Image description

বাংলার ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও আভিজাত্যের প্রতীক রাজশাহীর সিল্ক। একসময় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে ছিল আস্থা, সৌন্দর্য ও গর্বের নাম ছিল রাজশাহী সিল্কের। দেশি-বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও এই সিল্কের আলাদা কদর ছিল। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই ঐতিহ্যবাহী শিল্প এখন চরম সংকটের মুখে। দেশীয় রেশম সুতা উৎপাদন কমে যাওয়ায় পুরো শিল্প এখন বিদেশি সুতার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করলেও কাঙ্ক্ষিত উদ্দেশ্য পূরণ হয়নি। ফলে ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে দেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের জৌলুস।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে দেশে রেশম সুতার বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪০০ টন। অথচ দেশে উৎপাদিত হচ্ছে মাত্র ৪০ টনের মতো। ফলে মোট চাহিদার মাত্র ১০ শতাংশ পূরণ হচ্ছে দেশীয় উৎপাদনে। বাকি বৃহৎ চাহিদা পূরণে নির্ভর করতে হচ্ছে বিদেশ থেকে আমদানি করা সুতার ওপর। বিশেষ করে চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে সুতা আমদানি করে স্থানীয় কারখানাগুলোতে কাপড় উৎপাদন করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত এক দশকে রেশম শিল্প উন্নয়নের নামে শত কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও বাস্তবে বাড়েনি তুঁত চাষ কিংবা সুতার উৎপাদন। বরং প্রতিবছরই কমছে দেশীয় সুতার পরিমাণ। এতে বিদেশি আমদানির ওপর নির্ভরতা আরও বেড়ে গেছে। ফলে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোক্তারাও আর্থিক চাপে পড়ছেন।

অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহী সিল্ক, ভরসা এখন বিদেশি সুতাচরকায় ঘুরানো হচ্ছে সিল্ক সুতা/ ছবি: জাগো নিউজ

 

রাজশাহী শহরের বিভিন্ন সিল্ক শোরুম ঘুরে দেখা গেছে, শুধুমাত্র রেশম পণ্য বিক্রি করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা এখন কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই অনেক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে সিল্কের পাশাপাশি শিশুদের খেলনা, জুতা-স্যান্ডেল, বিছানার চাদর, কসমেটিকসসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য বিক্রি করছেন।

‘দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় গণউৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে উৎপাদিত গুটি কোথায় ব্যবহার হবে এবং কীভাবে বাজারজাত হবে, সেই অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর রেশম শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে’

ব্যবসায়ীরা বলছেন, একসময় শুধুমাত্র সিল্ক পণ্য বিক্রি করেই ভালোভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা সম্ভব হতো। দেশজুড়ে রাজশাহী সিল্কের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ক্রেতাদের ভিড় লেগেই থাকত শোরুমগুলোতে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র বদলে গেছে। দেশীয় সুতার সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে তুলনামূলক কম দামের বিকল্প কাপড়ের আধিপত্যের কারণে আগের মতো সিল্ক পণ্যের বিক্রি হচ্ছে না। ফলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে বাধ্য হয়ে অনেক উদ্যোক্তাকেই বিকল্প পণ্যের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে।

সিল্কের শোরুমে মার্কেট করতে আসা আফরোজা বেগম বলেন, রাজশাহীর নাম শুনলেই আগে সিল্কের কথা মনে হতো। সিল্ক কাপড় খুবই পছন্দের। কিন্তু এখন সিল্কের দোকানেও নানা ধরনের ভিন্ন পণ্য দেখা যায়। মনে হয় শুধু সিল্ক বিক্রি করে তারা আর টিকে থাকতে পারছে না। এই শিল্পকে বাঁচাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

 

রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী একটি সিল্ক প্রতিষ্ঠান হলো আমেনা সিল্ক। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক পরিচালক শরীফ হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, দেশে যে পরিমাণ সুতার চাহিদা রয়েছে তার খুব অল্পই দেশে উৎপাদন হয়। ফলে বিদেশ থেকে সুতা আমদানি করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন খরচ অনেক বেড়ে যাচ্ছে।

অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহী সিল্ক, ভরসা এখন বিদেশি সুতারেশম সুতা থৈরি জন্য চাষ করা হয় পোকা/ ছবি: জাগো নিউজ

তিনি বলেন, সারাদেশেই সিল্ক পণ্যের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু সেই অনুযায়ী উৎপাদন হচ্ছে না। বিদেশ থেকে যেসব সুতা আনতে হচ্ছে, সেগুলো যদি দেশে উৎপাদন করা যেত, তাহলে শিল্পটি আরও শক্তিশালী অবস্থানে যেতে পারত। ক্রেতাদের কাছে এখনো সিল্কের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সুতা সংকটের কারণে আমরা চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছি না।

‌‘রাজশাহীর নাম শুনলেই আগে সিল্কের কথা মনে হতো। কিন্তু এখন সিল্কের দোকানেও ভিন্ন পণ্য দেখা যায়। মনে হয় শুধু সিল্ক বিক্রি করে আর টিকে থাকতে পারছে না। এই শিল্পকে বাঁচাতে পরিকল্পিত উদ্যোগ প্রয়োজন’

