গাজীপুরের বাসন এলাকার একটি আবাসিক ফ্ল্যাট। বাইরে থেকে দেখতে সাধারণ বাসার মতো। কিন্তু ভেতরে মিলেছে ভয়ংকর অপরাধচক্রের সন্ধান। ছোট একটি কক্ষে তিনটি অত্যাধুনিক রঙিন প্রিন্টার। পাশেই পাওয়া গেল একটি ল্যাপটপ। ছিল বিশেষ ধরনের কাগজ ও কাটিং সরঞ্জাম। ল্যাপটপের মাধ্যমে প্রিন্টারে পাঠানো হচ্ছিল এক হাজার টাকার জালনোটের ডিজাইন।
একের পর এক কাগজ ঢোকানা হচ্ছিল। দ্রুত বের হচ্ছিল নোটসদৃশ কপি। একসঙ্গে চলছিল তিনটি প্রিন্টার। পুরো সেটআপ ছিল ছোট ছাপাখানার মতো। দেখে যেন মনে হচ্ছিল জালনোটের ‘মিনি টাকশাল’।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ওই ফ্ল্যাটে বুধবার অভিযান চালায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। একই দিন মধ্যেরাতে রাজধানীর কমলাপুরে সাইবার নেট ক্যাফে নামে একটি ফটোকপির দোকানে অভিযান চালিয়ে জালনোট তৈরির কারিগরসহ দুইজনকে গ্রেপ্তার করে র্যাব-৩। শুধু গাজীপুরের বাসন ও কমলাপুরের এই দুই চক্রই নয়, ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে ব্যাপক হারে জাল নোট বাজারে ছড়িয়ে দেওয়ার মিশনে নেমেছে বেশ কয়েকটি চক্র।
জাল টাকা আগেও ছিল; এখনো আছে। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে, চক্রটি একদম নতুন টাকা জাল করছে, যা এখনও জনগণের হাতে পৌঁছায়নি।
সাইদুর রহমান
উপঅধিনায়ক, র্যাব-৩
এছাড়াও চক্রের সদস্যরা বিশেষ অফার দিয়ে ফেসবুক, টিকটক, টেলিগ্রাম, ইন্সটাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপের মতো বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জাল নোট বেচাকেনার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। চটকদার অফার দিয়ে ক্রেতাদের প্রলোভনে ফেলছে সংঘবদ্ধ চক্রটি। বিভিন্ন ‘সিক্রেট গ্রুপ’ তৈরি করে সেখানে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করছে। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম অর্ডার নিয়ে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় এজেন্টদের মাধ্যমে দেওয়া হয় হোম ডেলিভারিও।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, নতুন নোট বাজারে এখনো পর্যাপ্ত নয়, সেই টাকা জাল করে বাজারে ছড়িয়ে দিচ্ছিল এই চক্রটি। দীর্ঘদিন ধরে চক্রটি গোপনে এই কার্যক্রম চালিয়ে আসছিল। তারা ঢাকা, গাজীপুর নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছিল। আসন্ন ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষ্যে পশুর হাট ও বিপণিবিতানে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাদের।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, আগের চেয়ে এখন জাল নোট তৈরিতে প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। ছোট পরিসরে বাসাবাড়িতে বসেই সংঘবদ্ধ চক্রগুলো এ ধরনের অপরাধ চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ধর্মীয় উৎসব ও বড় কেনাবেচার মৌসুমকে কেন্দ্র করে তাদের তৎপরতা বাড়ে।
জানা গেছে, জাল নোটের কারবারিরা দুটি পদ্ধতি ব্যবহার করে এসব নোট তৈরি করছে। এক্ষেত্রে ভালোমানের কাগজে আঠা ও সিকিউরিটি থ্রেড বসিয়ে ভাঁজ করা হয়। এরপর স্ক্যানার ও প্রিন্টিং মেশিনের সহায়তায় সূক্ষ্মভাবে যেকোনো মূল্যের জাল টাকা তৈরি করা হয়। এছাড়াও জাল নোট তৈরি করা হয় ওয়াশ পদ্ধতিতে। এক্ষেত্রে আসল টাকার নোট ওয়াশ করে শুকানো হয়। পরে ওই নোটের ওপর টাকার অঙ্ক বসিয়ে ছাপ দেওয়া হয়। তারা ১০০ টাকার নোট ওয়াশ করে সাদা করে তার ওপর ৫০০ টাকার অঙ্ক বসিয়ে বাজারে ছাড়া হয়।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে বুধবার উত্তরা থেকে মজিবুর রহমান নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। এ সময় তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয় চার লাখ টাকার জাল নোট ও নোট বিক্রির নগদ ৪০ হাজার টাকা।
পরে তার তথ্যের ভিত্তিতে ওই দিন বিকালে গাজীপুরের বাসন এলাকার একটি ফ্ল্যাটে অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় দুলাল মৃধা ও মামুনকে।
জালনোট কারবারিদের প্রায়ই গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও তারা জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপকর্মে লিপ্ত হয়। এবারও ঈদ ঘিরে চক্রের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশও।
এসময় ওই ফ্ল্যাটে জাল নোট তৈরি চলছিল। সেখানে অভিযান চালিয়ে আরও ৩০ লাখ জাল নোট, নোট তৈরির কাজে ব্যবহৃত ১টি ল্যাপটপ, ৩টি কালার প্রিন্টার, ১ রোল সোনালী রঙের ফয়েল পেপারসহ বিপুল পরিমাণ জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। এ ঘটনায় একটি মামলা করা হয়েছে উত্তরা পূর্ব থানায়।
আসামিরা শুধু রাজধানী নয়, বিভিন্ন জেলাতেও জাল নোট সরবরাহের কথা জানালেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) শফিকুল ইসলাম। বললেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জাল নোট তৈরি করে ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সরবরাহ করে আসছিল। আসন্ন ঈদ-উল-আজহা উপলক্ষে পশুর হাট ও বিপণিবিতানে জাল টাকা ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনাও ছিল তাদের। এ চক্রের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রয়েছে একাধিক মামলা।’
তার মতে, ‘জাল নোট কারবারিদের প্রায়ই গ্রেপ্তার করা হয়। তারপরও তারা জামিনে বেরিয়ে ফের একই অপকর্মে লিপ্ত হয়। এবারও ঈদ ঘিরে চক্রের সদস্যরা সক্রিয় রয়েছে। সতর্ক অবস্থানে রয়েছে পুলিশও।
‘এই চক্রটি ঈদকে সামনে রেখে জাল টাকা বাজারে ছড়িয়ে দিতে তিনটি মেশিনের মাধ্যমে অনর্গল টাকা ছাপাচ্ছিল। চক্রটি জাল টাকা ছাপাতে প্রেসে (ছাপাখানায়) কর্মরত এক কর্মীকে নিয়োগ দিয়েছিল’—যোগ করেন শফিকুল ইসলাম।
ডিবির এক কর্মকর্তা জানালেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা স্বীকার করেছেন, প্রযুক্তির সহায়তায় তারা আসল নোটের আদলে জাল টাকা তৈরি করতেন। পরে সেগুলো ছড়িয়ে দিত বিভিন্ন হাট-বাজার ও ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে।
এদিকে একই দিন মধ্যেরাতে রাজধানীর কমলাপুর বাজার রোডের ‘সাইবার নেট ক্যাফে’ নামে একটি ফটোকপির দোকানে অভিযান চালায় র্যাব। সেখানে জাল নোট কারবারি চক্রের সদস্য কামরুল ইসলাম নামে এক যুবককে আটক করা হয়। পরবর্তীতে দক্ষিণ কমলাপুরের একটি বাসায় অভিযান চালিয়ে নিষাদ হোসেন নামে একজনকে আটক করে র্যাব-৩ এর সদস্যরা।
এসময় তাদের কাছ থেকে ৫০০ টাকার মূল্যমানের ৪০টি জাল নোট জব্দ করা হয়। এছাড়া কম্পিউটার, প্রিন্টারসহ জাল নোট তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করে র্যাব-৩।
