বর্ষাকালে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে শুরু করে। বেশির ভাগ মানুষ ডেঙ্গু থেকে কয়েক দিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে ওঠেন। তবে যাদের আগে থেকেই ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা অন্য কোনো দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ডেঙ্গু অনেক বেশি জটিল আকার ধারণ করতে পারে। তাই এই রোগীদের শুরু থেকেই বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।
ডেঙ্গু ভাইরাস শুধু জ্বরই সৃষ্টি করে না, এটি শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা, রক্তনালি এবং বিভিন্ন অঙ্গের ওপরও প্রভাব ফেলে। ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ থাকলে শরীরের এই চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি বেড়ে যায়।
ডায়াবেটিস থাকলে ঝুঁকি কেন বাড়ে?
ডেঙ্গু হলে শরীরে প্রদাহ বাড়ে এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা করতে পারে। এতে ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে যায়।
উচ্চ রক্তে শর্করা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে। পাশাপাশি এটি রক্তনালির ক্ষতি করে, ফলে গুরুতর ডেঙ্গু, রক্তক্ষরণ বা ডেঙ্গু শক সিনড্রোমের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
হৃদ্রোগীদের জন্য কেন বেশি সতর্কতা প্রয়োজন?
ডেঙ্গুর কারণে শরীরে পানিশূন্যতা, রক্তচাপ কমে যাওয়া এবং রক্তনালি থেকে প্লাজমা বেরিয়ে যাওয়ার মতো সমস্যা হতে পারে। এসব পরিবর্তন হৃদ্যন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
যাদের আগে থেকেই হৃদ্যন্ত্রের সমস্যা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে এই অতিরিক্ত চাপ হৃদ্যন্ত্রের কার্যক্ষমতা আরও খারাপ করতে পারে। কিছু রোগীর ক্ষেত্রে হৃদ্পেশিতে প্রদাহ বা হৃদ্স্পন্দনের অনিয়মও দেখা দিতে পারে।
প্লাজমা লিকেজ কী?
ডেঙ্গুর গুরুতর জটিলতার মধ্যে অন্যতম হলো প্লাজমা লিকেজ। এ সময় রক্তনালির ভেতরের তরল অংশ বাইরে বেরিয়ে যেতে শুরু করে।
এর ফলে রক্তচাপ হঠাৎ কমে যেতে পারে, শরীরে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে, ডেঙ্গু শক সিনড্রোম হতে পারে এবং কিডনি ও অন্যান্য অঙ্গে রক্ত সরবরাহ কমে যেতে পারে।
ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগীদের ক্ষেত্রে এসব জটিলতা আরও দ্রুত দেখা দিতে পারে।
যেসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে যাবেন
ডেঙ্গু হলে তীব্র বা ক্রমাগত পেটব্যথা, বারবার বমি হওয়া, শ্বাসকষ্ট, নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়া, কালো পায়খানা বা রক্তবমি, অতিরিক্ত দুর্বলতা, হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক ঘুম ঘুম ভাব বা বিভ্রান্তির মতো লক্ষণগুলোকে কখনোই অবহেলা করা উচিত নয়।
এসব লক্ষণ গুরুতর ডেঙ্গুর ইঙ্গিত হতে পারে এবং দ্রুত হাসপাতালে চিকিৎসা প্রয়োজন।
ডায়াবেটিস ও হৃদ্রোগীরা কী করবেন?
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী -
- পর্যাপ্ত তরল পান করুন। তবে হৃদ্রোগ বা কিডনির সমস্যা থাকলে কতটা তরল খাবেন, তা চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ঠিক করুন।
- নিয়মিত রক্তে শর্করা পরীক্ষা করুন।
- চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগের ওষুধ বন্ধ করবেন না।
- জ্বর কমানোর জন্য শুধু প্যারাসিটামল ব্যবহার করুন। আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন বা অ্যাসপিরিন জাতীয় ওষুধ এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন।
- শুধু প্লেটলেটের সংখ্যা নয়, শরীরের সতর্কতামূলক লক্ষণগুলোর দিকেও সমান গুরুত্ব দিন।
কীভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করবেন?
ডেঙ্গু প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো এডিস মশার বংশবিস্তার রোধ করা এবং মশার কামড় এড়িয়ে চলা। এর জন্য-
- বাসা ও আশপাশে কোথাও পরিষ্কার পানি জমতে দেবেন না।
- মশারি ব্যবহার করুন।
- ফুলহাতা পোশাক পরুন।
- প্রয়োজন হলে মশা প্রতিরোধক ব্যবহার করুন।
- টব, ড্রাম, বালতি ও পানির পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার করুন।
ডায়াবেটিস বা হৃদ্রোগ থাকলেই যে ডেঙ্গু মারাত্মক হবে, এমন নয়। তবে এসব রোগ থাকলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি থাকে। তাই জ্বর শুরু হওয়ার পর অবহেলা না করে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া, নিয়মিত পর্যবেক্ষণে থাকা এবং সতর্ক সংকেত দেখা দিলে হাসপাতালে যাওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা পেলে গুরুতর জটিলতা ও মৃত্যুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।
সূত্র:টাইমস অব ইন্ডিয়া