Image description

সাধারণত জাল নোট বলতে একটি নকল নোটকে বোঝানো হতো। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অপরাধী চক্রগুলো এখন আর শুধু নকল নোট ছাপাচ্ছে না, এর সঙ্গে আসল নোটের অংশ পরিবর্তন করে ফেলছে। এ ছাড়া রাসায়নিক কেমিক্যাল দিয়ে টাকার মূল্যমান বদল করছে। আবার দুটি নোট জোড়া দিয়ে নতুন নোট তৈরির মতো কৌশল ব্যবহার করছে। এসব অপরাধ মোকাবিলায় ‘জাল মুদ্রা প্রতিরোধ আইন ২০২৬’ নামে নতুন আইনের খসড়া প্রণয়ন করেছে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সেখানে প্রথমবারের মতো পাঁচ ধরনের সন্দেহজনক ও কারসাজিকৃত ব্যাংক নোটের পৃথক আইনি সংজ্ঞা নির্ধারণ করা হয়েছে। আইনটি মতামত নিয়ে শিগগির জারি করা হবে। খবর সংশ্লিষ্ট সূত্রের।

খসড়ায় জাল নোট-সংক্রান্ত অপরাধকে আমলযোগ্য, আপস অযোগ্য ও জামিন অযোগ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে। পাশাপাশি জাল নোট তৈরি, সংরক্ষণ, পরিবহন, বাজারজাত কিংবা ব্যবহার— সব ক্ষেত্রেই কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া অাইনে আরও বলা হয়েছে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মানি এক্সচেঞ্জ বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কোনো সন্দেহজনক নোট পেলে তা গ্রাহকের কাছে ফেরত দিতে পারবেন না। নোটটি জব্দ করে নির্ধারিত পদ্ধতিতে বাংলাদেশ ব্যাংকে পরীক্ষার জন্য পাঠাতে হবে। আর বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত পরীক্ষকের দেওয়া সার্টিফিকেশন আদালতে গ্রহণযোগ্য প্রমাণ হিসেবে ব্যবহারের বিধান রাখা হয়েছে। এতে জাল নোটের মামলার তদন্ত ও বিচার আরও কার্যকর হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এ ছাড়া আইনটি কার্যকর হলে জাল নোট দমনে বর্তমানে বিভিন্ন আইন ও নির্দেশনায় ছড়িয়ে থাকা বিধান এক ছাতার নিচে আসবে। একই সঙ্গে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, মানি এক্সচেঞ্জ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বও স্পষ্ট হবে।

এদিকে জাল নোটের মধ্যে রয়েছে জাল, টেম্পার্ড, ব্লিচড, মিসম্যাচড এবং সন্দেহজনক ব্যাংক নোট। নতুন আইনে প্রতিটি ধরনের নোট শনাক্ত, জব্দ, পরীক্ষা ও বিচারের আলাদা বিধান রাখা হয়েছে।

খসড়া আইনের বড় পরিবর্তন হলো— এতে শুধু জাল নোট নয়, বিভিন্ন ধরনের বিকৃত নোটের পৃথক সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, জাল নোট এটি সম্পূর্ণ নকলভাবে তৈরি এমন নোট, যা আসল নোটের অনুকরণে তৈরি করা হয় এবং প্রতারণার উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। টেম্পার্ড নোট আসল নোটের কোনো অংশ ইচ্ছাকৃতভাবে পরিবর্তন, কেটে-ছিঁটে বা বিকৃত করে নতুন রূপ দেওয়া। ব্লিচড নোট-রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করে আসল নোটের ছাপ বা মূল্যমান মুছে অন্য মূল্যমান বা পরিচয়ে রূপান্তর করা। মিসম্যাচড নোট-দুটি বা ততোধিক আলাদা নোটের অংশ কেটে জোড়া দিয়ে একটি নতুন নোট তৈরি এবং সন্দেহজনক নোট হচ্ছে, যে নোটের সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায় না এবং পরীক্ষার প্রয়োজন হয়, সেটিকে সন্দেহজনক নোট হিসেবে গণ্য করা হবে।

জানা গেছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাম্প্রতিক অভিযানে গত বছরই বিভিন্ন অভিযানে প্রায় ৮৬ লাখ টাকার বেশি জাল নোট উদ্ধার করা হয়েছে। তবে সারা বছরে উদ্ধার হওয়া জাল নোটের কোনো সমন্বিত সরকারি পরিসংখ্যান এখনো প্রকাশ করা হয়নি। এক্ষেত্রে মোকাবিলায় বিদ্যমান আইন অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ছে। সেটি বিবেচনায় নিয়ে নতুন জাল নোট প্রতিরোধ অাইন প্রণয়ন করছে সরকার।

এদিকে দেশে জাল নোট প্রতিরোধে এতদিন বিচ্ছিন্ন বিধান থাকলেও আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি ব্লিচড বা টেম্পার্ড নোট মোকাবিলায় আলাদা আইনি কাঠামো ছিল না। নতুন আইনে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী নোট শনাক্তকরণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক পরীক্ষার আইনি স্বীকৃতি এবং ব্যাংকগুলোর বাধ্যবাধকতা নির্ধারণের মাধ্যমে নগদ লেনদেনে আস্থা বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনটি কার্যকর হলে জাল মুদ্রা চক্রের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যেমন সহজ হবে, তেমনি আদালতেও মামলা নিষ্পত্তি দ্রুত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে।