রাজধানীর হাইকোর্ট মোড় থেকে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পর্যন্ত ২২টি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে আধুনিক ট্রাফিক সিগন্যাল বাতি বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এর ৯টির কাজ আটকে আছে ঠিকাদারের জটিলতায়। সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিআর) অনুযায়ী চাওয়া অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে না পারায় তিন দফা দরপত্র আহ্বান করেও ঠিকাদার চূড়ান্ত করা যায়নি। এ কারণে নিয়মতান্ত্রিকভাবে যানবাহন চলাচলে সব মোড়ে সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। কাজ না হওয়া সব কটি মোড়ই ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মধ্যে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই রাজধানীর আরও ৫০টি মোড়ে নতুন প্রজন্মের আইটিএসভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
কাজ না হওয়ার বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাকি থাকা ৯টি মোড়ে ঠিকাদার নিয়োগের জন্য তিন দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। প্রথম দফায় গত ডিসেম্বরে, দ্বিতীয় দফায় এপ্রিলে এবং সর্বশেষ জুনে দরপত্র আহ্বান করা হয়। কিন্তু দরপত্রে অংশ নেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো পিপিআর অনুযায়ী চাওয়া অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণ করতে পারেনি। সে কারণে কিছু শর্ত শিথিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। অর্থসংকটও কাজ দেরি হওয়ার একটি কারণ ছিল।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল) নাঈম রায়হান খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘বাকি নয়টি মোড়ের কাজ বর্তমানে দরপত্রপ্রক্রিয়ায় রয়েছে।’
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রথম ধাপে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আওতায় মোট ২২টি মোড়ে সিগন্যাল বসানোর পরিকল্পনা ছিল। এগুলোর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) আওতায় থাকা আটটি মোড়েই সিগন্যাল স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) আওতায় ১৪টি মোড়ের মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫টিতে সিগন্যাল বসানো হয়েছে। ফলে উত্তর সিটির ৯টি মোড়ে এখনো সিগন্যাল স্থাপন বাকি রয়েছে।
ডিএসসিসির আওতায় বাংলামোটর, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল, মিন্টো রোড, কাকরাইল, মৎস্য ভবন, কদম ফোয়ারা, শিক্ষা ভবন ও শাহবাগ মোড়ে সিগন্যাল চালু রয়েছে।
অন্যদিকে ডিএনসিসির আওতায় সোনারগাঁও ক্রসিং, ফার্মগেট, বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও জাহাঙ্গীর গেট মোড়ে সিগন্যাল চালু হয়েছে। তবে মহাখালী, রেলক্রসিং, আমতলী, ডিওএইচএস, বনানী চেয়ারম্যানবাড়ী, কাকলী, বনানী কবরস্থান, বনানী কাঁচাবাজার ও কমিউনিটি সেন্টার ক্রসিং—এই ৯ মোড়ে এখনো সিগন্যাল বসানো হয়নি।
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল) রাজীব খাদেম বলেন, তাঁদের আওতায় থাকা আটটি মোড়েই সিগন্যাল স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে এবং সিগন্যাল অনুযায়ী যানবাহন চলাচল করছে।
অন্যদিকে অবকাঠামোগত কাজ শেষ হলে একটি মোড়ে কন্ট্রোল বক্স, সিগন্যাল লাইট ও প্রয়োজনীয় সংযোগ স্থাপনে চার-পাঁচ দিন সময় লাগে বলে জানিয়েছেন বুয়েটের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা গেছে, ট্রাফিক সিগন্যাল চালু থাকলেও এখনো ট্রাফিক পুলিশের উপস্থিতিতে তা পরিচালিত হচ্ছে। লাল বাতি জ্বলার পর অধিকাংশ বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেল থেমে যেতে দেখা গেছে। কাউন্টডাউন ডিসপ্লে থাকায় অনেক চালক আগেই গতি কমাচ্ছেন। তবে কিছু রিকশা ও মোটরসাইকেলকে সিগন্যাল অমান্য করে এগিয়ে যেতে দেখা গেছে।
ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা জানান, আগের তুলনায় চালকদের মধ্যে সিগন্যাল মানার প্রবণতা বেড়েছে এবং মোড়গুলোতে যান চলাচলে কিছুটা শৃঙ্খলা এসেছে।
নতুন করে আরও ৫০টি সিগন্যাল
চলমান প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হওয়ার আগেই রাজধানীর আরও ৫০টি মোড়ে ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। এগুলোর মধ্যে ডিএনসিসির আওতায় ২৮টি এবং ডিএসসিসির আওতায় ২২টি মোড়ে সিগন্যাল বসানো হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, উত্তর সিটির মিরপুর রোড, রোকেয়া সরণি এবং গুলশান-২ থেকে মগবাজার করিডরে নতুন সিগন্যাল স্থাপন করা হবে। দক্ষিণ সিটিতে ধানমন্ডি ২৭, সায়েন্স ল্যাব, কলাবাগান, পান্থপথ, আজিমপুর, মগবাজার থেকে ডিএমপি সদর দপ্তর, অফিসার্স ক্লাব, বিজয়নগরসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে নতুন সিগন্যাল বসবে।
দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান ও নতুন প্রকল্পের কাজ মিলিয়ে আগামী চার মাসের মধ্যে অধিকাংশ সিগন্যাল স্থাপনের কাজ শেষ হতে পারে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রথম ধাপের ২২টি সিগন্যালের অর্থায়নের দায়িত্ব ছিল দুই সিটি করপোরেশনের। তবে নতুন ৫০টি সিগন্যাল স্থাপনের জন্য অর্থ বিভাগ থেকে অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে।
ডিএনসিসির নির্বাহী প্রকৌশলী (ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল) নাঈম রায়হান খান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ট্রাফিক সিগন্যাল বসানোর জন্য ৫০ কোটি টাকা গত সপ্তাহে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।’
রক্ষণাবেক্ষণই বড় চ্যালেঞ্জ
ডিএসসিসির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বলেন, চালু হওয়া সিগন্যাল পরিচালনায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ। তিনি বলেন, সিগন্যালগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বল্প ব্যয়ে তৈরি হলেও নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আলাদা বাজেট প্রয়োজন। যানবাহনের চাপ অনুযায়ী সিগন্যালের সময় পরিবর্তন এবং ছোটখাটো যান্ত্রিক ত্রুটি দ্রুত মেরামতও করতে হয়। তবে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো প্রযুক্তিগত সমস্যা দেখা যায়নি।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘দীর্ঘদিনের ম্যানুয়াল ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, চালকদের নিয়ম না মানার প্রবণতা এবং ট্রাফিক সংস্কৃতির সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ডিজিটাল সিগন্যাল ব্যবস্থার বিকল্প নেই। যেসব মোড়ে সিগন্যাল চালু হয়েছে, সেখানে চালকদের সচেতনতা ও সিগন্যাল মানার প্রবণতা বেড়েছে। বিজয় সরণি, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, জাহাঙ্গীর গেট থেকে ফার্মগেট করিডরে যানবাহনের গতি কিছুটা বেড়েছে। তবে রিকশা ও অন্যান্য ধীরগতির যানবাহন বেশি চলাচল করে, এমন মোড়ে এখনো সিগন্যাল পুরোপুরি কার্যকর করা চ্যালেঞ্জ।’