Image description

আঙুর বিদেশি ফল, দেশের আবহাওয়া ও মাটি এর চাষের উপযোগী নয়—তাই বাজারের প্রায় সব আঙুরই আমদানিনির্ভর। দেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই প্রচলিত ধারণাকে এবার বড়সড় চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন কুমিল্লার এক প্রান্তিক কৃষক। ভারত সীমান্তবর্তী গ্রামে তার হাত ধরেই বোনা হয়েছে আঙুর চাষের এক নতুন স্বপ্ন।

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার ভারতীয় সীমান্তঘেঁষা শরিফপুর গ্রামের কৃষক আক্তারুজ্জামান সেকুল। তার বাগানে এখন থোকায় থোকায় ঝুলছে লাল ও কালো রঙের আঙুর। শুরুতে অনেকেই তার এই উদ্যোগ নিয়ে সংশয় প্রকাশ করলেও আজ সেকুলের এই অভাবনীয় সাফল্য স্থানীয় কৃষকদের মাঝে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে।

এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে সুদূরপ্রসারী প্রস্তুতি। আঙুর উৎপাদনের আধুনিক প্রযুক্তি সম্পর্কে জানতে সেকুল প্রথমে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। সেখান থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে নিজ গ্রামের ৮২ শতক জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে গড়ে তোলেন আঙুরের বাগান। সেকুল জানান, তার বাগানে তিনি ‘বাইনুকুর’, ‘রাশিয়ান ভ্যারাইটি’ এবং তুরস্কের জনপ্রিয় ‘সিডলেস ভ্যারাইটি’সহ তিন ধরনের উন্নত জাতের চারা রোপণ করেন।

বাগান শুরুর পর থেমে থাকেননি তিনি। নিয়মিত পরিচর্যা, সঠিক ছাঁটাই, সেচ ও রোগবালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গাছগুলোকে নিবিড়ভাবে বড় করে তোলেন। পরিশ্রমের ফল মিলতেও বেশি সময় লাগেনি। চারা রোপণের মাত্র ১০ মাসের মাথায় গাছে ফল ধরতে শুরু করে; শত শত থোকা আঙুরে ভরে যায় পুরো বাগান। তবে প্রথম বছরেই বেশি ফলন তুলে নেওয়ার লোভ করেননি সেকুল। গাছের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যের কথা বিবেচনা করে তিনি অনেক কুঁড়ি ও ফলের থোকা ছেঁটে ফেলেন। বর্তমানে গাছগুলোতে প্রায় ২০০টি থোকা রাখা হয়েছে, যার প্রতিটির গড় ওজন প্রায় আধা কেজি। সেই হিসাবে বাগানে এখন প্রায় ১০০ কেজি আঙুর রয়েছে।

সীমান্তবর্তী এলাকায় আঙুরবাগানের এই খবর ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে কৌতূহলী মানুষ বাগানটি দেখার জন্য ভিড় করছেন। এই দৃশ্য দেখে স্থানীয় অন্য কৃষকদের মধ্যেও বাগানটি নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কেউ কেউ তো নিজের জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে চারা লাগানোর প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছেন।

কৃষি উদ্যোক্তাদের মতে, দেশে সরকারি সহযোগিতাসহ বাণিজ্যিকভাবে আঙুর চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকদের জন্য এটি বাড়তি আয়ের একটি চমৎকার উৎস হয়ে উঠবে। পাশাপাশি বিদেশি ফল আমদানির ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমবে, যা দেশের অর্থনীতিতেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।

কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ কে এম আরিফুজ্জামান রহমান বললেন, 'আমরা শুরু থেকেই আক্তারুজ্জামান সেকুলের বাগানটি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি এবং প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছি। এবারের ফলনের অবস্থা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।'

তিনি জানান, কুমিল্লার সীমান্তবর্তী এলাকার মাটি ও জলবায়ু আঙুর চাষের জন্য বেশ সম্ভাবনাময়। বিশেষ করে উঁচু জমি ও টিলাভূমিতে এই ফসলের দারুণ ভবিষ্যৎ রয়েছে। আগ্রহী কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সব ধরনের সহায়তা দিতে কৃষি বিভাগ সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছে।