কোম থেকে তেহরান হয়ে পবিত্র নাজাফ ও কারবালা, পুরো মধ্যপ্রাচ্য এখন শোকে স্তব্ধ। লাখো মানুষের অশ্রু, শোকের কালো মিছিল এবং আকাশ-বাতাস কাঁপানো ‘লাব্বাইক ইয়া খামেনায়ী’ ধ্বনিতে মুখর চারপাশ। ইসলামি বিপ্লবের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সৈয়দ আলি খামেনির ঐতিহাসিক শেষ বিদায় অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে যখন ইরান ও ইরাকের রাস্তায় জনতার ঢল নেমেছে, ঠিক তখনই দক্ষিণ ইরানের আকাশে দেখা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধবিমানের গর্জন। কোটি মানুষের এই শোকাবহ পরিবেশের মধ্যেই ওয়াশিংটন ও তেহরানের পুরোনো সংঘাত নতুন ও উত্তপ্ত অধ্যায়ে রূপ নিয়েছে। এতে দুই দেশের ভঙ্গুর সমঝোতা চরম ভাঙনের মুখে পড়েছে। আঙ্কারায় উত্তর আটলান্টিক জোটের সম্মেলনের শেষ দিনে বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই মন্তব্য করেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি শেষ। তেহরানের সঙ্গে আলোচনা করা ‘সময়ের অপচয়’।
ভোররাতের আকাশে মার্কিন আগ্রাসন
ইরানের দাবি, বুধবার ভোরে সাধারণ মানুষ যখন শোকের আবহে মগ্ন, তখন দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় সামরিক ও নজরদারি স্থাপনায় অতর্কিত বিমান হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। তেহরানের ভাষ্যমতে, হরমুজগান প্রদেশের উপকূলীয় এলাকা এবং মাহশাহরের কয়েকটি ঘাঁটি ও পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ইরানের ৮০টি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিকভাবে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেছে, এটি জাতিসংঘ সনদের ২(৪) অনুচ্ছেদের স্পষ্ট লঙ্ঘন। একই সঙ্গে সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে স্বাক্ষরিত ১৪ দফা যুদ্ধ সমাপ্তি সমঝোতা স্মারকের ওপর এটি বড় আঘাত। তেহরানের অভিযোগ, এই হামলার আগেই ওয়াশিংটন ইরানি তেল রপ্তানির ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যুদ্ধবিরতির পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলছিল।
আইআরজিসির পাল্টা হামলা
হাত গুটিয়ে বসে থাকেনি ইরানও। ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ ও মহাকাশবাহিনী যৌথভাবে পাল্টা অভিযান শুরু করে। তাদের দাবি, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের মাধ্যমে বাহরাইনের সালমান বন্দর, যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের প্রধান ঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি আল-সালেম বিমানঘাঁটিসহ যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক স্থাপনায় আঘাত হানা হয়েছে। একই সঙ্গে একটি অত্যাধুনিক এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে। ওয়াশিংটন এ বিষয়ে এখনো কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য প্রকাশ না করলেও মধ্যপ্রাচ্যের আকাশ যে এখন বারুদের গন্ধে ভারী, তা নিশ্চিত।
লক্ষ্য কি জনসমুদ্র থেকে দৃষ্টি ঘোরানো?
ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই হামলার সময় নির্ধারণ কাকতালীয় নয়। আয়াতুল্লাহ খামেনির জানাজায় ইরান ও ইরাকজুড়ে নজিরবিহীন জনসমাগম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তেহরানের জনসমর্থন ও মনস্তাত্ত্বিক শক্তির প্রতীক হয়ে উঠেছে। তাদের দাবি, এই বিশাল জনসমাবেশের আন্তর্জাতিক প্রভাব থেকে দৃষ্টি সরিয়ে যুদ্ধ ও উত্তেজনার দিকে বিশ্ববাসীর মনোযোগ ফেরাতেই যুক্তরাষ্ট্র এই সময় বিমান হামলা চালিয়েছে। একবিংশ শতাব্দীর বৃহত্তম এই শোকযাত্রার আন্তর্জাতিক গুরুত্বকে খাটো করতেই কি ওয়াশিংটন এই উসকানি দিল? এই প্রশ্ন এখন বিশ্বজুড়ে জোরালো হয়ে উঠেছে।
‘সমঝোতার অধ্যায় শেষ’ : হুংকার ট্রাম্পের
সামরিক উত্তেজনার মধ্যেই উত্তর আটলান্টিক জোটের সম্মেলনের ফাঁকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক ও যুদ্ধবিরতির অধ্যায় কার্যত শেষ। ‘ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়া এখন শুধুই সময়ের অপচয়।’ যদিও আলোচক স্টিভ উইটকফ ও জ্যারেড কুশনারকে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমতি দিয়েছেন তিনি। তবু পুনর্ব্যক্ত করেন যে, যুক্তরাষ্ট্র কখনোই ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে দেবে না। ট্রাম্পের এই বক্তব্যের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই দক্ষিণ ইরানে বিমান হামলার ঘটনা ঘটে।
‘ব্ল্যাকমেলের যুগ শেষ’ : ইরানের কড়া হুঁশিয়ারি
মার্কিন হামলার পর ইরানের রাজনৈতিক নেতৃত্বও কঠোর অবস্থান নেয়। দেশটির সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ বলেন, ‘জবরদস্তি ও ব্ল্যাকমেলের যুগ শেষ। এই পথ যুক্তরাষ্ট্রকে কোথাও নিয়ে যাবে না। ইরান পিছু হটার পাত্র নয়।’
তিনি অভিযোগ করেন, হরমুজ প্রণালিতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং লেবাননের ওপর ইসরায়েলি হামলাকে সমর্থনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ১৪ দফা সমঝোতাকে কার্যত অকার্যকর করে তুলেছে। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাইয়্যেদ আব্বাস আরাকচি বলেন, সমঝোতা স্মারকের ১৩ নম্বর ধারা অনুযায়ী হুমকি ও নিষেধাজ্ঞা বহাল রেখে কোনো চূড়ান্ত চুক্তি বা আলোচনা সম্ভব নয়।
ভঙ্গুর সমঝোতা : কোন পথে মধ্যপ্রাচ্য?
ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ও আবেগঘন শোকযাত্রার সাক্ষী হচ্ছে ইরান ও ইরাক। কোটি মানুষের এই মহাসমাবেশ যেমন প্রিয় নেতার প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ, তেমনি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে নীরব প্রতিরোধের প্রতীক বলেও বর্ণনা করা হচ্ছে। তবে সেই শোকের আবহ কাটার আগেই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশে যুদ্ধের কালো মেঘ ঘনীভূত হয়েছে। একদিকে আলোচনার টেবিল থেকে সরে আসার যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান, অন্যদিকে ইরানের পাল্টা সামরিক প্রতিক্রিয়া। ফলে ১৪ দফা সমঝোতা টিকে থাকবে, নাকি মধ্যপ্রাচ্য আরও বড় সংঘাতের দিকে এগোবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।