অন্যান্য দিনের মতো বুধবার দুপুরেও জোহরের নামাজের পর মাদ্রাসায় চলছিল পবিত্র কোরআনের পাঠদান। শ্রেণিকক্ষে বসে শিশুদের পাঠদান করাচ্ছিলেন শিক্ষিকা বেগম জাহান। বেলা ২টার পর হঠাৎ শোনা গেলো বিকট শব্দ। মুহূর্তেই সবাই মাটির নিচে চাপা পড়লো। চারদিকে শুরু হলো চিৎকার। শিশুদের কান্না আর বাঁচার আকুতিতে ভারী হয়ে ওঠে আশপাশ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সবকিছু বদলে যায়। আশপাশের লোকজন চিৎকার দিয়ে ছুটে আসেন। যে যার মতো করে শুরু করেন উদ্ধার অভিযান। শেষ পর্যন্ত আট জনের মৃত্যু হয়।
বুধবার (৮ জুলাই) বেলা ২টার দিকে কক্সবাজারের উখিয়ার উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এ-৩ ব্লকের পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত খাদিজাতুল কুবরা মহিলা মাদ্রাসা ও হেফজখানায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের খাদে নির্মিত দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়লে চাপা পড়েন সবাই। সেখানে সাত থেকে ১৫ বছর বয়সী মেয়েশিশুরা পড়ছিল। এখন পর্যন্ত আট জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আহত অবস্থায় তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে এবং সিসিসিএমের স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় সন্ধ্যা ৬টার দিকে উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। ঘটনাস্থলে এপিবিএন সদস্যরা রয়েছেন। পুরো উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেছেন কক্সবাজারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ের কর্মকর্তারা।
মৃত আট জনের মধ্যে চার জনের পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা হলো- ৫ নম্বর রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বাসিন্দা হাসিম উল্লাহর মেয়ে রাশিদা বেগম (১৩), আবদুস শুকুরের দুই মেয়ে উন্মে নেজাতুল (১৩) ও উন্মে সালমা (১২) ও মো. ইলিয়াছের মেয়ে উমাইসা বিবি (১৩)। বাকিদের এখনও পরিচয় পাওয়া যায়নি।
উখিয়ার ৫ নম্বর রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে একটি মাদ্রাসা ও হেফজখানার ওপর পড়ে
গুরুতর অবস্থায় আরও তিন জন শিশু-কিশোরীকে আশ্রয়শিবিরের কুতুপালং ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা হলো ৩ নম্বর ক্যাম্পের দিল মোহাম্মদের মেয়ে আসরা বেগম (৯), একই ক্যাম্পের এফ-১ ব্লকের নুরুল আমিনের মেয়ে বেগম জান (১৫) ও ৫ নম্বর ক্যাম্পের এ-৭ ব্লকের বশির আহমদের মেয়ে ফারেসা বিবি (১২)। তাদের অবস্থাও আশঙ্কাজনক। পাশাপাশি উদ্ধার করা হয়েছে মাদ্রাসার শিক্ষিকা বেগম জাহানকে।
বেঁচে ফেরা শিক্ষিকা বেগম জাহান ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সন্ধ্যায় বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমাদের এখানে ২৫ জনের মতো শিশু পড়ছিল। সবাইকে কোরআন শরিফ পড়াচ্ছিলাম। হঠাৎ বিকট শব্দে পাহাড়ধসে খাদে নির্মিত দেয়াল মাদ্রাসার ওপর ধসে পড়ে। মুহূর্তেই চারদিক ধুলায় অন্ধকার হয়ে যায়। আমরা সবাই মাটির নিচে চাপা পড়ি। শিশুরা চিৎকার করতে করতে যে যেদিকে পেরেছে, সেদিকে দৌড়াতে শুরু করে। পশ্চিম পাশের দরজাটি খোলা থাকায় আমরা কয়েকজন বের হতে পেরেছিলাম। কিন্তু পূর্ব পাশে থাকা অনেক শিশু বের হওয়ার সুযোগ পায়নি। তাদের কেউ চাপা পড়ে মারা গেছে, আবার কেউ গুরুতর আহত হয়েছে।’
কাঁদতে কাঁদতে তিনি বলেন, ‘ভাগ্য যাদের ভালো ছিল, শুধু তারাই বের হয়ে বাঁচতে পেরেছে। আমরা সাত জন নারী শিক্ষক সেখানে পাঠদান করাচ্ছিলাম। তখন ২৫ জন শিক্ষার্থী কোরআন শিক্ষা নিচ্ছিল। এমন ভয়াবহ দৃশ্য জীবনে কখনও দেখিনি। শিশুদের কান্না ও আর্তনাদ এখনও কানে বাজছে আমার।’
স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, সকাল থেকে আশ্রয়শিবিরে ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। বেলা ২টার দিকে পাহাড়ের নিচে নির্মিত ওই মহিলা হেফজখানার ওপর দেয়াল ধসে পড়ে। হইচই ও চিৎকার শুনে স্থানীয় রোহিঙ্গারা এগিয়ে আসেন। স্থানীয় ক্যাম্প প্রশাসন, এপিবিএন ও স্বেচ্ছাসেবীরা উদ্ধার কাজে যোগ দেন।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার (আরআরআরসি) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, পাহাড় ধসে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাম্প-৫ এলাকা থেকে এ পর্যন্ত আট জনের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর মধ্যে চার জন ঘটনাস্থলেই এবং অপর চার জন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। ১৩ শিশুকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। তাদের বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ভর্তি করা হয়েছে। তাদের ক্যাম্প-৩-এর জিকে হাসপাতাল, ক্যাম্প-৫-এর ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতাল এবং ক্যাম্প-৬-এর আইআরসি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে এবং সিসিসিএমের স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় পরিচালিত উদ্ধার অভিযান শেষ হয়েছে। ঘটনাস্থলে এপিবিএন সদস্যরা রয়েছেন। পুরো উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেছেন আরআরআরসির কর্মকর্তারা।