রাজনীতি মানুষের জন্য। একটি রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি হলো রাজনীতি। দেশকে যদি একটি গাড়ির সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে রাজনীতি হলো ড্রাইভিং সিট। গণতন্ত্রে এই ড্রাইভিং সিটে তিনি বসেন যাকে জনগণ ভোট দিয়ে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব দেয়। তিনি কীভাবে গাড়ি চালাবেন তার ওপর নির্ভর করে আমাদের জীবন ও ভবিষ্যৎ। চালক অদক্ষ হলে যেমন গাড়ির যাত্রীদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে, তেমন সরকার যদি অদক্ষ হয় তাহলে দেশ বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে। যেমন ড. ইউনূসের অযোগ্য ও অদক্ষ পরিচালনায় দেশ আজ খাদের কিনারে। রাষ্ট্র পরিচালনায় যে দল ড্রাইভিং সিটে বসে তাদের প্রধান কাজ হলো জনগণের অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশ পরিচালনা। একজন চালকের দায়িত্ব যেমন যাত্রীদের নিরাপদে নিদিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো, তেমন একটি নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব দেশকে জনগণের আকাক্সক্ষা অনুযায়ী এগিয়ে নেওয়া।
এখন প্রশ্ন হলো, জনগণ কী চায়? একটি রাষ্ট্রের জনগণ মোটা দাগে পাঁচটি মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টি চায়। প্রথমত দেশের প্রতিটি মানুষ চায় বেঁচে থাকার অধিকার। এটা একজন মানুষের সবচেয়ে প্রধান মৌলিক অধিকার। একজন মানুষ অবাধে চলাফেরা করতে পারবে। ঘর থেকে বেরিয়ে কাজ শেষে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারবে। তিনি তার অবস্থান অনুযায়ী বৈধভাবে দেশে বা বিদেশে যেতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশে এ অধিকার কতটা কার্যকর? এ দেশে এখনো স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই। এখানে ওখানে লাশ ঝুলে থাকে। ইউনূস আমলে চালু হওয়া মব সন্ত্রাসের কাছে জিম্মি জনগণ। কে কখন এসে আপনার ওপর হামলা চালাবে তা কেউ বলতে পারে না। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বললেন, মব সন্ত্রাসের দিন শেষ। কিন্তু বাস্তবে মব সন্ত্রাসের বসন্তকাল এখনো চলছে। সালাহউদ্দিন আহমদ কথাটি বলেছিলেন ১৮ ফেব্রুয়ারি। তার দুই মাসের মধ্যে রাজধানীর শাহবাগে মব সৃষ্টি করে আড্ডারত কয়েকজন নারী-পুরুষকে ‘সমকামী’, ‘ট্রান্সজেন্ডার’ আখ্যা দিয়ে তাঁদের ওপর হামলা হয়। তার এক দিন বাদে মব সৃষ্টি করে হত্যাকাণ্ডই ঘটে কুষ্টিয়ায়। এ জেলার দৌলতপুর উপজেলায় স্থানীয়ভাবে পীর হিসেবে পরিচিত শামীম রেজা ওরফে জাহাঙ্গীরকে তাঁর দরবারে ঢুকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। পুরোনো একটি ভিডিও সামনে এনে তাঁর বিরুদ্ধে ধর্ম অবমাননার অভিযোগ তুলে এ হামলা হয়েছিল। কুষ্টিয়ার ঘটনাটি মব সন্ত্রাসের বিষয়টি আবার সামনে এনেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে ঘটে যাওয়া এমন সব ঘটনায় বিচার না হওয়ায় তা আবার ঘটছে। এখনই কঠোর ব্যবস্থা না নিলে এ ধরনের সহিংসতা বাড়তে থাকবে। আগে যেসব মব সৃষ্টি করে হামলা হয়েছে, সরকারের উচিত সেসব ঘটনা তদন্ত করে শ্বেতপত্র প্রকাশ করা এবং ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু তিন মাসেও মব সন্ত্রাস নিয়ে আশ্বস্ত হতে পারেনি দেশের জনগণ। জীবনের অধিকার নিয়ে এখনো মানুষ উদ্বিগ্ন। কিন্তু এ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো আলোচনা নেই। রাজনৈতিক দলগুলো একে অন্যকে কীভাবে ঘায়েল করা যায় তার পরিকল্পনা সাজাতেই ব্যস্ত। মানুষ অবাধে চলাফেরা করতে পারছে না। সংবিধানের মৌলিক অধিকারকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া হচ্ছে অনেককে। সম্প্রতি একজন সিনিয়র সাংবাদিককে বিমানবন্দর থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অপরাধ কী? এ নিয়ে কারও কোনো বক্তব্য নেই। না সরকারের, না বিরোধী দলের। শুধু সাংবাদিক নয়, বহু মানুষের ওপর বিদেশ ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করে রেখেছিল ইউনূস সরকার। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় এসেও অবস্থার উন্নতি হয়নি। সরকার-বিরোধী দল কেউই জনগণের স্বাভাবিক এবং ভয়হীন জীবন যাপনের কথা বলছে না।
কাদের কী কারণে বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার কারণসহ তালিকা প্রকাশ করা সরকারের দায়িত্ব। এটা জানার অধিকার আছে সবার। দ্বিতীয়ত আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভিত্তি হলো আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার। যেকোনো গণতান্ত্রিক সরকারের অবশ্যপালনীয় কর্তব্য হলো জনগণের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। আমাদের সংবিধানে বলা আছে, আইনের দৃষ্টিতে সকল নাগরিক সমান। কিন্তু বাস্তবে কি তাই? মোটেও নয়। এ দেশে এখন আইন একেক জনের জন্য একেক রকম। একই কাজ করার জন্য কেউ কারাগারে আছেন মাসের পর মাস, আবার কেউ বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। দেশে এ মুহূর্তে ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিনা বিচারে কারাগারে বন্দি আছেন। নতুন সরকার তাদের মুক্তির কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও এ নিয়ে কোনো কথা নেই। ইউনূস সরকারের আমলে হত্যা মামলার নামে তামাশা করা হয়েছিল। যাকে খুশি তাকে হত্যা মামলার আসামি বানিয়ে হয়রানি করা ছিল ইউনূস সরকারের নিকৃষ্ট সংস্কৃতির অংশ। ব্যবসায়ী, শিক্ষক, সাংবাদিকসহ সব পেশার মানুষকে উদ্ভট হত্যা মামলার আসামি বানিয়ে ইউনূস এবং তাঁর আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিচারের নামে এক প্রহসনের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। বিএনপি ক্ষমতায় বসার তিন মাস হচ্ছে। আজ পর্যন্ত একটি মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হয়নি। অথচ দায়িত্ব নিয়েই সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করা হবে। বিরোধী দলের নেতারা কথায় কথায় আইনের শাসন কায়েম করার কথা বলেন। কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো রাজনৈতিক দল এসব মামলা প্রত্যাহারের জন্য সরকারের কাছে দাবি জানায়নি।
জামিন পাওয়া একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির অধিকার। কিন্তু ইউনূসের আমলে সেই অধিকার হরণ করা হয়েছিল। একটি দেশের আইন উপদেষ্টা যখন প্রকাশ্যে জামিনের বিরোধিতা করেন তখন বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কোন অন্ধকারে নিমজ্জিত হয় তা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরও জামিন নিয়ে চলছে একই ধরনের অভিযোগ। জামিন পাওয়ার পর অনেককে নতুন মামলায় জড়ানো হচ্ছে। এ নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে কোনো আলোচনা নেই, নেই কোনো দাবি। তৃতীয়ত কাজ করার অধিকার। প্রতিটি নাগরিকের কর্মের অধিকার সাংবিধানিক অধিকার। কিন্তু বাংলাদেশে রেকর্ডসংখ্যক মানুষ এখন কর্মহীন। ইউনূস সরকার ক্ষমতায় আসার পর হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। কোটি মানুষ মুহূর্তেই বেকার হয়েছেন। