Image description

দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটে পড়েছে। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি খাত বেশ কয়েক বছর ধরে নানা সংকটে নিমজ্জিত। মন্দায় আক্রান্ত শিল্পে ঋণের চাহিদা তলানিতে নেমেছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭২, যা ইতিহাসের সর্বনি¤œ পর্যায়ে। বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমছে। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়ায় বিপর্যস্ত দেশের শ্রমবাজার পরিস্থিতি। জনশক্তি রফতানি ইস্যুতে মালয়েশিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান প্রতিদিনই কমছে, যা আগামী দিনে দেশে বৈদেশিক মুদ্রার সংকটকে আরো ঘনীভূত করবে। কারণ শ্রমিকরা বিদেশে যেতে না পারলে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা আসার অংক ধীরে ধীরে কমে যাবে।

যদিও সদ্য শেষ হওয়া জুন মাসে মধ্যপ্রাচ্যের ধাক্কায় রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা কমেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, জুন ২০২৬-এ দেশে এসেছে দুই দশমিক ৮০৬ বিলিয়ন ডলার, যা আগের বছরের একই মাসের দুই দশমিক ৮২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ কম। এদিকে রফতানি আয়ে পতনের ধারা নিয়েই শেষ হলো বিদায়ী অর্থবছর। কাটায় কাটায় ৪৮ বিলিয়ন বা চার হাজার আট কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে, যা আগের ২০২৪-২৫ অর্থবছরের চেয়ে ২০ কোটি ডলার এবং শূন্য দশমিক ৫৮ শতাংশ কম। এছাড়া সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ক্রমবর্ধমান রাজস্ব ঘাটতি ও সরকারি ব্যয় বৃদ্ধির কারণে সৃষ্ট বাজেট ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক খাত থেকে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা বেশি ঋণ নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে খেলাপি ঋণের পাহাড়ে চাপা পড়ে আছে দেশের অর্থনীতি। সম্প্রতি সংসদে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর দেয়া তথ্যমতে, খেলাপি ঋণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা, যা দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত বলছেন বিশেষজ্ঞরা। 

আর নানা ব্যবস্থা নিয়েও যেখানে যখন রফতানি-রেমিট্যান্স এবং বিদেশি বিনিয়োগে যখন উৎসাহিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে খেলাপি ঋণের উচ্চমাত্রা, দীর্ঘস্থায়ী জ্বালানিসংকট, উচ্চ সুদহার, বিনিময় হারের অস্থিরতা এবং বিনিয়োগবান্ধব নয় এমন করনীতি ব্যবসায়ীদের আস্থা কমিয়ে দিয়েছে। অবশ্য এর জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান মো. আব্দুর রহমান খানের অদক্ষতাকে দায়ী করেছেন অনেকেই। সম্প্রতি অবশ্য বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ-বিডা দেশের অভ্যন্তরীণ বা দেশীয় বিনিয়োগকারীদের সুরক্ষায় এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে বিশেষ অগ্রাধিকার দেয়ার কথা জানিয়েছে। অথচ দেশে অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ বাড়ানোর কার্যকর পদক্ষেপ নেই বললেই চলে। এমনকি অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় উৎস আবাসন খাত। জাতীয় বাজেটে আবাসন খাত উপেক্ষিত থাকায় সামগ্রিক অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। 

