Image description

দীর্ঘ ১৩ মাসের কারাজীবনের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে মুক্ত বাতাসে ফিরেছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তবে কারামুক্তির পর প্রথম দিনেই রাজনীতির ময়দানে সক্রিয় হওয়ার কোনো তাড়াহুড়া দেখা যায়নি তার মধ্যে। বরং আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল জেলজীবনের অভিজ্ঞতা, ইবাদত-বন্দেগি, আধ্যাত্মিক চর্চা এবং মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় দিবস গাদিরে খুমের তাৎপর্য।

বুধবার রাত সোয়া ১০টায় গাজীপুরের কাশিমপুর কেন্দ্রীয় মহিলা কারাগার থেকে জামিনে মুক্তি পান আইভী। পরে রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার পারিবারিক বাসভবন ‘চুনকা কুটিরে’ পৌঁছান তিনি। গভীর রাতেও বাসার সামনে ভিড় করেন তার শুভাকাঙ্ক্ষী, অনুসারী ও সমর্থকরা। নিরাপত্তার স্বার্থে ওই সময় পুলিশ সদস্যদেরও সেখানে অবস্থান করতে দেখা যায়। মুক্তির পর গণমাধ্যমের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলাপে জামিন প্রাপ্তির সুযোগ করে দেওয়ায় বর্তমান সরকারের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আইভী।

মুক্তির পরদিন গতকাল বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই চুনকা কুটিরকে ঘিরে শুরু হয় মানুষের আনাগোনা। আত্মীয়স্বজন, পুরোনো সহকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী, শুভাকাঙ্ক্ষী এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ তাকে দেখতে ও শুভেচ্ছা জানাতে আসেন। কিন্তু সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা রাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলো যেন সচেতনভাবেই এড়িয়ে যান তিনি।

এদিকে আইভীর বাড়ির সামনে নজরদারি বাড়িয়েছে পুলিশ। স্থাপন করা হয়েছে আধুনিক ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরাও। সাদা পোশাকে পুলিশের টহলও রয়েছে সেখানে। জেলা পুলিশ বলছে, তিনবারের সাবেক এ সিটি মেয়রের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা এবং তিনি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কোনো দলীয় কর্মসূচিতে অংশ নেন কি না সে বিষয়ে খোঁজখবর রাখতেই এ অতিরিক্ত নজরদারি।

আইভীর ঘনিষ্ঠজন ও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা একাধিক ব্যক্তির ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ ১৩ মাসের বন্দিজীবন তাকে ভেতর থেকে অনেকটাই বদলে দিয়েছে। তিনি নিজেকে আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্যে নিমগ্ন রেখেছিলেন। নিয়মিত নামাজ, দোয়া, দরুদ শরিফ পাঠ এবং ধর্মীয় অনুশীলনের মাধ্যমে সময় কাটিয়েছেন। কারাগারের দিনগুলোকে তিনি শুধু বন্দিত্ব নয়, আত্মশুদ্ধির এক বিশেষ সময় হিসেবেও দেখেছেন।

সাক্ষাৎ পাওয়া ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়, আইভী প্রায়ই বলতেন—মেয়র হিসেবে কর্মব্যস্ত জীবনে যে পরিমাণ

ইবাদত-বন্দেগির সুযোগ তিনি পাননি, কারাগারে সেই সুযোগ পেয়েছেন অনেক বেশি। ব্যস্ত রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক জীবনের বাইরে গিয়ে তিনি নিজের আত্মিক জগৎকে নতুনভাবে আবিষ্কার করার সুযোগ পেয়েছেন বলেও মনে করেন।

কাশিমপুর মহিলা কারাগারে আওয়ামী লীগের কয়েকজন নারীনেত্রীসহ মোট ১৩ জন একসঙ্গে ছিলেন। তাদের সঙ্গে ধর্মীয় আলোচনা, স্মৃতিচারণ, পারস্পরিক সহমর্মিতা ও বিভিন্ন বিষয়ে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই সময় কেটেছে। একই কারাগারে থাকা সাবেক সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম বিভিন্ন সময় গান শুনিয়ে বন্দিদের সময় কাটাতে সাহায্য করতেন বলেও জানা গেছে।

তবে কারাজীবনের সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি ছিল গাদিরে খুমকে ঘিরে আইভীর ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও প্রার্থনা। তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করা কয়েকজনের দাবি, বন্দি অবস্থায় আইভী সবসময় একটি বিশেষ দোয়া করতেন। তার বিশ্বাস ছিল, গাদিরে খুমের দিনটি তার জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করবে। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, গাদিরে খুমে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) হজরত আলী (রা.)-এর মাথায় হাত রেখে বিশেষ দোয়া করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক স্মৃতিবিজড়িত দিনটি ঘিরেই মুক্তির জন্য প্রার্থনা করতেন আইভী।

