এক রুদ্ধদ্বার অভিযান শেষে আটক করা হয়েছে চট্টগ্রামের সন্ত্রাসী ‘গলাকাটা মোবারককে’। পুলিশের দাবি, চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত একাধিক হত্যাকাণ্ডে কিলিং স্কোয়াডের শুটার হিসেবে ব্যবহার হয়েছেন তিনি। নামে ‘গলাকাটা মোবারক’ হিসেবে পরিচিত হলেও তার আসল নাম মোবারক হোসেন। ফটিকছড়ির আজম খান বাবু হত্যাকাণ্ডের পরই এই নামে পরিচিত পান এ শীর্ষ সন্ত্রাসী।
পুলিশ জানিয়েছে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির বাসিন্দা আজম খান বাবু (৩৫) ২০১৫ সালের ২ জুলাই রাতে নিখোঁজ হন। পরদিন ৩ জুলাই সকালে নাজিরহাট নতুন ব্রিজের পাশে হালদা নদীর পাড় থেকে তার ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার করা হয়।
সেসময় নিহত বাবুর গলায় ধারালো অস্ত্রের আঘাতের চিহ্নসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে জখম ছিল। ওই ঘটনায় সন্দেহভাজন হিসেবে চট্টগ্রাম নগরীর অক্সিজেন এলাকা থেকে মোবারক, হাসান ও সন্তোষ কুমারসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল।
চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলমের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আজম খান বাবুর সেই হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই মোবারকের সঙ্গে ‘গলাকাটা’ নামটি যুক্ত হয়। সময়ের সঙ্গে ফটিকছড়ির অপরাধজগতে ‘গলাকাটা মোবারক’ নামেই পরিচিত হয়ে ওঠেন তিনি। পরে একাধিক হত্যা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের ঘটনায় তার নাম সামনে আসে।
জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বড় সাজ্জাদের নির্দেশনায় পরিচালিত কথিত অপরাধচক্রের ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোবারক। ডেভিড ইমন ও রায়হানের সঙ্গেও তার যোগাযোগ ছিল বলে জানিয়েছে পুলিশ। ওই চক্রের কথিত কিলিং স্কোয়াডের অন্যতম শুটার হিসেবে তাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
গত ২৬ আগস্ট ফটিকছড়ির লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর কল্যাণপাড়া এলাকায় এক সহযোগীর বাড়িতে অবস্থান করছিলেন মোবারক। তার অবস্থানের খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালায় জেলা পুলিশ। পুলিশের উপস্থিতি টের পেয়ে ঘরের ভেতর থেকে গুলি ছোড়া হয় বলে পুলিশ জানায়। পরে বাড়িটি ঘিরে ফেললে পালানোর সুযোগ নেই বুঝতে পেরে মোবারক আত্মসমর্পণ করেন। এরপর তাকে সহযোগীসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তারের সময় চারজনের কাছ থেকে চারটি আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এর মধ্যে একটি ৯ এমএম বিদেশি পিস্তল, একটি ৭ দশমিক ৬৫ এমএম বিদেশি পিস্তল, একটি বিদেশি রিভলবার ও একটি দেশীয় তৈরি পিস্তল রয়েছে। এ ছাড়া ৯ এমএম পিস্তলের ১৮ রাউন্ড এবং ৭ দশমিক ৬৫ এমএম পিস্তলের পাঁচ রাউন্ড গুলি, তিনটি ম্যাগাজিন ও বিভিন্ন ধরনের গুলির খোসা উদ্ধার করা হয় বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশ।
উদ্ধার হওয়া ৯ এমএম পিস্তলটি ব্রাজিলের তৈরি বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর চট্টগ্রাম নগরের কোতোয়ালি থানা থেকে লুট হওয়া সরকারি অস্ত্রগুলোর একটি এটি।
সাম্প্রতিক সময়ে মোবারকের নাম বিশেষভাবে সামনে আসে রাউজানের যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরী হত্যা মামলার তদন্তে। প্রকাশ্য ওই হত্যাকাণ্ডের সময় সিসিটিভি ফুটেজে পাঁচ অস্ত্রধারীকে দেখা যায়। তাদের মধ্যে মোবারকও ছিলেন বলে পুলিশের দাবি। ফুটেজে তার দুই হাতে দুটি পিস্তল দেখা গেছে বলেও জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের দাবি, মোবারক নিহত মাসুদুল হক চৌধুরীকে আগে থেকে চিনতেন না। হত্যাকাণ্ডের আগে রায়হান মোবাইল ফোনে মাসুদুলের ছবি মোবারকের কাছে পাঠিয়ে তাকে ‘টার্গেট’ হিসেবে শনাক্ত করে দেন। এরপর প্রথম গুলি এবং পরে মাথায় গুলি করার ঘটনায় মোবারকের সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়েছে।
এ ছাড়া ফটিকছড়ির জামাল, সাদ্দাম ও বাবু হত্যা এবং নগরের সরোয়ার বাবলা হত্যা মামলাসহ একাধিক গুরুতর মামলায় মোবারকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ রয়েছে। সাবেক সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমানের বাসার সামনে গুলির ঘটনাতেও তার উপস্থিতির কথা জানিয়েছে পুলিশ।
মোবারকের বাড়ি ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর এলাকায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে তিনি পাহাড়ি ও নির্জন এলাকায় অবস্থান করতেন বলে পুলিশের দাবি। লেলাং ইউনিয়নের শাহনগর কল্যাণপাড়ায় এক সহযোগীর বাড়িতে তার অবস্থানের তথ্য পাওয়ার পর সেখানেই অভিযান চালিয়ে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তারের পর ২৭ আগস্ট অস্ত্র ও পুলিশের ওপর হামলার পৃথক দুই মামলায় মোবারকসহ চারজনের আট দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত।