বুধবার ভোরে ইরানের ওপর কয়েক ডজন হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটনের দাবি, অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রলালীতে বাণিজ্যিক জাহাজে তেহরানের হামলার জবাব হিসেবেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
মার্কিন হামলার পর তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ট্রাম্পের বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৬ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৭৮ ডলারে ওঠে।
এই হামলার সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা চলছিল। একই সময়ে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়াও চলছিল। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধের শুরুতেই খামেনি নিহত হন। এপ্রিলের যুদ্ধবিরতির পর এটিই ছিল সবচেয়ে বড় সামরিক হামলা।
ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানায়, জবাবে তারা প্রতিবেশী দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এ সময় বাহরাইন ও কুয়েতে সাইরেন বেজে ওঠে। আইআরজিসির দাবি, শত্রুপক্ষের ড্রোন হামলায় তাদের একজন সদস্য নিহত হয়েছেন।
দুই পক্ষই অভিযোগ করছে, তিন সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত ৬০ দিনের শান্তি আলোচনার সমঝোতা স্মারক অপর পক্ষ লঙ্ঘন করেছে। চলমান আলোচনার মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের এটি তৃতীয় বড় হামলা। তেহরানের দাবি, এতে দুই দেশের মধ্যকার আস্থার ভিত্তি ভেঙে পড়েছে।
কী ঘটেছে?
মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানায়, মঙ্গলবার গভীর রাত থেকে বুধবার ভোর পর্যন্ত ইরানের ৮০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। এর কারণ হিসেবে তারা হরমুজ প্রলালী দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার কথা উল্লেখ করেছে।
আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্প বলেন, ‘গত রাতে আমরা অত্যন্ত শক্তিশালী হামলা চালিয়েছি। ইরানের মানুষগুলো খুবই বিপজ্জনক।’ তিনি আরও বলেন, ‘ওরা অসুস্থ, ওদের মধ্যে কিছু একটা সমস্যা রয়েছে।’
সেন্টকমের দাবি, মার্শাল দ্বীপপুঞ্জের পতাকাবাহী এমটি আল রেকাইয়্যাত, সৌদি আরবের পতাকাবাহী এমটি ওয়েদিয়ান এবং লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এমটি সাইপ্রাস প্রসপারিটি নামের তিনটি তেলবাহী জাহাজে হামলা চালায় ইরান। জাহাজগুলো ওমান উপকূলের কাছে ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরান এর আগে সব জাহাজকে নিজেদের নির্ধারিত ‘নিরাপদ পথ’ অনুসরণ করতে নির্দেশ দিয়েছিল, যা দেশটির উপকূলের আরও কাছ দিয়ে গেছে এবং ওমানের জলসীমার একটি অংশকে ‘নিষিদ্ধ এলাকা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের দাবি, ওই জাহাজগুলো দিক পরিবর্তনের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করেছিল।
এর জবাবে সেন্টকম জানায়, মার্কিন বাহিনী ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, কমান্ড ও নিয়ন্ত্রণ নেটওয়ার্ক, উপকূলীয় রাডার, জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা এবং হরমুজ প্রলালীতে থাকা আইআরজিসির ৬০টিরও বেশি ছোট নৌযানে হামলা চালিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক নৌপথে হামলার সক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে।
একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা থেকে দেওয়া সাময়িক ছাড়ও প্রত্যাহার করেছে।
সেন্টকম সতর্ক করে বলেছে, ইরান যদি সমঝোতার বাইরে কোনো পদক্ষেপ নেয়, তাহলে আরও হামলা চালানো হবে। সমঝোতা অনুযায়ী, শান্তি আলোচনা চলাকালে অন্তত ৬০ দিন হরমুজ প্রলালীতে অবাধ নৌচলাচল নিশ্চিত করার কথা ছিল।
তেহরানভিত্তিক বিশ্লেষক হোসেইন রয়ভারান আল জাজিরাকে বলেন, সম্ভবত ওই জাহাজগুলো এমন এলাকায় প্রবেশ করেছিল, যেখানে ইরানি দলগুলো সমুদ্রে পাতা মাইন অপসারণ করছিল।
তার ভাষায়, ‘ওমান উপকূলের আশপাশে এখনও বিপুলসংখ্যক মাইন থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। জাহাজগুলোর চলাচল হয়তো মাইন অপসারণে নিয়োজিত ইরানি দলগুলোর জন্য হুমকি তৈরি করেছিল।’
ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দিতে ট্রাম্প রওনা হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগেই এই হামলা চালানো হয়।
ইরানের কোন কোন এলাকায় হামলা হয়েছে?
