এখন খবরের গতি আকাশছোঁয়া। দেশ-বিদেশের সব ঘটনা সারাক্ষণ মানুষের হাতের মুঠোয় ঘুরপাক খাচ্ছে। যখন অনলাইন পোর্টাল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা ২৪ ঘণ্টার টেলিভিশন ছিল না, তখন সাংবাদিকতার ধরনটা ছিল অন্যরকম। সারা দিনের ঘটনাগুলো আয়েশ করে জানার জন্য মানুষ ওত পেতে থাকত পরের দিন সকালের পত্রিকার পাতার ওপর। সেই সাংবাদিকতায় একটা ধীরস্থির ভাব ছিল, ছিল খবরের সত্যতা যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত সময়।
এখন অনলাইন সাংবাদিকতার যুগ। প্রযুক্তি বদলেছে, খবরের গতিও বদলেছে। কোনো ঘটনা ঘটার কয়েক মিনিটের মধ্যে তা মানুষের মোবাইলে পৌঁছে যাচ্ছে। ফলে সব সংবাদমাধ্যমের মধ্যে এখন এগিয়ে থাকার এক অন্ধ প্রতিযোগিতা। কে আগে ব্রেকিং দেবে, কার পোস্ট আগে ভাইরাল হবে, কার ওয়েবসাইটে কত বেশি ক্লিক পড়বে–সবাই মত্ত সেই নেশায়। কিন্তু এই সস্তা ইঁদুরদৌড়ে সবচেয়ে আগে ডাস্টবিনে গিয়ে পড়ছে তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি।
এখানে মূল লড়াইটা এখন আর খবরের গুণগত মান নিয়ে নয়, লড়াইটা হলো কে কার আগে সংবাদটি প্রকাশ করতে পারল। সেই তথ্য ভুল নাকি ঠিক, তা নিয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই। সবার আগে ভুল তথ্য দিয়ে হলেও ব্রেকিং নিউজ দিতে হবে, এটাই যেন মূল লক্ষ্য। অনেকে তো খবরের ভেতরে কোনো তথ্য না দিয়ে ফেসবুকে একটা দৃষ্টিনন্দন ফটোকার্ড বানিয়ে পোস্ট করে বসেন। পরে যদি দেখা যায় তথ্যটি সম্পূর্ণ ভুল ছিল, তখন চুপচাপ সেই পোস্ট মুছে ফেলে দায় এড়িয়ে যান।
কোনো একটি সংবাদমাধ্যমে কিছু প্রকাশ পেলেই হলো, মুহূর্তের মধ্যে বাকিরা হুমড়ি খেয়ে তা হুবহু কপি-পেস্ট করতে শুরু করে। তথ্যটি একটু পরখ করে দেখার ন্যূনতম তাগিদও কেউ অনুভব করে না। ফলে যা দাঁড়ায়, তাকে দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা বলা কঠিন। এটি আসলে কাটতি বাড়ানোর সস্তা কাড়াকাড়ি, যেখানে সাংবাদিকতার পেশাগত দায়বদ্ধতা হারিয়ে গেছে।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, একবার তড়িঘড়ি করে ভুল তথ্য প্রকাশ করার পর পর শুরু হয় একের পর এক এডিটের খেলা। প্রথমে প্রকাশের সময় বলা হলো ঘটনাটি ঘটেছে দুপুরে, কিছুক্ষণ পর তা বদলে করে দেওয়া হলো বিকালে। খবরের মূল ভিত্তি অর্থাৎ কে, কী, কোথায়, কখন এবং কেন–এই মৌলিক বিষয়গুলো একেক সময় একেক রকম রূপ নেয়। প্রতিটি সংবাদমাধ্যম মাঠের সত্যটা যাচাই না করে যার যার মতো মনগড়া রূপকথা সাজিয়ে বসে থাকে। ফলে সাধারণ পাঠকেরা পড়েন চরম বিভ্রান্তিতে। তথ্যের এই হ য ব র ল অবস্থার দুটি বাস্তব ও সাম্প্রতিক উদাহরণ দেওয়া যাক।
সম্প্রতি যশোরের চৌগাছার একটি হত্যাকাণ্ডের খবর পড়তে গিয়ে দেশের নামকরা কিছু অনলাইন পোর্টালে চোখ রাখলাম। অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, প্রথম সারির প্রতিটি মাধ্যম যেন এক কল্পকাহিনির প্রতিযোগিতায় নেমেছিল। ঘটনাটি কোন গ্রামে ঘটেছে, তা নিয়ে বাঁধল প্রথম গোলমাল। কেউ অবলীলায় লিখে দিল দক্ষিণ সাগর গ্রাম, কেউ দাবি করল মাড়ুয়া গ্রাম।
সেখানকার এক কিশোরীর নিখোঁজ হওয়াকে কেন্দ্র করে এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত। নিহত ব্যক্তি কিশোরীর ফুফাতো ভাই আর আহত ব্যক্তি নিহতের চাচাতো ভাই, শুধু এই একটিমাত্র পারিবারিক তথ্য ছাড়া বাকি সবখানে অনুমানের চাষবাস। বিডিনিউজ জানাল, কিশোরী মঙ্গলবার সকালে বাড়ি থেকে পালায়। সময় টিভি বলল, সোমবার তাকে অপহরণ করা হয়। আর আমার দেশ দাবি করল, তাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। অপহরণ, তুলে নিয়ে যাওয়া আর স্বেচ্ছায় পালিয়ে যাওয়ার মধ্যে আইনি ও সামাজিক যে আকাশ পাতাল ফারাক রয়েছে, অনলাইনের গতিতে সেই কাণ্ডজ্ঞানটুকুও ভেসে গেছে।
বিভ্রান্তির এখানেই শেষ নয়। একই ঘটনায় সালিস হয়েছিল না কি হয়নি, তা নিয়েও একেক গণমাধ্যমের একেক ফতোয়া। কেউ সালিসের নিখুঁত দিনক্ষণ বাতলে দিল, তো কেউ খবরের কোথাও সালিসের অস্তিত্বই রাখল না। ঢাকা পোস্ট যখন বলল, ঘটনা ঘটেছে রাত নয়টায়, দেশ রূপান্তর তখন বলছে রাত আটটায়। তাদের দাবি অনুযায়ী ঘটনা ও পালিয়ে যাওয়ার দিন একই, অথচ অন্যান্য পত্রিকার হিসাব মতে ঘটনা ঘটেছে পরদিন। এর মধ্যে খুলনা গেজেট এসে পুরো গল্পটাই উল্টে দিয়ে বলল, পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাটি নাকি ঘটেছিল কয়েকদিন আগে। আর সময়ের আলো, দেশ টিভি কিংবা ঢাকা মেইলের প্রতিবেদনের দিকে তাকালে মনে হবে তারা ভিন্ন ভিন্ন কোনো উপন্যাসের খণ্ডচিত্র রচনা করেছেন। একটি সুনির্দিষ্ট হত্যাকাণ্ড নিয়ে এতগুলো নামকরা সংবাদমাধ্যমের এই বিপরীতমুখী তথ্য সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্তির চূড়ান্ত সীমায় নিয়ে ঠেলে দেয়।
তথ্যের এই চরম অসামঞ্জস্যতা কেবল মফস্বলের ঘটনার ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, খোদ রাজধানীর বুকেও একই চিত্র দেখা যায়। মিরপুরের পল্লবীতে সাত বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করে হত্যার পর মরদেহ গুম করতে মাথা আলাদা করার ঘটনাটি দেশের মানুষের বিবেককে নাড়া দিয়েছে। কিন্তু এই লোমহর্ষক ঘটনাটি নিয়েও সংবাদমাধ্যমগুলো যার যার মতো তথ্য দিয়ে এক বিভীষিকাময় গোলকধাঁধা তৈরি করেছে।
দ্য ডেইলি স্টার লিখেছে, প্রতিবেশীরা দরজা ভেঙে ঘরের ভেতরে ঢোকেন। আর সমকাল বলছে, ভেতর থেকে সাড়া না পেয়ে পুলিশে জানানো হলে তারা এসে দরজা ভাঙে। মরদেহের বিবরণ নিয়েও তথ্যের তফাত। দুটি পত্রিকার মতে, শিশুটির দেহ ছিল খাটের নিচে, আর মাথা ছিল শৌচাগারে। কিন্তু অন্যটি দাবি করছে, মাথাটি ছিল খাটের নিচের একটি কোণায়, বালতির ভেতর। এমনকি আসামির স্ত্রীর নাম এক জায়গায় শম্পা তো অন্য জায়গায় স্বপ্না। প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসামি একজন রিকশার মিস্ত্রি। অন্যদিকে ঢাকা পোস্ট বলছে, নিহত শিশুর বাবা রিকশার মিস্ত্রি এবং আগের পত্রিকার তথ্যমতে তিনি একটি রিক্রুটিং এজেন্সিতে চাকরি করেন।
একটি স্পর্শকাতর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত ও বিচারের ক্ষেত্রে এই ছোট ছোট তথ্যগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু আমাদের সংবাদমাধ্যমগুলো অনুমানের ওপর ভর করে একেকজন একেক রকম তথ্য দিয়ে যাচ্ছে।
প্রশ্ন হলো, তথ্য তো তথ্যই। সেটি আবার একেক গণমাধ্যমে একেক রকম হবে কেন?
অবশ্যই কোনো ঘটনার শুরুতে সব তথ্য শতভাগ নিশ্চিত করা সবসময় সহজ নয়। ঘটনাস্থলে বিশৃঙ্খলা থাকে, প্রত্যক্ষদর্শীদের কথাতেও ভুল থাকতে পারে। কিন্তু তারপরও সাংবাদিকতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো তথ্য যাচাই করা। সাংবাদিকতার প্রথম পাঠই হলো নির্ভুলতা। গতির চেয়ে তথ্যের সত্যতা অনেক বেশি মূল্যবান। সবার আগে ভুল তথ্য দেওয়ার চেয়ে ১০ মিনিট পরে সঠিক তথ্য দেওয়াটা একজন প্রকৃত সাংবাদিকের দায়িত্ব।
এখন অনেক জায়গায় মনে হয়, সাংবাদিকতার চেয়ে গতি বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে গেছে। তথ্যের সত্যতা যাচাই না করে যে যার মতো খবর প্রকাশ করে রেখে দিচ্ছে, পরে তা কেউ সংশোধন, আর কেউ করার প্রয়োজন মনে করছে না। এতে ধীরে ধীরে সংবাদমাধ্যমের ওপর মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা কমে যাচ্ছে। পাঠক বুঝতে পারছেন না, কোন তথ্য সত্য আর কোনটি ভুল।
সবার আগে খবর দেওয়ার এই অন্ধ দৌড় যদি বন্ধ না হয়, আর তথ্য যাচাই না করে খবর ছড়ানোর এই প্রবণতা যদি না থামে; তবে পুরো সাংবাদিকতা পেশাটা এক দিন তার শেষ বিশ্বাসযোগ্যতাটুকু হারাবে। তাই গণমাধ্যমের নীতিনির্ধারকদের এখন পরিষ্কার একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে–তারা কি পাঠককে সত্য জানাতে চান, নাকি কিছু ক্লিকের লোভে বিভ্রান্তির এই সস্তা ব্যবসা চালিয়ে যাবেন?
-আল মাহমুদ অপু