নতুন বাজেটে আবাসন খাতে অপ্রদর্শিত অর্থ বা কালোটাকা বিনিয়োগের সুযোগ বাতিল এবং জমির উন্নয়ন চুক্তিতে নতুন করে ১৫ শতাংশ মূলধনী মুনাফা (ক্যাপিটাল গেইনস ট্যাক্স) আরোপ করা হয়েছে, যা দীর্ঘদিন থেকে বিপর্যস্ত অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ প্রবাহকে আরো শ্লথ করে দিবে বলে আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের। আবাসন খাতের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে প্রায় দুই কোটি মানুষ জড়িত। সরাসরি জড়িত প্রায় অর্ধকোটি মানুষ। এই খাত আরো স্থবির হলে এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট তিন শতাধিক ব্যাকওয়ার্ড লিঙ্কেজ বা সহযোগী শিল্প আরো বিপর্যস্ত হয়ে পড়বে। সব মিলিয়ে আবাসন শিল্পের ৪৫৮ উপখাত ঝুঁকিতে রয়েছে। বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে এ খাতের জুড়ি নেই। মূলধনের সঞ্চালন ঘটিয়ে বিশ্বজুড়ে এটি মোট দেশজ উৎপাদনে-জিডিপি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। দেশের জিডিপিতে প্রায় ১৫ শতাংশ অবদান রাখা এই খাতের সংকট বাড়লে অর্থনীতিকেই বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও সরকারি নীতি-সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে এই খাত দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য ব্যাপক নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। তাই অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের অন্যতম নাম আবাসন খাতে এখনই বিশেষ ব্যবস্থা না নিলে আগামী দিনে দেশের কর্মসংস্থানে বড় একটি প্রভাব পড়বে বলে মত বিশেষজ্ঞদের।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের-বিআইডিএস সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তিই হলো বেসরকারি খাত। এর মধ্যে আবাসন খাত অন্যতম। এই খাত রুগ্ন হয়ে পড়লে বা মন্দায় আক্রান্ত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি থমকে যেতে বাধ্য। একই সঙ্গে দেশি বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনীতি চাঙ্গার অন্যতম খাত আবাসন খাত চাঙ্গা করাও সরকারের দায়িত্ব।

অবশ্য আবাসন খাত সংশ্লিষ্টরা দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে চাঙ্গা করতে এই খাতে বিশেষ নজর দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাব। অর্থনীতিতে গতি আনতে আবাসন খাতকে সম্পূর্ণ করমুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন অর্থনৈতিক সাংবাদিকদের সংগঠন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের-ইআরআফ সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম। তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ কর্মসংস্থানে সবচেয়ে বড় খাত আবাসন। এই খাতটি চাঙ্গা হলে এর সঙ্গে যুক্ত তিন হাজার ৬০০টি লিঙ্কেজ শিল্প সচল হবে। তিনি বলেন, শুধু সিমেন্ট খাতের উৎপাদন ক্ষমতা ৮০ শতাংশে উন্নীত করেই বছরে অতিরিক্ত দুই হাজার ৫০০ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় সম্ভব। আমিন মোহাম্মদ ফাউন্ডেশন লিমিটেডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর (অপারেশন) মোহাম্মদ তানভীরুল ইসলাম বলেন, আবাসন খাতের জন্য একটি একীভূত নীতি, স্বচ্ছতা, পেশাদার ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তিনির্ভর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা গেলে আগামীতে এই খাত বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আরো বড় অবদান রাখবে। একই সঙ্গে এ খাত দক্ষ পেশাজীবীদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করবে। দেশে কর্মসংস্থান নিশ্চিতে এই খাতের উন্নয়নে নীতি-নির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে বন্ধ শিল্পকারখানা চালুর ইতিবাচক পদক্ষেপ সরকার হাতে নিলেও রফতানি আয়ের প্রধান মাধ্যম পোশাক খাতে মন্দা বাজার পরিস্থিতি ও কার্যাদেশ না থাকায় বিদ্যমান শিল্পকারখানা প্রতিদিন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। শিল্প-পুলিশ ও উদ্যোক্তা সংগঠনগুলোর মতে, গত দুই বছরে পাঁচ শতাধিক শিল্পকারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। কারখানাগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং সে কারণে উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। এমন পরিস্থিতিতে আরো অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা বলছেন, কারখানা বন্ধের কারণে বহু শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন। শুধু পোশাক খাতেই কাজ হারিয়েছেন দেড় লাখ শ্রমিক। অন্যান্য খাত হিসাবে নিলে এ সংখ্যা অনেক বড় হবে। শিল্পকারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাবে রফতানি আয়ও কমছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পণ্য রফতানি আগের অর্থছরের চেয়ে এক শতাংশের মতো কমেছে। আর রফতানি আয় কমেছে আগের বছরের তুলনায় এক দশমিক ৬৪ শতাংশ। পাশাপাশি এই সময়ে নতুন রফতানি আদেশ কমেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হালনাগাদ উপাত্ত বলছে, গত অর্থবছরে মোট দেশজ উৎপাদনে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি মাত্র দুই দশমিক ৮৬ শতাংশে নেমে এসেছে। যে কারণে বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে দ্বিতীয় স্থান হারানোর শঙ্কায় পড়েছে বাংলাদেশ।

বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) ওয়ার্ল্ড ট্রেড স্ট্যাটিস্টিকস ২০২৫ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল দ্বিতীয়। ওই বছর বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ছিল প্রায় ৩৯ বিলিয়ন ডলার, যেখানে তৃতীয় অবস্থানে থাকা ভিয়েতনামের রফতানি ছিল ৩৮ বিলিয়ন ডলার। কিন্তু এরপর থেকে রফতানির এ চিত্র বদলাতে শুরু করেছে। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৭০ বিলিয়ন ডলারে। অন্যদিকে ভিয়েতনাম টেক্সটাইল অ্যান্ড অ্যাপারেল অ্যাসোসিয়েশনের-ভিআইটিএএস তথ্য অনুযায়ী, দেশটির পোশাক ও টেক্সটাইল রফতানি এরই মধ্যে ৪৪ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং চলতি বছরে ৪৭ থেকে ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে দেশটির। একই সময়ে ভারত, কম্বোডিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও পাকিস্তানও বৈশ্বিক বাজারে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করছে। ফলে বৈশ্বিক পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের দ্বিতীয় অবস্থান ধরে রাখা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে খাত সংশ্লিষ্টদের মধ্যে।

ইন্ডাস্ট্রিআল গ্লোবাল ইউনিয়ন ট্রেড ইউনিয়নের একটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। ১৩০টি দেশে তাদের কার্যক্রম রয়েছে। প্ল্যাটফর্মটির বাংলাদেশ কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক বাবুল আখতার মনে করেন, দুই বছরে বন্ধ কারখানার প্রকৃত সংখ্যা ৫০০ নয়, এর দ্বিগুণ হবে। তার দাবি, গত দুই বছরে শুধু পোশাক খাতেই দেড় লাখ শ্রমিক কাজ হারিয়েছেন।

উদ্যোক্তা ও শ্রমিক নেতারা জানিয়েছেন, কারখানা বন্ধের প্রধান কারণ গ্যাস-বিদ্যুতের অভাব এবং উৎপাদন সক্ষমতা কমে আসা। কিছু কারখানার ক্ষেত্রে ব্যবস্থাপনা দুর্বলতা ও সময়মতো শিপমেন্ট করতে না পারা বন্ধ হওয়ার কারণ। আন্তর্জাতিক কারণের মধ্যে রয়েছে গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলাকে কেন্দ্র করে জ্বালানিসহ বিশ্ববাজারে অস্থিরতা; রাশিয়া, ইউক্রেনের যুদ্ধের অভিঘাত, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক আরোপ এবং এর জেরে বিশ্ববাণিজ্যের ওলট-পালট পরিস্থিতি ও বিশ্ববাজারে নি¤œমুখী চাহিদা।
রাজনৈতিক পরিবর্তনে অনেক প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়েছে। যাও দেশের অর্থনীতির জন্য অশনিসংকেত। সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো ব্যক্তির দায়ে যাতে কোনো প্রতিষ্ঠানকে বন্ধ করা না হয়। এর আগে যেগুলো বন্ধ হয়েছে তা খোলার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় এনে কঠোর ব্যবস্থা নিবে। কিন্তু কোনো কারখানা বন্ধ করা যাবে না।

পোশাক খাতের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর উপাত্ত বলছে, দুই বছরে তাদেরই ২২১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এর মধ্যে গত বছর সর্বাধিক ১৪১টি কারখানা বন্ধ হয়েছে। আগের বছর ২০২৪ সালে বন্ধ হয় ৭৭টি কারখানা। ঢাকা ও চট্টগ্রাম জোন মিলে বিজিএমইএর সদস্য কারখানা এখন দুই হাজার ১২৭টি। বিজিএমইএ সভাপতি মাহমুদ হাসান খান বলেছেন, বন্ধ হওয়া দুই শতাধিক কারখানার বাইরে আরো দুই শতাধিক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে রয়েছে। কারখানাগুলো এখন আংশিক সচল। যেকোনো সময় এগুলো বন্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই দ্রুতই সরকারকে এ বিষয়ে ঋণ-সহায়তাসহ প্রণোদনার ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনে রফতানি খাতে সংকট আরো বাড়বে। বিজিএমইএ সভাপতি বলেন, যদি আমাকে ৫০০ বার প্রশ্ন করেন, শিল্পের জন্য কী চান? প্রতিবারই আমি বলব নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ। গ্যাস-বিদ্যুৎ পাওয়া না গেলে ঋণ-সহায়তা দিয়েও শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না।