রাজশাহী সপুরা সিল্কের ব্যবস্থাপক পরিচালক সাইদুর রহমান জাগো নিউজকে বলেন, রাজশাহী সিল্কের বাজার এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিশেষ করে সৌখিন ও অভিজাত ক্রেতাদের কাছে সিল্কের আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু চাহিদা পূরণে বিদেশি সুতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।

তিনি বলেন, বর্তমানে বাজারের অধিকাংশ রেশম পণ্য চীন থেকে আমদানি করা সুতা দিয়ে তৈরি হচ্ছে। দেশীয় সুতার সরবরাহ কম থাকায় উৎপাদনও সীমিত হয়ে পড়েছে।

তিনি আরও বলেন, রাজশাহীর সিল্ক বাংলাদেশের মানুষের গর্বের একটি পণ্য। আমরা সিল্কের শাড়ি, থ্রিপিসসহ বিভিন্ন ধরনের পণ্য তৈরি করি। সবসময় চেষ্টা করি ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে পণ্য রাখতে। দেশে যদি সুতার উৎপাদন বাড়ানো যায়, তাহলে রাজশাহী সিল্ক আবারও আগের অবস্থানে ফিরতে পারবে।

রেশমখাতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে জানিয়ে বাংলাদেশ রেশম শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, দেশীয় সুতা উৎপাদন না বাড়ালে এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। নিজেদের সুতা উৎপাদন ছাড়া এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব। এজন্য পরিকল্পিতভাবে রেশম চাষ সম্প্রসারণ করতে হবে। তুঁত চাষি ও পলু চাষিদের প্রণোদনা দিতে হবে। পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে।

তিনি আরও বলেন, দেশের প্রতিটি জেলায় উদ্যোক্তা তৈরি করে সুষ্ঠুভাবে রেশম চাষ ও সুতা উৎপাদনের ব্যবস্থা করা গেলে এই সংকট অনেকটাই কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তা, সহজ ঋণ এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।

‘রাজশাহী সিল্কের বাজার এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। বিশেষ করে সৌখিন ও অভিজাত ক্রেতাদের কাছে সিল্কের আলাদা কদর রয়েছে। কিন্তু চাহিদা পূরণে বিদেশি সুতার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে’

তবে বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ড বলছে, দীর্ঘ অবহেলার মধ্যেও তারা পলুপোকার ১১৪টি জাত সংরক্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে, যা এই শিল্পের জন্য বড় অর্জন। সংস্থাটির মতে, ভবিষ্যতে এই সংরক্ষিত জাতগুলো কাজে লাগিয়ে আবারও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব হবে।

অস্তিত্ব সংকটে রাজশাহী সিল্ক, ভরসা এখন বিদেশি সুতারেশম সুতার কারখানায় কাজ করছেন শ্রমিক/ ছবি: জাগো নিউজ

বাংলাদেশ রেশম উন্নয়ন বোর্ডের মহাপরিচালক তৌফিক আল মাহমুদ জাগো নিউজকে বলেন, দীর্ঘদিন কারখানা বন্ধ থাকায় গণউৎপাদনের সুযোগ তৈরি হয়নি। ফলে উৎপাদিত গুটি কোথায় ব্যবহার হবে এবং কীভাবে বাজারজাত হবে, সেই অনিশ্চয়তা থেকেই গেছে। তবে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনার পর রেশম শিল্পের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে।

দেশে মূলত তিন ধরণের সুতা ব্যবহার করা হয় জানিয়ে তিনি আরও বলেন, ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী সুতা সরবরাহ করতে গিয়ে অনেক সময় সমস্যায় পড়তে হয়। দেশে যেসব সুতা তৈরির মেশিন এসেছে, সেগুলোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন। প্রযুক্তিগত পরিবর্তন আনতে পারলে দেশের চাহিদা অনুযায়ী সুতা উৎপাদন করা সম্ভব হবে।

তিনি আরও বলেন, কারখানা বন্ধ থাকায় বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এছাড়া বড় পরিসরে উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাজার ও ক্রেতা সংকটও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ব্যবসায়ী বাইরে থেকে সুতা কিনে আনছেন, আর সংকট দেখা দিলে বোর্ডের কাছে আসছেন। পরিকল্পিতভাবে বরাদ্দ দিয়ে সুতা চাষ সম্প্রসারণ করা গেলে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হবে বলেও তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে একসময় রাজশাহী সিল্ক শুধু নামেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে। শত বছরের ঐতিহ্য হারিয়ে যাবে বিদেশি সুতার ভিড়ে। তাই এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, তুঁত ও পলু চাষে প্রণোদনা এবং দেশীয় সুতা উৎপাদনে কার্যকর পদক্ষেপ। তাহলেই হয়তো আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারবে রাজশাহীর ঐতিহ্যবাহী সিল্ক শিল্প।