দেশের ইতিহাসে এক অভিযানে সর্বোচ্চ ৬৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা জব্দ করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। একই সঙ্গে অনলাইনে ফেসবুকের মাধ্যমে সারা দেশে সিসা সরবরাহকারী একটি সংঘবদ্ধ চক্রের মূলহোতা দুই সহোদরসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকালে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
রাজধানীতে পৃথক চারটি স্থানে সমন্বিত বিশেষ অভিযান চালিয়ে উদ্ধার করা হয়েছে ৪১টি হুক্কা, ৪০ কেজি সিসা সেবনের কয়লা এবং মাদক কারবারে ব্যবহৃত পাঁচটি মোবাইল ফোন। ডিএনসির দাবি, এটি দেশে এ পর্যন্ত একক অভিযানে উদ্ধার হওয়া সর্ববৃহৎ সিসার চালান।
সংবাদ সম্মেলন পরবর্তী এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, সরকারের ঘোষিত মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক মাদক কারবারের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয় জানতে পারে, আহমেদ শরীফি (৩৪) ও মেহদাদ শরীফি (৩৪) নামে দুই সহোদর একটি ফেসবুক পেজ পরিচালনার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় অবৈধ সিসা ও সিসা সেবনের উপকরণ বিক্রি করে আসছিলেন।
তথ্য যাচাই শেষে ডিএনসি ঢাকা বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. মেহেদী হাসানের নেতৃত্বে গত ২ জুলাই রাজধানীর ভাটারা এলাকার বসুন্ধরা থেকে একটি কুরিয়ার পার্সেলে থাকা এক কেজি সিসা জব্দ করা হয়। একই দিনে মালিবাগ থেকে একই ফেসবুক পেজের নামে পাঠানো আরও এক কেজি সিসাসহ দ্বিতীয় পার্সেলও জব্দ করা হয়।
পার্সেলের প্রেরকের ঠিকানা অনুসরণ করে অভিযানিক দল গুলশানের কালাচাঁদপুরে একটি ভাড়া বাসায় অভিযান চালিয়ে দুই সহোদরকে আটক করে। পরে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও বাসা তল্লাশিতে আরও ৪৫ কেজি ৯০০ গ্রাম সিসা এবং ২০টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
গ্রেপ্তার দুই ভাইয়ের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ওই রাতেই ভাটারার নূরেরচালা এলাকায় আরেকটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে মো. মাকসুদ আলম (৪০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার বাসা থেকে আরও ১৮ কেজি সিসা ও ২১টি হুক্কা উদ্ধার করা হয়।
ডিএনসির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া দুই সহোদর দীর্ঘদিন ইরানে অবস্থানকালে সিসা কারবারের কৌশল ও সরবরাহ ব্যবস্থা সম্পর্কে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তারা সেই মডেল অনুসরণ করে ফেসবুকভিত্তিক অনলাইন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন এবং কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় সিসা সরবরাহ করতেন।
চক্রটি বিভিন্ন মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে অর্থ গ্রহণ করতো। প্রকৃত লেনদেন গোপন রাখতে তারা বিভিন্ন ব্যক্তির নামে নিবন্ধিত একাধিক অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করেছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। বর্তমানে ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আর্থিক লেনদেন ও অর্থের উৎস অনুসন্ধান চলছে।
অভিযানে জব্দ করা মোবাইল ফোন, ডিজিটাল ডিভাইস ও অনলাইন অ্যাকাউন্ট থেকে বিপুল সংখ্যক গ্রাহকের তথ্য, অর্ডারের বিবরণ, যোগাযোগের ইতিহাস এবং লেনদেনসংক্রান্ত তথ্য উদ্ধার করেছে অধিদপ্তর। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে নিয়মিত ক্রেতা, পরিবেশক এবং চক্রটির অন্যান্য সদস্যকে শনাক্ত করার কাজ চলছে।
ডিএনসি আরও জানায়, প্রাথমিক তদন্তে অবৈধ সিসা বিক্রির পাশাপাশি চক্রটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে আরও বিভিন্ন অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার তথ্য মিলেছে। বিষয়গুলো যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, ই-কমার্স, কুরিয়ার সেবা ও মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস ব্যবহার করে পরিচালিত মাদক ব্যবসা দমনে সাইবার নজরদারি, আর্থিক গোয়েন্দা বিশ্লেষণ এবং আন্তঃসংস্থার সমন্বিত অভিযান আরও জোরদার করা হবে।