দেশে মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ৩০ শতাংশ জোগান আসে হাওর অঞ্চল থেকে। বছরে একবারই বোরো ধান চাষ করা হয় এই অঞ্চলে। তবে প্রতি বছরই পাহাড়ি ঢলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়, যা সার্বিক খাদ্য জোগানও ব্যাহত করে। ফসল রক্ষায় প্রতি বছরই হাওরে নির্মাণ করা হয় বাঁধ। অস্থায়ী এসব বাঁধে প্রতি বছর বিপুল ব্যয় হলেও থামছে না সুনামগঞ্জের হাওরের ফসলহানি। এ বছর আকস্মিক বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৬ হেক্টর জমির ধান।
কৃষকদের অভিযোগ, এত ব্যয়ের পরও বাস্তবে মিলছে না সুফল। সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার কৃষক ছত্তার মিয়া এ বছর ৩০ একর জমিতে আবাদ করেছেন ধান। বন্যার আগে কেটেছিলেন সাত একর জমির। পানি ওঠেনি সাত একর জমিতে। বাকি ১৬ একর জমির ধান ডুবে গেছে। যেসব ধান কেটে রেখেছিলেন বৃষ্টির কারণে তার বেশিরভাগেই ধরেছে পচন।
এই কৃষক বললেন, ভেড়াডহর ও ছায়ার হাওরেই কৃষকের জমি সবচেয়ে বেশি। হাওরগুলোর ৫৫ শতাংশ ফসলই কাটা হয়েছিল। সেগুলো আগেভাগেই বিক্রি করেছেন কৃষক। বাকি ধান কাটার পর টানা বৃষ্টি হওয়ায় পচে নষ্ট হয়েছে। গজিয়েছে চারা।
হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণকাজের দেখভাল করে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ১ হাজার ৩৪ কিলোমিটার বাঁধ।
ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তখন বলা হয়েছিল, শুরুতে ব্যয় বেশি হলেও ধীরে ধীরে তা কমে আসবে। তবে প্রথম দু-এক বছর কাজ কিছুটা কম হলেও পরে বাড়তে থাকে।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে ব্যয় নামিয়ে আনা হয় প্রায় অর্ধেকে। ওই বছর ব্যয় হয় ৮০ কোটি টাকা। তবে ২০১৯-২০ অর্থবছরে আবারো ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০২ কোটি টাকা। ২০২০-২১ অর্থবছরে ১ কোটি কমিয়ে ব্যয় করা হয় ১০১ কোটি টাকা। ২০২১-২২ অর্থবছরে ব্যয়ের পরিমাণ আরও কমিয়ে আনা হয়। ওই বছর ব্যয় করা হয় ৯৫ কোটি টাকা। সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ২০২২-২৩ অর্থবছরে। ওই বছর ১ হাজার ৬৪টি প্রকল্পে ৭৩৭ কিলোমিটার কাজে ব্যয় হয় ১৫৫ কোটি টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ব্যয় নেমে আসে ১০১ কোটি টাকায়। পরের বছর অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩১ কোটি বাড়িয়ে ব্যয় ধরা হয় ১৩২ কোটি টাকা।
চলতি অর্থবছরেও বেড়েছে টাকার অঙ্ক। এ বছর ব্যয় হয়েছে ১৪৫ কোটি টাকা। নির্মাণ করা হয়েছে ৬০২ কিলোমিটার বাঁধ। অবশ্য এর বাইরে ঠিকাদারের মাধ্যমে ৩০৮ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৪টি হাওরে প্রায় ১৭ কিলোমিটার স্থায়ী বাঁধের কাজ করছে পাউবো।
হাওর রক্ষা আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৭ সালের পর থেকে অপরিকল্পিতভাবে শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে হাওরে নির্মাণ করা হয়েছে অস্থায়ী বাঁধ। এসব বাঁধের মাটিতেই ভরাট হয়েছে হাওরের তলদেশ। প্রতি বছর এমন কর্মকাণ্ডের ফলে এবার দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা।
যদিও সামনের দিকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাজ আরও বৈজ্ঞানিকভাবে পরিচালনা করার কথা জানিয়েছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু, যাতে অর্থ অপচয় কমে এবং কৃষক রক্ষা পায় জলাবদ্ধতা থেকে।
এ বছর সুনামগঞ্জের হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর জমিতে আবাদ করা হয়েছে বোরো ধান। এর মধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ১৬ হাজার ৩৯৬ হেক্টরের ফসল। এখন পর্যন্ত কাটা হয়েছে ৮৯ দশমিক ৫৬ শতাংশ জমির ধান। এ তথ্য জানিয়েছে কৃষি অধিদপ্তর।
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক পরিবারের সংখ্যা নির্ধারণে কাজ চলছে, তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর সঠিক সংখ্যা জানা যাবে— বললেন জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক।
ফসলের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্যকে বিভ্রান্তিকর বলছেন হাওর রক্ষা আন্দোলনের নেতারা। তাদের দাবি, হাওরের প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতি ও ধান কাটার অগ্রগতি নিয়ে সরকারি পরিসংখ্যানে তুলে ধরা হচ্ছে না সঠিক চিত্র।
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুর হক মিলন দাবি করেন, বাস্তবে হাওরের প্রায় ৬০ শতাংশ ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তার ভাষ্য, যেখানে ৬০ ভাগ ধান পানিতে নষ্ট হয়েছে, সেখানে কৃষি বিভাগের ৮০ ভাগ ধান কাটার তথ্য বাস্তবসম্মত নয়।
সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তায় শুরু করা হয়েছে কার্যক্রম। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে তিন মাস সাড়ে ৭ হাজার ও ২০ কেজি চাল, মধ্যম ক্ষতিগ্রস্তদের ৬ হাজার এবং আংশিক ক্ষতিগ্রস্তদের আড়াই হাজার টাকা করে দেওয়া হবে সহায়তা।
কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে হাওর অঞ্চলে দ্রুত পানিনিষ্কাশনে নেওয়া হবে প্রকৌশলভিত্তিক উদ্যোগ।