ইরানি গণমাধ্যম জানিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরনগরী সিরিকে একাধিক বিস্ফোরণ হয়েছে। সেখানে বাণিজ্যিক ও মাছ ধরার জেটিতে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হানে। শার্পনেলের আঘাতে কয়েকজন আহত হয়েছেন, তবে হতাহতের পূর্ণাঙ্গ তথ্য এখনও জানা যায়নি।
হরমুজ প্রলালীর কৌশলগত দ্বীপ কেশম এবং গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী বন্দর আব্বাসের আশপাশেও হামলার খবর পাওয়া গেছে। সমঝোতার আগে এই বন্দরগুলোর একটিতে মার্কিন নৌবাহিনীর অবরোধ ছিল।
ফার্স নিউজ এজেন্সির বরাতে জানা যায়, বুধবার সকালে বুশেহর প্রদেশের দাশতি কাউন্টি ও চোগাদক এলাকার কাছে দুটি সামরিক ঘাঁটিতেও হামলা হয়েছে।
এ পর্যন্ত এসব হামলায় কোনো নিহত বা আহতের খবর পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্র আর কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
মঙ্গলবার রাতে মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয় জানায়, ইরানের তেলের ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়েছে।
যুদ্ধ চলাকালে ট্রাম্প হরমুজ প্রলালী বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সৃষ্ট জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সমুদ্রে থাকা তেলবাহী চালানের ওপর নিষেধাজ্ঞা সাময়িক শিথিল করেছিলেন।
১৭ জুন স্বাক্ষরিত সমঝোতা অনুযায়ী, ইরানকে ৬০ দিনের জন্য পূর্ণ ছাড় দেওয়া হয়েছিল, যাতে তারা শান্তি আলোচনা চলাকালে অপরিশোধিত তেল রপ্তানি করতে পারে। এই ছাড় ২১ আগস্ট পর্যন্ত কার্যকর থাকার কথা ছিল।
নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ৭ জুলাই থেকে নতুন তেল বিক্রির ক্ষেত্রে আবারও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হবে। তবে ৭ জুলাইয়ের আগে বিক্রি হওয়া এবং ইতোমধ্যে জাহাজে পাঠানো তেলের অর্থ একটি ‘অবরুদ্ধ সুদবাহী হিসাবে’ রাখা হবে।
আল জাজিরার তেহরান প্রতিনিধি রেসুল সারদার আতাস বলেন, নতুন নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিতে বড় ধরনের প্রভাব ফেলবে।
তার ভাষায়, ‘ইরানের অর্থনীতির প্রধান ভরসা তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানি। সমঝোতার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হরমুজ প্রলালী খুলে দেওয়া এবং এর বিনিময়ে তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা।’
ইরানের প্রতিক্রিয়া কী?