‘এই চক্রে একজন নটরডেম ইউনিভার্সিটির বিবিএর প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। সে মূলত সাপ্লাইয়ার। এছাড়া জাল তৈরির ইঞ্জিনিয়ারিং টাইপটা করেন দোকান পরিচালনাকারী। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে কামরুলকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার তথ্যের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার করা হয় অন্যজনকে’—বলছিলেন র্যাব-৩ এর উপ-অধিনায়ক সাইদুর রহমান।
সাইদুরের ভাষ্য, জাল টাকা আগেও ছিল; এখনো আছে। সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হচ্ছে, চক্রটি একদম নতুন টাকা জাল করছে, যা এখনও জনগণের হাতে পৌঁছায়নি। চক্রটি এই ব্যবহার করে তৈরি করছে জালনোট।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে জাল নোট বেচাকেনার বিজ্ঞাপন দিচ্ছে কারবারিরা। বিভিন্ন সিক্রেট গ্রুপ তৈরি করে সেখানে ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে তারা।
এমন কিছু বিজ্ঞাপন দেখা গেছে, যেখানে ১ লাখ টাকার জাল নোট মাত্র ১৫ থেকে ১৮ হাজার টাকায় বিক্রির অফার দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তারা ক্রেতাদের আস্থা অর্জনের জন্য মানি ব্যাক গ্যারান্টি বা মানের নিশ্চয়তার মতো মিথ্যা প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছে। চক্রটি এসব ক্ষেত্রে সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করে, যাতে সাধারণের চোখে তা সহজে ধরা না পড়ে। যেমন, নতুন মডেলের রঙিন প্রিন্ট, ঈদের বাজারের জন্য স্পেশাল অফার, ঈদ অফারের মতো দারুণ সুযোগ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করে জাল টাকাকে বৈধ পণ্য হিসাবে প্রচার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।
জানা গেছে, জাল টাকা যত নিখুঁত, তার দাম তত বেশি, বিক্রিও বেশি। ১০০০ টাকার এক লাখ নোট তৈরিতে খরচ হয় ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা। চক্রের সদস্যরা পাইকারি বিক্রেতার কাছে ১২ থেকে ১৮ হাজার টাকায় বিক্রি করে। পরে পাইকারি বিক্রেতা প্রথম খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকায়, প্রথম খুচরা বিক্রেতা দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতার কাছে বিক্রি করে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকায় এবং দ্বিতীয় খুচরা বিক্রেতা মাঠপর্যায়ে সেই টাকা এক লাখ টাকায় বিক্রি করছে বলে জানা গেছে। এভাবেই ধাপে ধাপে গ্রাম-গঞ্জ থেকে বিপণিবিতানে জড়িয়ে পড়ছে জাল নোট।
র্যাব জানায়, তিন ধাপে জাল টাকা বাজারে ছাড়া হয়। প্রথম ধাপে পাইকারি হিসেবে এক লাখ টাকার একটি বান্ডিল ২৫-৩০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। ২য় ধাপে পাইকারি কারবারিরা আবার এসব টাকা খুচরা কারবারির কাছে ৪০-৪৫ হাজার টাকায় বিক্রি করেন। ৩য় ধাপে খুচরা কারবাবিররা এসব টাকা নিজস্ব বাহিনীর মাধ্যমে তা সরাসরি সুকৌশলে বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। বিশেষ করে শিক্ষাহীন, অর্ধশিক্ষিত, বৃদ্ধ, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের লোকেরাই নোট জালকারীদের মূল টার্গেট।