মেঘনার ওপর সেতু হবে, বদলে যাবে হাওরবাসীর জীবন। এই স্বপ্নে বুক বেঁধেছিলেন কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের মানুষ। ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে শুরু হয় বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতুর নির্মাণকাজ। একের পর এক পিলারও উঠতে থাকে নদীর বুকে।
কিন্তু প্রায় ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হতেই থেমে গেছে নির্মাণকাজ। এখন মেঘনার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্পূর্ণ পিলারগুলোই যেন হাওরবাসীর থমকে যাওয়া স্বপ্নের সাক্ষী।
প্রায় পাঁচ মাস ধরে বন্ধ রয়েছে কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রাম ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরের মধ্যে নির্মাণাধীন বাঙালপাড়া-চাতলপাড় সেতুর কাজ। নির্মাণস্থলে নেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন। পড়ে আছে কোটি কোটি টাকার নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি। দীর্ঘদিন খোলা আকাশের নিচে পড়ে থাকায় এসব সামগ্রী নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, অষ্টগ্রাম উপজেলার বাঙালপাড়া ইউনিয়নের নোয়াগাঁও থেকে নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের দুর্গাপুর পর্যন্ত মেঘনা নদীর ওপর এক হাজার মিটার দীর্ঘ সেতুটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। ২০২৩ সালে ১৭৭ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটির কাজ পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান তমা কনস্ট্রাকশন।
কাজ শুরুর পর সেতুটির নির্মাণকাজ দ্রুত এগোতে থাকে। মেঘনার বুকে একের পর এক পিলার দৃশ্যমান হয়। এতে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়। দীর্ঘদিনের নৌ-নির্ভর যোগাযোগ ব্যবস্থা বদলে সড়কপথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন তারা।
তবে দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর প্রকল্পের পরিস্থিতি বদলে যায়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আত্মগোপনে চলে যাওয়ার পর নির্মাণকাজে ধীরগতি দেখা দেয়। একপর্যায়ে পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় কাজ।
স্থানীয়দের দাবি, গত পাঁচ মাস ধরে নির্মাণস্থলে কোনো কাজ হচ্ছে না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজনও নির্মাণস্থল ছেড়ে চলে গেছেন।
সেতুটি নির্মিত হলে অষ্টগ্রাম, ইটনা ও মিঠামইনের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর হয়ে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ সহজ হবে বলে আশা স্থানীয়দের। এতে যাতায়াতের সময় ও দুর্ভোগ কমার পাশাপাশি কৃষি, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
হাওরের কৃষকরা ধানসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য সহজে বড় বাজারে নিতে পারবেন। জরুরি রোগীদের দ্রুত উন্নত চিকিৎসার জন্য শহরে নেওয়া সম্ভব হবে। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতও সহজ হবে। একই সঙ্গে হাওরাঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিধি বাড়ার সুযোগ তৈরি হবে।
স্থানীয় বাসিন্দা আনিসুর রহমান জানিয়েছেন, সেতুটিকে ঘিরে হাওরের মানুষের অনেক স্বপ্ন রয়েছে। সেতুটি হলে সারা বছর সড়কপথে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করা যাবে। কৃষিপণ্য সহজে বাজারজাত করা সম্ভব হবে। মুমূর্ষু রোগীদের দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যাবে এবং শিক্ষার সুযোগও বাড়বে। কিন্তু পাঁচ মাস ধরে কাজ বন্ধ থাকায় সেই স্বপ্নও স্থবির হয়ে আছে।
আরেক বাসিন্দা উসমান মিয়া জানান, সেতুটি হাওরের মানুষের বহুদিনের স্বপ্ন। সেতু নির্মাণের জন্য তার অনেক জমি গেছে। বয়স হয়ে যাওয়ায় সেতুটি চালু দেখে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েও তার সংশয় রয়েছে। তবে পরবর্তী প্রজন্ম যেন সারা বছর সড়কপথে শহরের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে, সেই প্রত্যাশা তার।
নির্মাণকাজের দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বুলবুল জানিয়েছেন, তিনি প্রায় দেড় মাস আগে চাকরি ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছেন। বর্তমানে প্রকল্পের কাজ কেন বন্ধ রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও তার এখন কোনো যোগাযোগ নেই।
এলজিইডির অষ্টগ্রাম উপজেলা প্রকৌশলী মো. মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, ১৭৭ কোটি টাকার প্রকল্পের মধ্যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত ৩৫ কোটি টাকা বিল উত্তোলন করেছে। তমা কনস্ট্রাকশন চুক্তিভঙ্গ করে কাজ অসম্পূর্ণ রেখেই চলে গেছে।
তিনি আরও জানান, সরকারের পতনের পর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক আত্মগোপনে থাকায় কাজ ধীরগতিতে চলছিল। গত পাঁচ মাস ধরে কাজ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লোকজন নির্মাণসামগ্রী ও যন্ত্রপাতি রেখেই চলে গেছেন।