বুধবার আইআরজিসি জানায়, তারা বাহরাইন ও কুয়েতে যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
তাদের দাবি, বাহরাইনের পোর্ট সালমান, মার্কিন পঞ্চম নৌঘাঁটি এবং কুয়েতের আলি সালেম বিমানঘাঁটিসহ ৮৫টি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন স্থাপনা ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি এমকিউ-৯ ড্রোনও ভূপাতিত করা হয়েছে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় যুক্তরাষ্ট্রের হামলাকে সমঝোতা স্মারকের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আগ্রাসন বলে নিন্দা জানিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ সনদের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের ৪ নম্বর ধারার লঙ্ঘন করে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণ উপকূলের একাধিক নজরদারি কেন্দ্রে হামলা চালিয়েছে। এটি যুদ্ধ সমাপ্তির সমঝোতা স্মারকের প্রথম ধারারও সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
এতে পারস্য উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলবর্তী দেশগুলোকে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করে ইরানের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালাতে না দেওয়ার আন্তর্জাতিক দায়বদ্ধতার কথাও স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়।
মন্ত্রণালয় জানায়, জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করে ইরান হামলার উৎসকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
এক্সে দেওয়া এক পোস্টে ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ গালিবাফ বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা, নতুন নিষেধাজ্ঞা এবং লেবাননে ইসরায়েলি হামলা সবই সমঝোতার বড় ধরনের লঙ্ঘন।
তিনি লেখেন, ‘ভয়ভীতি ও জবরদস্তির যুগ শেষ। এতে কোনো লাভ হবে না। আমরা নতি স্বীকার করব না।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচিও বলেন, মার্কিন হামলার ফলে যুদ্ধ অবসানের সমঝোতার মৌলিক ভিত্তিই নষ্ট হয়ে গেছে।
শান্তি আলোচনা এখন কোথায় দাঁড়িয়েছে?
বর্তমানে শান্তি প্রক্রিয়া অনিশ্চয়তার মুখে। ট্রাম্প বলেছেন, তার মতে সমঝোতা কার্যত শেষ। যদিও আলোচকদের তিনি আপাতত আলোচনা চালিয়ে যেতে দিতে পারেন, তবে তিনি নিজে এতে কোনো ফল দেখছেন না।
আল জাজিরার প্রতিরক্ষা সম্পাদক জেমস বেইস বলেন, ট্রাম্পের বক্তব্যে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। প্রশ্ন হলো, এটি কি কেবল চাপ সৃষ্টি করার কৌশল, নাকি তিনি সত্যিই তিন সপ্তাহ আগে হওয়া সমঝোতা বাতিল করতে যাচ্ছেন?
১৭ জুনের ৬০ দিনের সমঝোতায় ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি লেবাননেও যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। এতে ইরানকে হরমুজ প্রলালীতে স্বাভাবিক বাণিজ্যিক নৌচলাচল পুনঃস্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র তেল রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের জব্দ সম্পদ মুক্ত করার প্রতিশ্রুতি দেয়।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া
ন্যাটো মহাসচিব মার্ক রুটে যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপকে সমর্থন জানিয়ে বলেন, বাণিজ্যিক জাহাজে ইরানের হামলার পর ওয়াশিংটনের প্রতিক্রিয়া ছিল প্রয়োজনীয়।
উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) মহাসচিব জাসেম মোহাম্মদ আল-বুদাইউই বাহরাইন ও কুয়েতে ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, এটি দুই দেশের সার্বভৌমত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আঞ্চলিক শান্তি বিনষ্টের প্রচেষ্টা।
কুয়েত, ওমান, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও মিসরও ইরানের হামলার নিন্দা জানিয়েছে এবং উত্তেজনা কমিয়ে আলোচনায় ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে।
এরপর কী হতে পারে?
দোহা ইনস্টিটিউট অব গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের গবেষক মুহান্নাদ সেলুম বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের হামলা সীমিত ছিল এবং কারিগরি দিক থেকে সমঝোতা এখনও বহাল থাকতে পারে। তবে ট্রাম্পের বক্তব্য পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
অবসরপ্রাপ্ত মার্কিন নৌ কর্মকর্তা হারলান উলম্যানের মতে, ইরান সংবেদনশীল সময়ে যুক্তরাষ্ট্রকে উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে। তার ভাষায়, ‘আমার ধারণা, ইরান যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে ফেলতে চাইছে।’
তিনি আরও বলেন, ইরান হয়তো আগস্টের সময়সীমার আগে আরও আলোচনার সুযোগ তৈরি করতেও সময়ক্ষেপণের কৌশল নিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত উলম্যানের মূল্যায়ন, ‘যুদ্ধ হবে নাকি শান্তি; আমার ধারণা, শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই উত্তেজনা কমানোর পথই খুঁজবে।’