Image description

রামিসার বাবা একদিন দেখলেন-মেয়েটা বড় হয়ে গেছে তার। বড় হয়ে গেছে তার মাথার চুল। বাইরে থেকে এসেছেন তিনি। ক্ষুধার্ত। সামনে খাবার। একটু ঘুরে বসলেন তিনি। পুতুল-সংসারে ব্যস্ত মেয়েকে কাছে ডাকলেন। কাছে এলো মেয়ে। বাঁ হাত পিঠে রেখে নিকটে নিলেন আরো। ডান হাতটা রাখলেন মেয়ের বাঁ চিবুকে। বাবার চিরায়ত আর চিরন্তন আদরে হাতটা কান স্পর্শ করল, স্থির হলো চুলে। রামিসা টের পেল-বাবার হাতে মুগ্ধতা, স্পর্শে কেমন কাতরতা। রামিশার হাতে তখনো একটা পুতুল। ও যদি একটু মুখ তুলে তাকাত, তাহলে দেখতে পেত-পৃথিবীর সব মুগ্ধতা বাবার চোখে, জগতের সব কাতরতা ভর করেছে অবয়বে।

‘চুলগুলো বেনী করে দেই, মা?’
‘তুমি বেনী করতে পারো না, মা পারে।’ পুতুলের দিকে তাকানো এখনো রামিসা।
‘চুলের কয়টা ক্লিপ আছে তোমার?’
‘আ-ছে-।’ প্রলম্বিত স্বর রামিসার, ‘সবগুলো পুরান হয়ে গেছে, বাবা। নতুন কয়টা কিনে দেবে? জানো বাবা-।’ পুতুল থেকে চোখ সরাল রামিসা। কিন্তু কথা শেষ করল না সে। চোখের গোলার্ধের হাসি মিলিয়ে গেল, অন্ধকার নেমে এলো বিষাদের, ‘বাবা, তুমি কাঁদছো?’

হাতের চেটো দিয়ে চোখ মুছে নিলেন রামিসার বাবা। শীতের দিনের ঠোঁট ফাঁটা হাসি দিলেন তিনি, ‘তোর চুলগুলো এতো সুন্দর, আনন্দে পানি এসে গেছে চোখে।’
‘চোখ অদ্ভুত একটা জিনিস, তাই না বাবা?’
‘কেমন?’ চোখ সরু করে ফেলেন রামিসার বাবা।
‘মানুষ কষ্ট পেলে চোখে পানি আসে, আনন্দ পেলেও আসে।’ হাতের পুতুলটা বুকে চেপে ধরল রাামিসা, ‘তোমাকে যে কথাটা বলতে চেয়েছিলাম-সুজানার বাবা না সুজানাকে অনেকগুলো মাথার ক্লিপ কিনে দিয়েছে কয়দিন আগে। কী যে সুন্দর! হাত দিয়ে চেপে ধরলে মনে হয় গলে যাবে ক্লিপগুলো!’
‘সুজানা কে?’
‘আমার বন্ধু, একসাথে স্কুলে পড়ি না আমরা!’
‘ঠিক আছে, আমিও ওরকম ক্লিপ কিনে দেব।’

‘একটা ব্যান্ডও দিও। পড়তে বসলে বাতাস এতো ডিস্টার্ব করে না! কপালে নেমে আসে চুল, চোখে নেমে আসে। প্রজাপতি লাগানো একটা ব্যান্ড কিনে দিও।’
‘সুজানার বুঝি প্রজাপতি লাগানো ব্যান্ড আছে?’
‘তুমি কী করে জানলে?’ উৎফুল্ল হয়ে ওঠে রামিসা।
‘বাবারা সব জানে।’ বিজ্ঞের মতো উত্তর রামিসার বাবার।
‘বাবা-।’ বাবার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয় রামিসা, ‘কাল তুতুনের বিয়ে। তুতুনকে চেনো তো? আমার বড় পুতুলটা, ওই যে তুমি আমাকে জন্মদিনে কিনে দিয়েছিলে।’
‘কার সাথে বিয়ে দেবে?’

