এক যুগ আগে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে সংঘটিত হত্যাকাণ্ড নিয়ে যে তদন্ত চলছে, সেই তদন্তের খসড়া প্রতিবেদন চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে জমা দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজসহ অনেককেই এ মামলায় আসামি করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন সূত্র গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। পরে ব্রিফিংয়ে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের ঘটনাটি একটি পদ্ধতিগত অপরাধ। এটি ছিল ব্যাপক ও লক্ষ্যভিত্তিক হত্যাকাণ্ড। সুপিরিয়র রেসপনসিবিলিটি রয়েছে। একদম পরিকল্পিতভাবে এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে। কারণ যখন ব্লগারদের বিরুদ্ধে হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীরা প্রতিবাদ করছিলেন, ঠিক তখনই রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ জায়গা থেকে এ সংগঠনটিকে একেবারে নিঃশেষ করে দেওয়ার জন্য নানা পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় এমন হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে আয়োজিত ব্রিফিংয়ের সময় হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হকও উপস্থিত ছিলেন। এর আগে ২ জুলাই এক ব্রিফিংয়ে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনুর সম্পৃক্ততা পাওয়ার কথা জানিয়েছিলেন চিফ প্রসিকিউটর। গত ১৫ জুন তিনি বলেছিলেন, সংঘটিত এ হত্যাকাণ্ডের অন্যতম কুশীলব সাবেক পুলিশপ্রধান (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ। ওই সময় তিনি ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) কমিশনার ছিলেন।
গতকালের ব্রিফিংয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিবেদন পেয়েছি বলতে আমাদের কাছে একটা খসড়া দিয়েছে। মানে আমরা ফাইনাল পাইনি। খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার নাম এসেছে। এ ছাড়া তৎকালীন পুলিশপ্রধান, বিজিবিপ্রধানসহ কয়েকজনের নাম খসড়া তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে আমরা এটা নিয়ে পর্যালোচনা করে দেখছি।’ সাংবাদিকরা খসড়া তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন করলেও চিফ প্রসিকিউটর আর কোনো তথ্য দেননি। তবে তিনি বলেন, নিহতদের একটি খসড়া তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে, যেখানে ৬১ জনের মৃত্যুর তথ্য উঠে এসেছে। এর মধ্যে এখনো তিনজনের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। এদিকে মামলার অগ্রগতি জানতে এদিন প্রসিকিউশনের সঙ্গে মতবিনিময় করতে আসেন হেফাজতের নেতারা। এ বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘তারা আমাদের সঙ্গে মতবিনিময় করবেন। এরপর আমরা হয়তো ফাইনাল রিপোর্টটা আসার সাপেক্ষে মামলার কার্যক্রম পরিচালনা করব। আপাতত উনারা আমাদের অগ্রগতি জানতে আসছেন, আমরা হয়তো জানাব।’
পরে হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা মামুনুল হক সাংবাদিকদের বলেন, শুধু নিহত যাদের তথ্য সংগ্রহ করা গেছে, তদন্তে তাদের সংখ্যাটি এসেছে। কিন্তু আমরা প্রথম থেকেই বলছি যে, অনেকেরই লাশ পাওয়া যায়নি। কাজেই সেসব তথ্য এখানে আনার সুযোগ নেই। কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে তৎকালীন সময়ে শাপলার শহীদদের লাশ গুম করার অপচেষ্টা হয়েছিল। এজন্য বহুসংখ্যক শহীদের কোনো হদিস মেলেনি। তিনি বলেন, শাপলা চত্বরের মহাসমাবেশে সমাজের সব শ্রেণির মানুষ অংশ নিয়েছিলেন। শিক্ষার্থী, শ্রমিকসহ তৎকালীন প্রায় সব বিরোধী ঘরানার রাজনৈতিক দলের কর্মীরাও শহীদের তালিকায় রয়েছেন। কেননা আন্দোলনটি সর্বজনীন ছিল।
২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরের সমাবেশে নির্বিচার গুলি চালিয়ে শতাধিক কর্মী হত্যার কথা উল্লেখ করে ২০২৪ সালের ২৪ নভেম্বর চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে অভিযোগ দেন হেফাজতে ইসলামের যুগ্ম মহাসচিব আজিজুল হক। অভিযোগে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৫০ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। গত বছর ১৪ মে ১২ জন আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন ট্রাইব্যুনাল। পরে ৩১ মার্চ আবদুল জলিল মণ্ডলকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ১৪ মে গ্রেপ্তার দেখানো হয় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনি, একাত্তর মিডিয়া লিমিটেডের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং একাত্তর টেলিভিশনের সাবেক প্রধান প্রতিবেদক ফারজানা রূপাকেও।