরের দৃষ্টিনন্দন লেকগুলোর একটি। অথচ দিনে-রাতে এ লেকে জমা পড়ে ৫০ কেজির মতো আবর্জনা। ক্রিসেন্ট লেকের পানিতে জমা ময়লা-আবর্জনা দিনে-রাতে দুই শিফটে পরিষ্কার করা হয়। এ লেকের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, রাতের শিফটে যে পরিচ্ছন্নতা কর্মী কাজ করেন তিনি পরদিন সকালে ময়লা তোলেন। এ ক্ষেত্রে রাতের দিকে গড়ে ৩০ কেজি ময়লা তোলেন। আর দুপুরের দিকে যে পরিচ্ছন্নতা কর্মী কাজ করেন তিনি গড়ে দৈনিক ২০ কেজি ময়লা তোলেন।
সরেজমিন ক্রিসেন্ট লেক ঘুরে দেখা যায়, বিজয় সরণি হয়ে জুলাই গণ অভ্যুত্থান জাদুঘরে যাওয়ার পথে লেকের শুরুতেই পানিতে শ্যাওলা, ময়লা-আবর্জনা, চিপস, অন্য খাবারের প্লাস্টিকের প্যাকেট ও বোতল ভাসছে। কিছুদূর এগিয়ে দেখা যায়, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার মাজারে যাওয়ার পথে যে সংযোগসেতু তার দুই পাশে লেক কর্তৃপক্ষ বড় সাইনবোর্ডে ‘লেকের পানিতে গোসল করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ’ নির্দেশনা টাঙিয়ে রেখেছে। কিন্তু আশপাশের শিশু-কিশোর ও নিম্ন আয়ের মানুষ নিয়মিত লেকে গোসল এবং সাবান দিয়ে কাপড় পরিষ্কার করে। লেকের দুই পাশে বসা মানুষ বিভিন্ন খাবারের প্যাকেট, টিস্যু, পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, ওয়ানটাইম চায়ের কাপ, কর্কশিট ইত্যাদি আবর্জনা পাশে রাখা ডাস্টবিনে না ফেলে সরাসরি পানিতে ফেলছে। আবার ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকানদাররাও প্রায়ই লেকের পানিতে সরাসরি ময়লা ফেলছেন। ১৮ আগস্ট সাদ্দাম নামে ক্রিসেন্ট লেকের এক পরিচ্ছন্নতা কর্মী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘মানুষ ডাস্টবিনে ময়লা না ফেলে লেকের পানিতে ফেলে। লেকে গোসল করতে নিষেধ করা হলেও মানুষ শুনছে না।’
ধানমন্ডি লেকের বিষে ভাসছে মরা মাছ : রাজধানীর একসময়ের জনপ্রিয় ও দৃষ্টিদন্দন লেক ছিল ধানমন্ডি লেক। এ লেকে বেড়াতে আসা মানুষের জন্য পারে বসার সুন্দর ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণের অভাবে ধানমন্ডি লেকের পানিতে এখন ময়লা-আবর্জনা, গাছের মৃত শাখাপ্রশাখা ভেসে বেড়াচ্ছে। লেকের চারপাশে গড়ে ওঠা বিভিন্ন খাবারের দোকানের ময়লা এবং আশপাশের বাসাবাড়ির ফেলা আবর্জনায় ধানমন্ডি ৩২ থেকে শুরু করে ২৭ নম্বর, রবীন্দ্রসরোবর ও সাতমসজিদ রোডের লেক এখন দূষণে ভুগছে। ধানমন্ডি আবাসিকের স্যুয়ারেজ লাইনগুলো সরাসরি লেকের পানিতে গিয়ে মিশেছে। এতে বেশির ভাগ সময়ই পানি থাকে কুচকুচে কালো, বিষাক্ত ও তীব্র দুর্গন্ধযুক্ত।
সরেজমিন এ লেকের রবীন্দ্রসরোবর এলাকায় দেখা যায়, পানির তীব্র দুর্গন্ধে সেখানে বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। অতিরিক্ত দূষণের কারণে মরা মাছ ভেসে আছে। কিছুদূর এগিয়ে সাতমসজিদ এলাকার লেকসংলগ্ন পানিতে শ্যাওলা, প্লাস্টিক ও কর্কশিটের ময়লা-আবর্জনা ভেসে থাকতে দেখা যায়। সেখানে আশপাশের বাসাবাড়ি থেকে সরাসরি স্যুয়ারেজের লাইনের মাধ্যমে ময়লা লেকের পানিতে যাওয়ায় তীব্র দুর্গন্ধ অনুভূত হয়। ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সড়কের সেতুর নিচে লেক দূষণের চিত্র সবচেয়ে ভয়াবহ। আশপাশের বাড়ির স্যুয়ারেজ লাইন থেকে আসা মলমূত্র, প্লাস্টিকের বোতল, কর্কশিট, পলিথিন, খাবার প্যাকেট ইত্যাদি সেতুর নিচে জমে থাকায় লেকের স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেখানে প্রচুর মশার প্রজননস্থলের প্রমাণও পাওয়া যায়।