‘সুজানার একটা ছেলে পুতুল আছে, গাব্বু নাম। একটু মোটা। ওর সাথে দেব।’
‘বিয়ের পর তো তাহলে তুতুন গাব্বুর সাথে চলে যাবে। সুজানার বাসায় যাবে। কষ্ট হবে না তোমার?’
সুজানার বাবা কথাটা এমনভাবে বললেন, যেন কথাটা রামিসাকে জিজ্ঞেস করেননি তিনি, নিজেকে করেছেন। শার্পনার ছিল না, ছুরি দিয়ে পেন্সিল কাটতে নিয়ে একদিন হাত কেটে ফেলেছিল রামিসা। মেয়ে কাঁদে, তার চেয়ে তিনি নিজে কাঁদেন। খাটের কোনায় গুতো খেয়ে কপাল ফুলিয়ে ফেলেছিল একদিন রামিসা। তিনি নিজে বারবার নিজের কপালে হাত রাখেন। সামান্য জ্বরেও তিনি নিঃস্ব হওয়ার মতো গুটিয়ে যান একা একা।
পুতুল-সংসারে যাওয়ার আগে রামিসা বাবার দিকে তাকায় আবার, ‘ও মা, তোমার চোখে তো আবার পানি! কেন?’

চোখ দুটো আর মুছে নেন না রামিসার বাবা। ঘরের কোনায় পুতুলদের কাছে চলে যাওয়া দেখতে দেখতে তিনি দেখে ফেলেন-তার এই মেয়েটাও একদিন তুতুনের মতো হয়ে যাবে, গাব্বুর মতো একটা ছেলের হাত ধরে চলে যাবে এ ঘর ছেড়ে, অন্য ঘরে। খুব দ্রুত বড় হয়ে যায় মেয়েরা, তাই তো আর কয়দিন পরেই, মাত্র আর কয়টা দিন।
পুরো ঘরটা ঝাপসা হয়ে আসে রামিসার বাবার, ঝাপসা হয়ে আসে ঘরের কোনার রামিসাও, যেন পরের ঘরে যাওয়ার রাস্তার অনেক দূর চলে গেছে সে, পুরোপুরি আড়াল হয়ে যাবে আরেকটু বাঁকেই।

০৩

রামিসার বাবা তার স্ত্রীকে বললেন, ‘তুমি কি রামিসার মাথাটাকে একটু দেবে আমাকে?’
বুকে জড়িয়ে রাখা কাটা মাথাটা স্বামীকে দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন রামিসার মা। কেমন ঘোরগ্রস্ত মানুষের মতো হাঁটতে লাগলেন তিনি রুমের চারপাশে। টলানো পায়ের স্টেপ, তারে ঝুলে থাকা ঘুড়ির মতো দু হাত। রামিসার মাথাটাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনিও। একটু পর খেয়াল করলেন-বুকে কী যেন নড়ে উঠল তার। একটু পর ঝাঁকুনির মতো দিল কেউ। মাথা নিচু করলেন তিনি, নিজের বুকের দিকে তাকালেন। চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল তার-রামিসার মাথাটা নড়ছে! বের হয়ে আসতে চাচ্ছে হাতের বন্ধন থেকে। কিন্তু তিনি পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন না মাথাটা। বুক লাগোয়া হাত দুটো সরালেন, নিজের চোখের সামনে আনলেন। চমকে উঠলেন আবার-বুজে থাকা চোখ দুটো খুলে ফেলেছে রামিসা, ঠোঁটের কোনাটাও কেমন হাসিময়। তিনি কিছু বলার আগে রামিসা বলল, ‘বাবা, মাথা না থাকলে মানুষের কী হয়?’
‘কী হয়, মা?’
‘মাথা না থাকলে তাই চোখও থাকে না। আর চোখ না থাকলে কী হয় বলো তো?’
‘মানুষ দেখতে পায় না।’
‘দেখতে না পাওয়ার অনেকগুলো সুখ আছে, বাবা। সেই পরশু আমার মাথাটা কেটে ফেলা হয়েছে। তারপর আমি আর কিছু দেখতে পাইনি। আমার পুতুলগুলো কীভাবে পড়ে আছে, তা দেখতে পাইনি এখন আর। আমার মাথার ক্লিপ, ফিতা, ব্যান্ডগুলো বক্সে রাখা আছে কি-না, দেখা হয়নি তাও। বইগুলো আমি গুছিয়ে রেখেছি, না ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে এখানে ওখানে, জানা হয়নি আমার। মানিপ্লান্ট গাছটার মাথা কি ঝুঁকে গেল একদিকে, টেনশন হয়নি তারও। বারান্দায় পাখির পাত্র দুটোতে পানি আর চাল দেয়া হয়েছে কি-না, ভাবা হয়নি একবারও। জানো বাবা-।’ কেমন যেন হেসে উঠল রামিসা, ‘মাথা না থাকার অনেক আনন্দ বাবা; অনেক তৃপ্তি, অনেক নির্ভার আর শান্তির।’

বুকের ভেতরটায় কেমন যেন করে উঠল রামিসার বাবার। উথলে উঠতে চাচ্ছে গরম বাষ্প। ফেটে যেতে চাচ্ছে মাঝ বরাবর। কিন্তু তার আগেই তিনি দেখলেন-তার ঘরের ভেতর রাজনীতিবিদ দাঁড়িয়ে আছেন, সাংবাদিক দাঁড়িয়ে আছেন, বিচারক দাঁড়িয়ে আছেন, লেখক-ডাক্তার-প্রকৌশলী দাঁড়িয়ে আছেন। আমাদের নিরাপদে রাখার নিয়োগপ্রাপ্ত প্রধানগণ দাঁড়িয়ে আছেন। বড় বড় ব্যবসায়ী, নিজেকে বিজ্ঞ দাবি করা সুশীলরা দাঁড়িয়ে আছেন। মসজিদের ইমাম, পুরোহিতরা আছেন, আছেন নারীর ন্যায্য দাবী আদায় করা জ্বালাময়ী মুখ নারী নেত্রীরাও। সবাই স্থির দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু তাদের কারো কোনো মাথা নেই, তাই চোখও নেই।

চোখ নেই বলে তারা কিছু দেখতে পান না-পুরান ঢাকায় ৪ বছরের মেয়ের শ্লীলতাহানি হয়, ইয়াসমিন-তুনুরা মারা যায় ভোগ হয়ে, আছিয়া ১১ বছরে হয় অন্তঃসত্ত্বা। ক্ষমতার মোহে দায়িত্ব যথাযথ পালন না করায় হামে মারা যায় শত শত শিশু। প্রকৃত বিচারহীনতায় সবাই কাবাব খায়, ইলিশ মাছের দোপেয়াজা খায়, চিকেন স্যুপ খায় চুকচুক করে; খুনি-ধর্ষক-লুটেরারা ঘুরে বেড়ায় চার চাকার নতুন ব্রান্ডে। উড়ো বাহনে বান্ধবী নিয়ে যায় অশ্লীলতার কোনো দ্বীপে।
কারো কোনো মাাথা নেই, কেউ কিছু দেখতে পায় না কখনো, কোনোদিন!

০৪

রামিসার মাথাটা আবার নিজের বুকের সাথে চেপে ধরলেন রামিসার বাবা। তারপর ফিসফিস করে বললেন, ‘মারে, আমি অভিশাপ দিচ্ছি; যাদের এসব দেখার দায়িত্ব, কিন্তু দেখেন না, তাদের মেয়ে জন্মাক মাথা ছাড়া, তাদের নাতনী জন্মাক মাথা ছাড়া, তাদের সব আত্মীয় জন্মাক মাথাবিহীন।
মারে, আমার খুব ঘুম পাচ্ছে, তুই কি কবরে তোর মাথার পাশে আমাকে একটু ঘুমাতে দিবি!

-সুমন্ত আসলাম, লেখক