Image description

গত ছয় মাসে ৪৪ জন উদ্ধার, অধিকাংশই কন্যাশিশু; বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিত্যাগকারীদের শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো, সুুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন এবং এইসব শিশুর নিরাপদ ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করা জরুরি

দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাস্তাঘাটে পরিত্যক্ত অবস্থায় নবজাতক উদ্ধারের ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে অব্যাহত রয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কন্যাশিশু, প্রতিবন্ধী শিশু কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত গর্ভধারণের ফলে জন্ম নেওয়া শিশুদের পরিত্যাগ করা হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে জীবিত ও মৃত অবস্থায় ৪৪ নবজাতককে উদ্ধার করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিত্যাগকারীদের শনাক্তে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো, সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়ন এবং এই শিশুদের নিরাপদ ভবিষ্যত্ নিশ্চিত করা জরুরি।

শুধু জুলাই মাসেই আটটি শিশু পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করার তথ্য গণমাধ্যমে প্রকাশ পায়। গত ২৫ জুলাই চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলার শেখেরখীল ইউনিয়নে পলিথিনে মোড়ানো অবস্থায় উদ্ধার করা হয় এক নবজাতক মেয়ে শিশুকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুটপাত থেকে এক নবজাতকের মরদেহ উদ্ধার করা হয় গত ২২ জুলাই। এছাড়া ২৪ জুলাই ঢাকার শ্যামপুর ব্রিজের নিচ থেকে এক ছেলে শিশুকে উদ্ধার করে আজিমপুর ছোটমনি নিবাসে দেয় পুলিশ। নিবাসের উপ-তত্ত্বাবধায়ক তানজিনা জানান, ছেলেটির নাম রেখেছেন আলী। ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত তারা ১৯টি  শিশু পেয়েছেন।

মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, চলতি বছর প্রথম ছয় মাসে ৪৪ নবজাতককে বিভিন্ন স্থান থেকে উদ্ধার করা হয়। এমএসএফের তথ্য কর্মকর্তা মালিহা হেলাল তীরা জানান, শহর-গ্রামে সর্বত্রই জীবিত ও মৃত অবস্থায় নবজাতক উদ্ধার করা হয়। তবে তুলনামূলকভাবে শহরে এই ঘটনা বেশি ঘটে। তীরার মতে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা—এই তিন জেলায় নবজাতক ফেলে দেওয়ার ঘটনা সবচেয়ে বেশি পান তারা।

কিছু পরিসংখ্যান : ২০২১ সালে জুন মাস পর্যন্ত এই বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরাম। ফোরামের তথ্যমতে, ঐ ছয় মাসে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে ২১০ জন নবজাতককে পরিত্যক্ত ও মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের ভিত্তিতে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) তথ্যমতে, ২০২৫ সালে ৮৬ জন এবং ২০২৪ সালে ৯৬ শিশু বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। চাইল্ড হেল্পলাইন ১০৯৮-এর মাধ্যমে ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৩২২টি পরিত্যক্ত শিশুকে সুরক্ষা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের মধ্য জুলাই পর্যন্ত এ সংখ্যা ৫৬টি। অন্যদিকে সমাজসেবা অধিদপ্তরের তথ্যমতে, দেশের ছয়টি ছোটমনি নিবাসে গত ১০ বছরে  ৮৯৮ জন পরিত্যক্ত শিশু আশ্রয় পেয়েছে।