বনানী লেকের বিষে শ্বাস নেওয়া দায় : ঢাকার বনানী লেক যেমন উচ্চবিত্তদের এলাকার মধ্যে পড়েছে, আবার একটি অংশ নিম্ন আয়ের মানুষের এলাকায় আছে। বনানী লেকের কড়াইল বস্তির পাশে এরশাদ মাঠসংলগ্ন অংশে তীব্র দুর্গন্ধে শ্বাস নিতে কষ্ট হয়। কড়াইল বস্তির প্রতিটি বাড়ির স্যুয়ারেজের লাইন সরাসরি মাটির নিচ দিয়ে লেকের পানিতে গিয়ে মিশেছে। দীর্ঘদিন এ প্রক্রিয়া চলমান থাকায় বর্তমানে বনানী লেকের এ অংশের পানি ব্যবহারের একেবারেই অনুপযোগী ও বিষাক্ত। পানির রং কুচকুচে কালো। বাতাসে ভেসে বেড়ায় বিষাক্ত পানির ঝাঁজালো দুর্গন্ধ।
বস্তির বাসিন্দা মো. সালাহউদ্দিন বলেন, ‘আমি ১৫ বছর ধরে লেকের পারে থাকি। কিন্তু কখনো কাউকে এ লেকের পানি ছুঁয়ে দেখতে দেখি নাই। কারণ যে পানিতে মলমূত্র পড়ে সেই বিষাক্ত পানি কোনোভাবেই ব্যবহারের উপযুক্ত না।’ কড়াইল বস্তি ধরে সামনে এগিয়ে গেলেই বনানী ১১ নম্বর সেতু। এ সেতুর নিচেও ধানমন্ডি ৩২ নম্বর সেতুর মতো পলিথিন, প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ বিভিন্ন ধরনের ময়লা-আবর্জনা দীর্ঘদিন জমে থেকে প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়েছে। বনানী ১১ নম্বর সেতু থেকে নেমে সামনে এগিয়ে গেলেই চোখে পড়ে আশপাশের বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজের লাইনগুলোর ময়লা বড় বড় পাইপের মাধ্যমে সরাসরি লেকে পড়ছে। লেকের এ অংশে উচ্চবিত্তরা বাস করলেও তীব্র উৎকট গন্ধে সেখানে অবস্থান করা বেশ অস্বস্তির।
গুলশান লেকে রোদে ভেসে ওঠে বিষ্ঠা : রাজধানীর উচ্চবিত্ত এলাকায় অবস্থিত গুলশান লেকের অবস্থাও খুব শোচনীয়। গুলশান সোসাইটির পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা বাংলাদেশ প্রতিদিনকে জানান, এ লেকের সবচেয়ে বড় দূষণ হচ্ছে বাসাবাড়ির স্যুয়ারেজের লাইন থেকে সরাসরি লেকে মলমূত্র ফেলা হয়। পাশাপাশি আবাসিকের বাসিন্দারা প্রায়ই লেকে ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করেন। তাঁরা জানান, স্যুয়ারেজের ময়লাগুলো লেকের তলদেশে গিয়ে জমা হয়। যখন রোদ ওঠে তখন মানুষের বিষ্ঠা ভেসে ওঠে। এ ময়লা তখন নেট দিয়ে তুলতে হয়।
গুলশান সোসাইটির পরিচ্ছন্নতা কর্মী মো. মিলন বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের ২৫ জন পরিচ্ছন্নতা কর্মী গুলশান ও বনানী লেকের এক শর মতো পয়েন্টে ময়লা পরিষ্কার করেন।’ তিনি বলেন, ‘এ দুই লেকেই প্রতিদিন ৫ টনের একটি ময়লাবাহী গাড়িতে তিনবার ময়লা সংগ্রহ করা হয়। অর্থাৎ দিনে এ দুই লেক থেকে গড়ে ময়লা ওঠানো হয় ১৫ টনের মতো। সাধারণত লেকের পানিতে আগাছা, ভাসমান প্লাস্টিক আবর্জনা, স্যুয়ারেজের ময়লা থাকে। স্যুয়ারেজের ময়লায় লেকে দুর্গন্ধও বেশি। এ ময়লা তুলতে গিয়ে আমারসহ অন্য সহকর্মীদের প্রায়ই চামড়া জ্বালাপোড়া ও চুলকানির মতো শারীরিক সমস্যা দেখা দেয়।’