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বলেছিল বন্ধ কলকারখানা চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু তিন মাসে একটি বন্ধ কারখানাও চালু হয়নি। ইউনূস সরকারের আমলে বেসরকারি খাত ধ্বংসের নানামুখী ষড়যন্ত্র হয়েছে। ব্যবসায়ী, শিল্পপতিদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট জব্দ করে, তাঁদের বিরুদ্ধে তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই অর্থ পাচারের অভিযোগ এনে বিনিয়োগ পরিবেশ বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। কিন্তু নতুন সরকার এসে এখন পর্যন্ত বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারেনি। চতুর্থত স্বাস্থ্য ও শিক্ষার অধিকার। স্বাস্থ্য ও শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। ইউনূস সরকারের আমলে দেশের মানুষের এই অধিকার হরণ করা হয়েছিল। গোটা দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। হামে শিশুমৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। সরকার শুধু দোষারোপ করেই দায় সারছে। হামে শিশুমৃত্যু নিয়ে রাজনীতিতে কোনো আলোচনা নেই। অসহায় বাবা-মার পাশে নেই রাজনীতিবিদরা। সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার উন্নতি নিয়ে রাজনৈতিক সংলাপ নেই।
এ দেশের শিক্ষার্থীরা যেন গিনিপিগ। একটি করে সরকার আসে তারা শিক্ষা নিয়ে নানা রকম পরীক্ষানিরীক্ষা করে। সংকটে পড়ে শিক্ষার্থীরা। এবার নতুন নিরীক্ষায় বিপর্যস্ত শিক্ষার্থী এবং অভিভাবকরা। ইউনূস আমলে দেশের শিক্ষার পরিবেশ নষ্ট করা হয়েছিল। সেখান থেকে শিক্ষাঙ্গনে স্বাভাবিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে রাজনৈতিক দলগুলোর আগ্রহ নেই। পঞ্চমত স্বাভাবিক নাগরিক জীবন। দেশের মানুষ স্বাধীনভাবে স্বস্তিতে বসবাস করতে চায়। কিন্তু নতুন সরকার আসার পরও স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাচ্ছে না মানুষ। চাঁদাবাজি, মাদক, জিনিসপত্রের মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতিতে নাজেহাল তারা। চাঁদাবাজি চলছে আগের মতোই। আগের স্টাইলে সরকারি দলের ছত্রছায়ায় চাঁদাবাজদের দৌরাত্ম্য অব্যাহত আছে। ফরিদপুরের ভাঙ্গায় চাঁদাবাজির অভিযোগে দুই তরুণকে পুলিশ আটক করার পর তাদের ‘এলাকার ছেলে’ পরিচয় দিয়ে থানা থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে গেছেন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আইয়ুব মোল্লা। সারা দেশের চিত্র কমবেশি একই রকম। সরকারের আশ্বাস বাস্তবে রূপ নেয়নি। চাঁদাবাজি নিয়ে বিরোধী দল কেবল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে মানুষের হাহাকার রাজনীতির মাঠে পৌঁছে না। মানুষ অসহায়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য। কিন্তু হামে মারা যাওয়া শিশুদের পরিবারের পাশে নেই রাজনৈতিক নেতারা। বেকারদের চাকরির জন্য আলোচনা নেই রাজনীতিবিদদের। চাঁদাবাজিতে অতিষ্ঠ মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেখা যাচ্ছে না রাজনৈতিক দলগুলোকে। কৃষকের চোখের জল মুছতে এগিয়ে আসছেন না কোনো রাজনীতিবিদ।
দেশের মানুষ অসহায় হয়ে প্রতিদিন জীবন যুদ্ধে পরাজিত হচ্ছে আর রাজনৈতিক দলগুলো আছে সংস্কার আর সংবিধান সংশোধন নিয়ে কৌশলের মারপ্যাঁচে কে জয়ী হবে সেই চেষ্টায়। রাজনীতি এখন ক্রমে জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। দেশের মানুষ বিশ্বাস হারিয়ে ফেলছে। তারা এখন রাজনৈতিক নেতাদের তাদের আপনজন হিসেবে বিবেচনা করতে পারছে না। এটা একটা উদ্বেগের বিষয়। কারণ রাজনীতির প্রতি মানুষের আস্থা কমে গেলে অগণতান্ত্রিক শক্তি সুযোগ পায়। তাই রাজনীতিবিদদের জনগণের কান্না শুনতে হবে, তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। সবার জন্য একটা নিরাপদ শান্তিপূর্ণ দেশ গড়ে তোলাই রাজনীতির প্রধান কাজ।