নবনিযুক্ত বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. এস এম মনিরুজ্জামানকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ আখ্যা দিয়ে তার কর্মস্থলে অবরুদ্ধ করে রেখেছেন বিএনপিপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) চিকিৎসকরা। পরবর্তীতে সিনিয়র চিকিৎসকদের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধানের আশ্বাসে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। তবে তাদের অভিযোগ অস্বীকার করে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক বলেছেন, ‘আমি ছাত্রদলের রাজনীতি করতাম।’
বুধবার (০৮ জুলাই) দুপুরে বরিশাল নগরীর ব্রাউন কম্পাউন্ড এলাকায় অফিস চলাকালীন শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসকরা নবনিযুক্ত বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করেন। এর আগে গতকাল মঙ্গলবার তার কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেন ওসব চিকিৎসক।
তাদের অভিযোগ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে হাসপাতালের তৎকালীন উপপরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে সব কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। এমনকি জুলাই আন্দোলন চলাকালীন আওয়ামী লীগের শান্তি সমাবেশ থেকে শুরু করে আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) সব কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত ছিলেন। জুলাই আন্দোলনে যেসব শিক্ষার্থী আহত হয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন তাদের চিকিৎসায় তিনি বাধা দিয়েছেন। এ কারণে তার মতো জুলাইবিরোধী ব্যক্তি কোনোভাবেই বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের পদে বসতে পারবেন না।
অবরুদ্ধ করা শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজের ৫৫ ব্যাচের শিক্ষার্থী ডা. মো. রাহাত বলেন, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের আমলে যারা ড্যাবের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন তারা কোনোভাবেই বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে জড়াননি। এ কারণে তাদের বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয়। এরপরও তারা মুখ বন্ধ করে নীরবে সব সহ্য করে গেছেন। কিন্তু তৎকালীন উপপরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান আওয়ামী লীগ সমর্থিত চিকিৎসকদের সংগঠন স্বাচিপের সব বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন। যার প্রমাণ বিভিন্ন ছবির মাধ্যমে পাওয়া যায়। আমরা যারা হাসপাতালে তখন কর্মরত ছিলাম তারাও তার কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হয়ে আছি। এজন্য জুলাইবিরোধীকে স্বাস্থ্য পরিচালক বানিয়ে কোনোভাবেই জুলাইকে বিতর্কিত করা যাবে না। তাকে স্বাস্থ্য পরিচালকের পদ ছেড়ে দিতে বলা হয়েছে। তা না হলে আন্দোলনের মাধ্যমে বরিশাল ত্যাগে বাধ্য করা হবে।’
শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ড্যাবের সভাপতি ডা. নজরুল ইসলাম সেলিম বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ওই সময় আমরা অনেকেই এই হাসপাতালে কর্মরত ছিলাম। কিন্তু আমরা তো ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তাদের সঙ্গে স্রোতে গা ভাসিয়ে দিই নাই। এভাবে যদি প্রতিটি মানুষ তাদের বিরোধিতা করতাম তাহলে ১৭ বছর নয়, পাঁচ বছরের মধ্যেই ফ্যাসিস্ট সরকারকে হটানো সম্ভব ছিল। কিন্তু ডা. মনিরুজ্জামান ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকলেও তিনি ফ্যাসিস্ট সরকারের কর্মকাণ্ড সমর্থন করেছেন। যার বহু প্রমাণ আমাদের কাছে আছে। এজন্য তাকে কোনোভাবেই বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের পদে বসতে দেওয়া হবে না।’
অভিযোগ রয়েছে, ড্যাবের অভ্যন্তরীণ বিরোধে একটি পক্ষ ডা. মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। এ বিষয়ে ডা. নজরুল ইসলাম সেলিম বলেন, ‘আমাদের মধ্যে কোনও বিরোধ নেই। যারা ডা. মনিরুজ্জামানকে সাপোর্ট করছে তারাই এ ধরনের কথা বলছে। আমাদের সাফ কথা জুলাইকে বিতর্কিত করা যাবে না। তবে এ নিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকদের বৈঠক করার কথা আছে। সেই বৈঠকে মনিরুজ্জামানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হবে।’
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মনিরুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমি ছাত্রদলের রাজনীতি করতাম। ড্যাবের সঙ্গেও সম্পৃক্ত আছি। ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে তৎকালীন পরিচালকের নির্দেশে আমাকে বিভিন্ন কার্যক্রমে যেতে বাধ্য করা হয়। আবার অনেক কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে রাখার চেষ্টাও করেছি। কিন্তু আমি ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর নই।’
ডা. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘এর আগে মঙ্গলবার অফিসের সামনে এসে ওসব চিকিৎসক বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দিয়ে অফিস কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে চলে যান। আজ আবার আমার অফিস কক্ষে এসে নানা ধরনের অভিযোগ তোলে আমাকে অবরুদ্ধ করেছেন। বিষয়টি নিয়ে সিনিয়র চিকিৎসকরা বসবেন। সেখানে আলোচনা হবে।’
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন উপপরিচালক ডা. মনিরুজ্জামানকে সাতক্ষীরা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে বদলি করা হয়। গত ৫ জুলাই তাকে পদোন্নতি দিয়ে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক পদে পদায়ন করা হয়। এরপরই তার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করেন শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক এবং ড্যাবের নেতারা।