অপরদিকে দেশের টেক্সটাইল শিল্পের সংগঠন বিটিএমএ সূত্রে জানা গেছে, সংগঠনের সদস্য ২৩৪টি কারখানা বন্ধ রয়েছে। অবশ্য এই হিসাব ২০১৯ সাল থেকে গতকাল পর্যন্ত। বিটিএমএ সূত্র জানিয়েছে, কারখানা বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি এক হাজার ১২১ কারখানায় আংশিক উৎপাদনে রয়েছে। সক্ষমতার প্রায় অর্ধেক উৎপাদন হচ্ছে কারখানাগুলোতে। বিজিএমইএ এই মুহূর্তে আংশিক সচল কারখানার সংখ্যা এক হাজার ৩২১টি। আংশিক চালু কারখানাগুলোর অধিকাংশই বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে আছে।

এদিকে গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট ভোগাচ্ছে শিল্প-কারখানাগুলোকে। গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া ও চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলে জ্বালানি সরবরাহ আগের চেয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমেছে। চাহিদার তুলনায় সাভার ও আশুলিয়ার পল্লীবিদ্যুৎ সমিতিগুলোর সরবরাহ প্রায় ৪০ শতাংশ কম। ফলে লোডশেডিংয়ের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ না থাকলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে জেনারেটর চালাতে হয়। সে ক্ষেত্রেও গ্যাস ও ডিজেল চাহিদামতো না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি দাম বৃদ্ধির কারণে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। এ ছাড়া নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় অনেক কারখানা উৎপাদনে যেতে পারছে না।

এদিকে গ্যাস সংকটে বাংলাদেশের শিল্প থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন কার্যক্রম যেখানে ব্যাহত হচ্ছে। সেখানে চীন স্পষ্টভাবে দাবি করেছে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন করে আসছে। বঙ্গোপসাগরে তির্যক ড্রিলিংয়ের মাধ্যমে ট্রিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করেছে ভারত। চীনের দাবি, ড্রিলিং ভারতের ভূখ-ের ভেতর থেকে করা হলেও গ্যাস টানা হয়েছে বাংলাদেশের অংশ থেকে। অবশ্য এই সম্পদ চুরি ঠেকাতে বাংলাদেশ ও চীন এখন গভীর সমুদ্রের অফশোর এলাকায় গ্যাস উত্তোলনের জন্য একটি চুক্তি করেছে। এটি ঠেকাতে পারলে বাংলাদেশ তার নিজস্ব বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ কাজে লাগাতে পারবে এবং গ্যাস আমদানি কমিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় করতে সক্ষম হবে, যা আগামী দিনে শিল্প-কারখানাতেও ব্যবহার করা যাবে।

শিল্প-কারখানা বন্ধ হওয়া দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের অভিঘাত বলছেন অর্থনীতিবিদরা। গবেষণা সংস্থা সিপিডির সম্মানীয় ফেলো প্রফেসর ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, এত শিল্প-কারখানা বন্ধ থাকা এবং আরো বড় সংখ্যক কারখানা বন্ধের ঝুঁকিতে থাকা দেশের সার্বিক অর্থনীতির জন্য অনেক বড় অভিঘাত। বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তিনি দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে উৎসাহিত করার তাগিদ দেন। 
অবশ্য একাধিক বিশেষজ্ঞের মতে, চাইলেই সরকার রাতারাতি রফতানি আয়, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ানো বা বৈদেশিক বিনিয়োগ টানতে পারবে না। তাই দেশের অর্থনীতিকে গতিশীল করতে অবশ্যই দেশের অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগকে ব্যাপকভাবে উৎসাহ দিতে হবে। আর অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগের সবচেয়ে বড় খাত আবাসন খাতে বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত প্রায় ৩০০টি প্রতিষ্ঠান এবং দুই কোটি জনসংখ্যা।