কেন শিশু পরিত্যক্ত হয় : শিশু অধিকার ফোরামের ভাইস প্রেসিডেন্ট খায়রুজ্জমান কামাল বলেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিত্যক্ত নবজাতকরা কন্যাশিশু হয়ে থাকে। একাধিক কন্যাশিশু, সমাজে কন্যাসন্তানকে এখনো বোঝা হিসেবে দেখা, প্রতিবন্ধী শিশু, চরম দারিদ্র্য, পারিবারিক সহিংসতা, সামাজিক লজ্জা ও অনাকাঙ্ক্ষিত মাতৃত্বসহ অনেক কারণে পরিবারে নবজাতকের আগমন আনন্দের না হয়ে পরিত্যাগের মতো অমানবিক ঘটনা ঘটছে। তিনি বলেন, আমরা দেখেছি রাস্তায় এক শ্রেণির মানসিক প্রতিবন্ধী নারী ধর্ষণের শিকার হলে, তার সন্তানও পরিত্যক্ত হয়। অনেক সময় বিবাহবহির্ভূত মেলামেশার কারণেও শিশু পরিত্যক্তর ঘটনা ঘটে।

শিশু সহায়তা হেল্প লাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মোহাইমেন বলেন, আমাদের সমাজ এখন আধুনিক সমাজের দ্বারপ্রান্তে। এখানে বিয়ের আগেই অনেকে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে। আবার কিছুদিনের মধ্যে তাদের প্রণয়ে ভাটা পড়লে তারা সম্পর্কে থাকতে চায় না। ফলে অনাগত সন্তানের দায় কেউ নিতে চায় না। আবার কিশোর-কিশোরীদের দুই-এক বার মেলামেশার ফলেও বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েরা গর্ভবতী হয়ে আমাদের কল করে, তারা কী করবে। এটা সেটা ভাবতে ভাবতে সময় গড়িয়ে গেলে অ্যাবরশন ছাড়া উপায় থাকে না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবার ও সমাজে সচেতনতা বৃদ্ধি, দরিদ্র পরিবারের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ, সংকটাপন্ন মায়েদের জন্য কাউন্সেলিং সেবা এবং নিরাপদ শিশু সুরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করা জরুরি।

অপরাধ হলেও নির্দিষ্ট আইন নেই : সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ কল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. তৌহিদুল হক বলেন, এভাবে শিশু পরিত্যাগ করা অপরাধ হলেও একে অপরাধ হিসেবে গণ্য করে আইনের আওতায় আনা হয়নি। কিন্তু অন্য আইনের আওতায় এর বিচার করার সুযোগ আছে। তবে সবচেয়ে বড় ঘাটতি কারা কখন কেন এই শিশুদের ফেলে দিচ্ছে, তাদের শনাক্ত করা যাচ্ছে না। শনাক্ত করার জন্য সিসি ক্যামেরাসহ আরো প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। শনাক্ত করা গেলে ব্যবস্থা গ্রহণ সহজ হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই বিষয় সুনির্দিষ্ট আইন করে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি।

এই শিশুদের ভবিষ্যত্ কী? : সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমির মল্লিক বলেন, শূন্য থেকে সাত বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ছোটমনি নিবাসে রাখা হয়। পরে শিশু পরিবারে স্থানান্তর করা হয়। তাদের পড়াশোনা, লাইফ স্কিল প্রশিক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে বিয়ের ব্যবস্থাও করা হয়। আবার নির্ধারিত শর্ত পূরণ করে অনেক নিঃসন্তান দম্পতিও তাদের লালন-পালনের দায়িত্ব নেন।

সেভ দ্য চিলড্রেনের শিশু সুরক্ষা কার্যক্রমের সেক্টর প্রধান আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, একটি শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাবা-মায়ের আশ্রয়। তাই স্থানীয় সরকার প্রতিনিধি ও উপজেলা প্রশাসনের উপস্থিতিতে দায়িত্ব পালনের শর্তে বাবা-মায়ের কাছে শিশুদের ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে, যাতে শিশুরা স্বাস্থ্যকর পরিবেশে বেড়ে উঠতে পারে, পুষ্টি, শিক্ষা ও জীবন-দক্ষতার সুযোগ পায়। একই সঙ্গে অভিভাবক ও প্রতিপাল্য আইন, ১৮৯০ অনুসরণ এবং অবৈধ গর্ভপাতের নামে যেসব ক্লিনিক বা হাসপাতালে অনিয়ম হয়, সেগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।