এ বছর গাদিরে খুম পালিত হয় বলে গতকাল আইভী তার ঘনিষ্ঠজনদের জানিয়েছেন, তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলেন যেন এই দিনটিকে ঘিরেই তার মুক্তি হয়। শেষ পর্যন্ত গাদিরে খুমের আগের রাতেই তিনি কারামুক্ত হন। বিষয়টিকে তিনি নিজের দোয়া কবুল হওয়ার একটি নিদর্শন হিসেবে দেখছেন বলেও জানিয়েছেন ঘনিষ্ঠজনদের।

গতকাল বিকেল ৪টায় গাদিরে খুম উপলক্ষে আয়োজিত একটি ধর্মীয় আলোচনা ও স্মরণসভায় অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিয়েছিলেন আইভী। এ উপলক্ষে নিজের তরিকার ভাইবোনদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় আলোচনা করেন। দিনভর গাদিরে খুমের ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় তাৎপর্য নিয়েই ব্যস্ত ছিলেন। এমনকি অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগে কাশিমপুর কারাগার থেকে মুক্তির সময় পরা শাড়িটিও দুপুরের পর পরিবর্তন করেন।

এদিকে সকাল থেকেই দেওভোগের চুনকা কুটিরে ছিল এক ভিন্ন চিত্র। বাড়ির গেটের সামনে দু-একজন করে অপেক্ষা করছিলেন দর্শনার্থীরা। ভেতরে থাকা প্রহরী আগতদের পরিচয় জানিয়ে অনুমতি সাপেক্ষে প্রবেশের ব্যবস্থা করছিলেন। অনুমতি না পেলে অনেককেই ফিরে যেতে হয়েছে।

দুপুর ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে বাড়ির ভেতর থেকে চারজনকে বের হতে দেখা যায়। তাদের হাতে ছিল ফুল, মিষ্টির প্যাকেট, পলিথিনে দুধ ও আম। তবে এসব উপহার আইভী গ্রহণ করেননি বলে জানা গেছে।

দিনভর বাসায় উপস্থিত ছিলেন আইভীর ভগ্নিপতি আবদুল কাদির, সাবেক কাউন্সিলর মনিরুজ্জামান মনিরসহ পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজন। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শুভাকাঙ্ক্ষীদের সঙ্গে তিনি কুশল বিনিময় করেন। তবে রাজনৈতিক আলোচনা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন।

তার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া একাধিক ব্যক্তি জানান, আইভী স্পষ্টভাবে বলেছেন—এ মুহূর্তে তিনি কোনো রাজনৈতিক বিষয়ে কথা বলতে চান না। মামলা, দলীয় রাজনীতি কিংবা ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা না করার জন্যও অনুরোধ করেছেন। বরং তিনি জেলজীবনের অভিজ্ঞতা, ইবাদত-বন্দেগি, দরুদ শরিফ পাঠ এবং আধ্যাত্মিক উপলব্ধির বিষয়গুলো নিয়েই বেশি কথা বলেছেন।

আইভীর বাসার বিপরীতে অবস্থিত এক মুদি দোকানি দাবি করেন, আইভীর জামিনের পর পুলিশ তার বাড়ির সামনে অবস্থান নেয় এবং রাত ১১টার মধ্যে আশপাশের দোকানপাট বন্ধ করে দেওয়া হয়। রাস্তায় অবস্থানরত লোকজনকেও সরে যেতে বলা হয়।

তবে এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপার মিজানুর রহমান মুন্সী ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আইভীর পরিস্থিতি নিয়ে জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। তার বাড়ির সামনে কোনো বাহিনী মোতায়েন নেই। তবে আমরা সচেতন রয়েছি এবং পরিস্থিতির ওপর নজরদারি রাখছি। সবকিছু স্বাভাবিক রয়েছে।’

সব মিলিয়ে কারামুক্তির পর প্রথম দিনটিতে আইভীর মধ্যে দেখা যায়নি কোনো রাজনৈতিক তৎপরতা বা ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ততা। বরং দীর্ঘ বন্দিজীবনের স্মৃতিচারণ, আত্মসমালোচনা, আধ্যাত্মিক চর্চা এবং শুভাকাঙ্ক্ষীদের ভালোবাসা গ্রহণের মধ্য দিয়েই কাটিয়েছেন দিনটি।

উল্লেখ্য, সেলিনা হায়াৎ আইভী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সাবেক জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। ২০২৫ সালের ৯ মে ভোরে নারায়ণগঞ্জের বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পরে ২০২৪ সালের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময়ের তিনটি হত্যা মামলা, দুটি হত্যাচেষ্টা মামলাসহ মোট ১২টি মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। কয়েকটি মামলায় জামিন পেলেও পরবর্তী সময়ে নতুন মামলায় ফের গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সর্বশেষ গত ৩০ এপ্রিল সিদ্ধিরগঞ্জ থানার দুটি হত্যা মামলায় হাইকোর্ট থেকে অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পাওয়ার পর তার মুক্তির পথ সুগম হয়।

২০০৩ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সেলিনা হায়াৎ আইভী। পরে নবগঠিত নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের টানা তিনটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে দেশের অন্যতম আলোচিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।