চট্টগ্রামে সাবেক মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের লাশ নিয়ে ব্যাপক শোডাউন করেছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সকাল ১১টায় নগরীর জমিয়তুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ মাঠে নামাজে জানাজা শেষে জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে পতনের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে এতোবড় শোডাউন করলো নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা।
এর আগে বুধবার ইঞ্জিনিয়ার মোশারফের মৃত্যুর পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার লাশকে ঘিরে বড় শোডাউন করার ঘোষণা দিয়েছিল আওয়ামী লীগের বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে। বৃহস্পতিবার সকালে পূর্ব ঘোষণা বাস্তবায়ন করলো তারা।
নির্ধারিত সময় সকাল ১১টার পরে জানাজা শেষে কাতার ভাঙার আগেই জয়বাংলা স্লোগান দিতে থাকে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। পড়ে লাশ নিয়ে মিরসরাইয়ের উদ্দেশে রওনা হলে লাশবাহী গাড়ি ঘিরে মিছিল বের করে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এসময় ইঞ্জিনিয়ার মোশারফকে সরকার হত্যা করেছে দাবি বলে অভিযোগ করেন তারা। ’শেখ হাসিনা আসবে বাংলাদেশ হাসবে’, ’জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’, ’তারেখ জিয়া ভোট চোর’, ‘শেখ হাসিনার সরকার বার বার দরকার’ এমন নানান রাজনৈতিক স্লোগান দিতে থাকে এতদিন ঘাপটি মেরে থাকা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। লাশবাহী গাড়ির সঙ্গে মিছিলটি ওয়াসা মোড় থেকে জিইসি মোড় পর্যন্ত যায় মিছিলটি।
পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সক্রিয় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিভিন্ন পেজ থেকে ইঞ্জিনিয়ার মোশারফের জানাজা ঘিরে বড় ধরনের শোডাউন দেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয় বুধবার দুপুর থেকেই। ওইদিন বিকেলে জমিয়তুল ফালাহ মসজিদের মাঠে মোশারফের জানাজার অনুমতি দেয় পুলিশ। কিন্তু নিষিদ্ধ দলের কোন শোডাউন করতে দেয়া হবে না বলেও ঘোষণা দেয়া হয় সিএমপির পক্ষ থেকে। অরাজকতা ঠেকাতে বুধবার বিকেল থেকেই কাগজে-কলমে ব্যাপক প্রস্তুতি নেয় চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ। নন্দনকাননের মোশারফের বাসা থেকে শুরু করে জানাজাস্থল ও গ্রামের বাড়ি মিরসরাই নেয়ার পথে সিটি গেইট পর্যন্ত মোড়ে মোড়ে পুলিশ ও রায়ট কার মোতায়েন করা হবে বলে লিখিত রূপরেখা ঘোষণা করে সিএমপি। কিন্তু কাগজে কলমে যতটা কঠোর হবার ঘোষণা ছিল সিএমপির সকাল থেকে ততটায় ঢিলে ঢালা ভাব ছিল পুলিশের। এই সুযোগে নির্ধারিত সময়ের আগেই দলে দলে জানাজা স্থলে ঢুকে পড়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। জানাজার পরপরই লাশবাহী গাড়ি নিয়ে ব্যাপক শোডাউন দেয় তারা।
এসময় উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শেখ আতাউর রহমান আতা, মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর ভূঁইয়্যা, সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম, সীতাকুণ্ড উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান আরিফুল আলম রাজু, আওয়ামী লীগ নেতা সাইদুল ইসলাম, জাহেদ চৌধুরী ফারুক, বারৈয়াঢালা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সাইদুল ইসলাম উত্তর জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি তানভীর হোসেন চৌধুরী তপুসহ নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেন। এছাড়াও জানাজার নামাজে জুলাই গণহত্যার আসামিসহ শীর্ষ সন্ত্রাসীরাও জুলাই বিপ্লাবের পর প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে আসে। এর মধ্যে মিরসরাইয়ের শীর্ষ সন্ত্রাসী আশরাফুল কামাল মিঠু, নাছির উদ্দিন দিদারসহ হত্যা, বিস্ফোরক দ্রব্য মামলার পলাতক আসামিদের শোডাউনে অংশ নিতে দেখা যায়।
এ ব্যাপারে বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোন করা হলেও সিএমপির ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা ফোন ধরেননি। তবে সিএমপির জনসংযোগ কর্মকর্তা সহকারী পুলিশ কমিশনার আমিনুর রশিদ জানান, জানাজা একটি ধর্মীয়-সামাজিক অনুষ্ঠান। এখানে কে অংশ নেবে কে নেবে না তা পুলিশ নির্ধারণ করে দেয় না। লাশ নিয়ে মিছিল হয়েছে এমন কোনো খবর পুলিশের জানা নেই।
বিএনপি ও জামায়াত নেতাদের উপস্থিতি নিয়ে সমালোচনা
ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের নামাজে জানা যায় অংশ নেন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও চসিক মেয়র ডা. শাহাদাৎ হোসেন ও চট্টগ্রাম-৯ আসন থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে এমপি নির্বাচন করা ফজলুল হক। জানাজা শেষে দুই নেতাই গণমাধ্যমে বক্তব্য দেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে চট্টগ্রামের উন্নয়নে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের অবদানের কথা তুলে ধরেন। রাজনীতিবিদ হিসেবে মরহুমের প্রশংসা করেন দুই নেতাই। জানাজার পর তাদের উপস্থিতিতেই ইঞ্জিনিয়ার মোশারফের লাশবাহী গাড়ি ঘিরে শোডাউন শুরু করে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এছাড়া শোক জানান মীরসরাই থেকে জামায়াতে ইসলামীর হয়ে নির্বাচনে অংশ নেয়া এডভোকেট সাইফুর রহমানও শোক জানান।
কিন্তু পরে সমাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিব্র সমালোচনার মুখে পড়েন তারা। বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপির বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের অনেকেই তিব্র সমালোচনা করেন ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের অন্যতম নীতি নির্ধারক ইঞ্জিনিয়ার মোশারফের জানাযায় অংশ নেয়ার কারণে। আওয়ামীলীগ আমলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মুজাহিদ, মীর কাশেম আলীর জানাজা করতে না দেয়ার বিষয়টি সামনে আনেন। অনেকে সে সময় জানাজার অনুষ্ঠানে পুলিশি হামলার ছবিও শেয়ার করেন।
জিয়াউর রহমানকে কটাক্ষ করে মোশারফের দেয়া বক্তব্য ভাইরাল
আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানকে কটাক্ষ করে একাধিক বক্তব্য দিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। তার জানাজায় বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের পর সেই সব পুরোনো বক্তব্য নতুন করে শেয়ার করে ভাইরাল হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। বিশেষ করে একটি বক্তব্যে ‘জিয়াউর রহমান কোন দিনও মুক্তিযুদ্ধ করে নাই, সে মুক্তিযুদ্ধের কোন নেতৃত্ব দেন নাই। এটা আমি সাক্ষী আই এ্যাম দ্যা উইকনেস।’ এমন একটি বক্তব্য সবচেয়ে বেশি ভাইরাল হয়।
মিরসরাইয়ে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন
চট্টগ্রামে জানাজা শেষে ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফের লাশ নিয়ে যাওয়া হয় তার গ্রামের বাড়ি মীরসরাইয়ের ধুম গ্রামে। মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গার্ড অব অনারের পর মহাজনহাটা স্কুল মাঠে তৃতীয় নামাজে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় প্রবীণ এই রাজনীতিবিদকে।