Image description

সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর স্বপ্ন ছিল রাজন হোসেনের। সেই স্বপ্ন নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিলেন রাশিয়ায়। যোগ দেবেন নির্মাণশ্রমিকের চাকরিতে। কিন্তু রাশিয়ায় গিয়ে বদলে যায় সবকিছু। চাকরির বদলে তাকে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেওয়া হয়। এরপর বাধ্য হয়ে নামতে হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ময়দানে। ফ্রন্টলাইনে যাওয়ার প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় গুরুতর আহত হন রাজন। কোমরের নিচ থেকে হারান শক্তি। তবু থামেননি। চার দিন বুকের ওপর ভর দিয়ে হামাগুড়ি দিয়ে পাড়ি দেন চার কিলোমিটার পথ। শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন হাসপাতালে। দীর্ঘ চিকিৎসা শেষে গত ২৩ আগস্ট পঙ্গু অবস্থায় দেশে ফিরেছেন রাজন।

রাজনকে বিদেশে পাঠাতে প্রায় ১০ লাখ টাকা খরচ হয় তার পরিবারের। এই টাকা জোগাড়ে কৃষক বাবা আবদুল কাদের জমি বিক্রি করেছেন, ধারদেনা করেছেন, নিয়েছেন এনজিও থেকে ঋণও। ছেলের ভবিষ্যৎ বদলাবে, সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরবে, সেই আশাতেই এত টাকা খরচ করেছিলেন। এখন সেই পরিবারের ঘাড়ে ঋণের বোঝা, এখন সামনে পঙ্গু ছেলের চিকিৎসার অনিশ্চিত খরচ।

রাজনের পরিবার বলছে, মাসে দেড় লাখ টাকা বেতনে নির্মাণশ্রমিকের চাকরির কথা বলে তাকে রাশিয়ায় পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর স্থানীয় দালালদের মাধ্যমে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে তুলে দেয়। রাজনের মতো আরও প্রায় ৩০ বাংলাদেশিকেও একইভাবে রুশ সেনাবাহিনীতে পাঠানো হয়েছিল।

কালীগঞ্জ উপজেলার গয়েশপুর গ্রামের কৃষক আবদুল কাদেরের দুই ছেলে ও এক মেয়ে। সংসারের অভাব কিছুটা ঘোচাতে ছেলে রাজনকে বিদেশে পাঠান তিনি। একতারপুর গ্রামের আবু তাহের লেন্টু ও তার ভাগনে যশোরের রেলগেট এলাকার সোহেলের মাধ্যমে রাশিয়ায় পাঠানো হয় রাজনকে।

 

কাগজে স্বাক্ষরের পরই শুরু বিপদের পালা

রাজন হোসেন জানান, চলতি বছরের ৭ মে বাংলাদেশ থেকে মস্কো বিমানবন্দরে পৌঁছান তিনি। এরপর আরও ৩০ বাংলাদেশির সঙ্গে বাসে করে মস্কো থেকে ওরেনবার্গে নেওয়া হয় তাদের। সেখানে তিন থেকে চার দিন একটি হোটেলে রাখা হয়। ব্যাংক কার্ড ও সিম কার্ড দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন কাগজে তাঁদের স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপরই শুরু হয় বিপদের পালা।

রাজনের ভাষ্য, কাজ দেওয়ার কথা বলে তাদের একটি সেনাক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে একদিন রাখার পর রুশ সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে একটি বাংকারে নেওয়া হয়। তারা যুদ্ধে যেতে অস্বীকৃতি জানিয়ে সেনাবাহিনীর লোকজনের কাছে কান্নাকাটি করেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। একপর্যায়ে তাদের বিভিন্ন দলে ভাগ করে দেওয়া হয়।

‘আমি ছয়জনের একটি গ্রুপে ছিলাম। পরে আমাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর পোশাক, অস্ত্রসহ যুদ্ধের প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম দেওয়া হয়। সেখানে ২১ দিন প্রশিক্ষণ দেওয়ার পর আমাদের ফ্রন্টলাইনে পাঠানো হয়’—বললেন রাজন।

‘ওপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা’

যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রথম দিনই ভয়াবহ ড্রোন হামলার মুখে পড়েন রাজন ও তার সঙ্গে থাকা বাংলাদেশিরা। তার দাবি, সেদিনই ১৭ বাংলাদেশি ড্রোন হামলায় নিহত হন। একই হামলায় একটি ড্রোন তার কোমর বরাবর আঘাত করে। মুহূর্তেই মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। এরপর কোমরের নিচ থেকে আর কোনো শক্তি পাননি। উঠে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেন। তারপর শুরু হয় বাঁচার লড়াই।

রাজন বলেন, ‘চার দিনে বুকের ওপর ভর দিয়ে প্রায় চার কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণাধীন ইউক্রেনের একটি হাসপাতালে আশ্রয় নিই। এর মধ্যে দুই রুশ সেনার কাছে পানি চাইলেও তারা দেয়নি। উল্টো ফিরে আসায় ক্যাম্পের কমান্ডার আমাকে মারধর করেছে। উপরে ড্রোন, নিচে মাইন আর সামনে ইউক্রেনের সেনা। কী যে ভয়াবহ অবস্থা, তা বলে বোঝানো যাবে না।’

তিনি জানান, প্রথম হাসপাতালে চিকিৎসা ব্যবস্থা ভালো ছিল না। পরে তাকে রাশিয়ার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৫ দিন পর একজন চিকিৎসক তাকে বাংলাদেশ দূতাবাসে নিয়ে যান।

রাজনের ভাষ্য, ২১ আগস্ট ট্রাভেল পাস পাওয়ার পর পরিবারের পাঠানো ৬২ হাজার রুবল দিয়ে বিমানের টিকিট কেনেন। পরে ইথিওপিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে দেশে ফেরেন। ২৩ আগস্ট ঝিনাইদহের কালীগঞ্জের নিজ বাড়িতে পৌঁছান তিনি।

পঙ্গু হয়ে দেশে ফিরে মা-বাবার সঙ্গে রাজন।এখন রাজনের সামনে যুদ্ধ নয়, অন্য এক লড়াই। শরীরের নিচের অংশে শক্তি নেই। নিয়মিত চিকিৎসা দরকার। বিদেশে পাঠানোর জন্য নেওয়া ঋণ এখনো শোধ হয়নি। তার ওপর যুক্ত হয়েছে চিকিৎসার খরচ।

রাজনের পরিবারের সদস্যরা জানান, ছেলেকে জীবিত ফিরে পাওয়াই তাদের কাছে সবচেয়ে বড় স্বস্তি। কিন্তু তার ভবিষ্যৎ কী হবে, চিকিৎসার খরচ কীভাবে জোগাড় হবে এবং ঋণের টাকা কীভাবে পরিশোধ করবেন, তা নিয়ে তারা দিশেহারা।

রাজনের অভিযোগ, বাংলাদেশি জাবাল-ই-নূর রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে তাদের রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছিল। তিনি সংশ্লিষ্ট এজেন্সি ও স্থানীয় দালালদের আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজের চিকিৎসা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থার জন্য সহযোগিতাও চাইলেন সরকারের।

রাজনের স্বজন ও এলাকাবাসীর অভিযোগ, চাকরির মিথ্যা প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় লেন্টু ও তার ভাগনে সোহেল তাকে টাকার বিনিময়ে রুশ সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত করে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আর কোনো তরুণ যেন এভাবে প্রতারণার শিকার না হন, সে বিষয়ে সরকারের কঠোর পদক্ষেপ চান এলাকাবাসী।

অভিযুক্ত আবু তাহের লেন্টুর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার স্ত্রী দাবি করেছেন, তার স্বামী ব্যবসা ও কৃষিকাজ করেন। তার ভাগনে সোহেল বিদেশে লোক পাঠানোর কাজের সঙ্গে জড়িত এবং এ কাজে সহযোগিতা করেন।

রাজনের মর্মান্তিক ঘটনাটি বিভিন্ন মাধ্যমে শুনেছেন বলে জানালেন কালীগঞ্জ থানার ওসি মো. কবির হোসেন। তার মতে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার অভিযোগ দিলে বিষয়টি তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

‘যারা দালাল বা মানব পাচারের সঙ্গে জড়িত, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না’— যোগ করেন ওসি।